সূর্যের রহস্যময় তাপমাত্রা ধাঁধার জট খুলল আদিত্য-এল১
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২০:৪৯
বহু বছর ধরে বিজ্ঞানীদের মাথার ঘাম পায়ে ফেলা একটি চিরন্তন প্রশ্ন ছিল—সূর্যের বাহ্যিক বায়ুমণ্ডল বা করোনা কেন এর নিজস্ব পৃষ্ঠভাগের চেয়ে বহুগুণ বেশি উত্তপ্ত? এবং সৌরঝড়ে প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ শক্তি হারানোর পরেও এই করোনা কীভাবে সেই প্রচণ্ড তাপমাত্রা ধরে রাখে? ভারতের প্রথম সৌর পর্যবেক্ষণ অভিযান আদিত্য-এল১ -এর সাম্প্রতিক তথ্যের ভিত্তিতে এবার সেই রহস্যেরই একটি বড় জট খোলার দাবি করেছেন দেশটির জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী 'অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল
জার্নাল লেটার্স'-এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব অ্যাস্ট্রোফিজিক্সের
প্রখ্যাত সৌর জ্যোতির্বিজ্ঞানী প্রফেসর আর রমেশের নেতৃত্বে একদল বিজ্ঞানী এই নতুন তথ্য
নিশ্চিত করেছেন।
পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী,
কোনো কিছুর তাপ উৎস থেকে যত দূরে যাওয়া যায়, তাপমাত্রা তত কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু সূর্যের
ক্ষেত্রে তা একেবারেই উল্টো। সূর্যের কেন্দ্রে তাপমাত্রা যেখানে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ
ডিগ্রি সেলসিয়াস, সেখানে আমরা পৃথিবী থেকে যে অংশটি দেখি—অর্থাৎ সূর্যের পৃষ্ঠদেশ বা
ফটোস্ফিয়ারে তাপমাত্রা নেমে আসে মাত্র ৫,৫০০ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। অথচ সেই পৃষ্ঠভাগ ছাড়িয়ে
সূর্য থেকে লাখ লাখ কিলোমিটার দূরে এর বাহ্যিক বায়ুমণ্ডল বা করোনা অঞ্চলে তাপমাত্রা
হঠাৎ একলাফে বেড়ে দাঁড়িয়ে যায় ২০ লাখ থেকে প্রায় ৪ কোটি ডিগ্রি সেলসিয়াসে!
শুধু তাই নয়, এই করোনা থেকেই জন্ম নেয়
সৌরঝড় বা করোনাল মাস ইজেকশন, যেখানে বিশাল বিস্ফোরণের মাধ্যমে মহাকাশে ছিটকে পড়ে কোটি
কোটি টন প্লাজমা ও শক্তিশালী শক্তি। এই শক্তির কারণে পৃথিবীতে বিদ্যুৎ গ্রিড বিকল হওয়া
বা উপগ্রহ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার মতো জিওম্যাগনেটিক ঝড় ঘটে থাকে। সৌর চক্রের সর্বোচ্চ
সময়ে দিনে ১০টিরও বেশি এমন সিএমই ঘটে থাকে। প্রশ্ন ওঠে, প্রতিবার সিএমই-র মাধ্যমে এত
বিপুল শক্তি হারানোর পর সূর্য ঠান্ডা হয়ে হিমশীতল বরফে পরিণত হচ্ছে না কেন? আদিত্য-এল১
মিশনে থাকা বিশেষ যন্ত্র ভেলক -এর সংগৃহীত ২০২৪ সালের আগস্টের এক শক্তিশালী সৌর বিস্ফোরণের
তথ্য বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা এর নির্ভুল হিসাব উন্মোচন করেছেন।
গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যের করোনা প্রধানত
দুটি প্রক্রিয়ায় শক্তি পূরণ করে। সূর্যের পৃষ্ঠদেশের
ফুটন্ত বুদ্বুদের মতো সচল গতির ফলে সৃষ্ট তরঙ্গ, যা করোনার দিকে শক্তি বহন করে নিয়ে
যায় (এর অবদান মাত্র ৭ শতাংশ) আর সূর্যের বায়ুমণ্ডলে জড়িয়ে থাকা শক্তিশালী চৌম্বক ক্ষেত্র
রেখাগুলোর প্রতিনিয়ত ছিঁড়ে যাওয়া এবং পুনরায় যুক্ত হওয়া।
বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, বিস্ফোরণের সময় চুল
বিনুনির মতো পেঁচিয়ে থাকা এই চৌম্বক রেখাগুলো ছিঁড়ে গিয়ে প্রচুর শক্তি বাইরে বের করে
দেয়। কিন্তু সিএমই শেষ হওয়ার মাত্র ১০ ঘণ্টার মধ্যেই সেই ছিঁড়ে যাওয়া চৌম্বক রেখাগুলো
আবার নিজেদের আগের স্থানে ফিরে এসে পুনরায় যুক্ত হয় এবং করোনার হারিয়ে যাওয়া শক্তি
৯৩ শতাংশ পর্যন্ত পুনঃপূরণ করে দেয়! বিজ্ঞানী আর রমেশ জানান, আমাদের গবেষণা সুস্পষ্টভাবে
প্রমাণ করেছে যে, সূর্যের পৃষ্ঠদেশের বুদ্বুদ গতি শক্তি যোগালেও তা যথেষ্ট নয়। সূর্য
তার চৌম্বকীয় রেখাগুলোর পুনঃসংযোগের মাধ্যমেই হারানো শক্তির সিংহভাগ (৯৩%) ধরে রাখে।
আদিত্য-এল১-এর এই বৈপ্লবিক তথ্য শুধু সৌরবিজ্ঞানের
বছরের পর বছর ধরে আটকে থাকা জটিল ধাঁধারই সমাধান করেনি, বরং ভবিষ্যতে মহাকাশের আবহাওয়া
পূর্বাভাস দিতে এবং সৌরঝড় থেকে পৃথিবীর প্রযুক্তি রক্ষা করতে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে
করছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশের খবর/ এম.আর

