Logo

আন্তর্জাতিক

হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হুমকি

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৩

হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান পাল্টাপাল্টি হুমকি

# সিরিয়া-লেবাননে একযোগে ইসরাইলের হামলা

# যুক্তরাজ্যকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বললেন নেতানিয়াহু

ইরানের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানকে ‘সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করার’ পরপরই তিনি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ হিসেবে ঘোষণা করবেন। গতকাল শুক্রবার নিউইয়র্কে এক সমাবেশে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প এ কথা বলেছেন। তার এমন বক্তব্যে কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ইরান।

নিউইয়র্কে সমর্থকদের উদ্দেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শিগগিরই এই নৌপথের মালিকানা দাবি করবে। নৌপথটি বিশ্বব্যাপী তেল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও সার সরবরাহের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

ট্রাম্প বলেন, 'ইরানকে পরাজিত করার পর—ওরা অবশ্য এরইমধ্যে চরমভাবে পর্যুদস্ত হচ্ছে—খুব শিগগিরই আমি হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের [মালিকানাধীন] অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করব। সত্যি বলছি।'

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরপরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে নৌ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয় তেহরান। ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন, গুরুত্বপূর্ণ এ সামুদ্রিক নৌপথটি যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে আছে। তবে এর জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এ প্রণালি দেই আগে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবাহিত হতো।

যুদ্ধের আগে হরমুজ উন্মুক্ত ছিল। তবে এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ এখন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি আলোচনার অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত কয়েক মাসে এই এলাকায় নতুন করে সংঘর্ষ শুরু হয়েছে। যুদ্ধে সামরিক অভিযান বন্ধ করতে জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই করে। তবে চুক্তির একটি শর্ত ছিল, ইরানকে 'বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচলের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা' করতে হবে।

পরে উভয় পক্ষই এই সমঝোতা স্মারক লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে এবং মাসের শেষের দিকে আবারও সংঘাত শুরু হয়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান এক অস্বস্তিকর আলোচনার ধারায় প্রবেশ করেছে। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধের তীব্রতা কমলেও তা কোনো পক্ষকেই সন্তুষ্ট করতে পারেনি বা যুদ্ধকে চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে পারেনি।

হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজকে লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে ইরান। তেহরানের দাবি, প্রণালির একাংশ তাদের আঞ্চলিক জলসীমার অন্তর্ভুক্ত; তাই এটি তাদের নিয়ন্ত্রণেই থাকবে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও প্রণালিতে নিজস্ব অবরোধ তৈরি করেছে। চলতি সপ্তাহেই ইরানি বন্দরে পৌঁছানোর চেষ্টার অভিযোগ এনে একটি কার্গো জাহাজে গুলি চালিয়েছে তারা।

শুক্রবার আইন প্রয়োগকারী কর্মকর্তাদের এক সমাবেশে দেওয়া ভাষণে ট্রাম্প এই অবরোধকে অভেদ্য বলে আখ্যা দেন। একে তিনি এ প্রণালির ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য জনসেবামূলক কাজ হিসেবে তুলে ধরেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেন, 'আপনাদের শুধু মনে রাখতে হবে, আমরা যা করছি তা বিশ্বের জন্য একটি মহৎ কাজ। শুধু আমাদের নিজেদের জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্য। এই অবরোধ অপ্রতিরোধ্য। এটি একটি ইস্পাতের দেয়াল।'

যুক্তরাষ্ট্রে এই যুদ্ধ নিয়ে এখনো ব্যাপক অসন্তোষ রয়েছে। জুলাইয়ের শেষের দিকে কুইনিপিয়াক ইউনিভার্সিটির এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৬০ শতাংশ ভোটার ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন সামরিক পদক্ষেপের বিরোধী। গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে এ-ও ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুত কমে আসায় আরও বড় পরিসরে সামরিক অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের হাতে এখন সীমিত বিকল্পই অবশিষ্ট থাকতে পারে।

ট্রাম্পের নতুন এই মন্তব্য ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার পারদ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতিমধ্যে ইরানের আইন ও আন্তর্জাতিক বিষয়ক উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এর কড়া জবাব দিয়েছেন।

গারিবাবাদি লিখেছেন, 'ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের পরাজয়ের পর তিনি শিগগিরই হরমুজ প্রণালিকে মার্কিন অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করবেন। একটি টুইট করে, কিংবা কোনো বিমানবাহী রণতরি পাঠিয়ে, অথবা কোনো অধ্যাদেশ জারি করে বা নির্বাচনি ভাষণের মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দখল করা সম্ভব নয়। ইরান কোনো হুমকিতে ভয় পায় না, আর শক্তি প্রদর্শনেও ভীত নয়।'

সিরিয়া-লেবাননে একযোগে ইসরাইলের হামলা: দক্ষিণ লেবাননের একাধিক এলাকায় হামলা চালিয়েছে দখলদার ইসরাইলি বাহিনী।  সেইসঙ্গে দক্ষিণ সিরিয়ার কুনেইত্রা প্রদেশের গ্রামীণ এলাকায় কৃষিজমিতে আগুন ধরিয়ে দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। গতকাল এসব হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে লেবানন ও সিরিয়ার সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে। 

লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে, ইসরাইলি সেনারা হুলা এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এ ছাড়া যুদ্ধবিমান দিয়ে টাইর জেলার ওয়াদি আদশিত আল-কুসাইর ও মানসুরি শহরেও হামলা করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যম আল-মানার জানিয়েছে, ইসরাইলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়েহ আল-ফাওকার উপকণ্ঠেও হামলা চালায়। পাশাপাশি একটি ইসরাইলি সামরিক হেলিকপ্টার আলি আল-তাহের এলাকায় গোয়েন্দা নজরদারি অভিযান পরিচালনা করে। 

সংবাদমাধ্যমটির দাবি, এসব হামলায় ফসফরাস শেলসহ নিষিদ্ধ অস্ত্র ব্যবহার করা হয়েছে। অন্যদিকে, সিরিয়ার স্থানীয় গণমাধ্যমগুলো বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ইসরাইলি বাহিনী কুনেইত্রা এলাকায় হামলা চালিয়েছে। এতে দক্ষিণাঞ্চলের আল-রাফিদ শহরের কৃষিজমিতে বড় ধরনের আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে ফসলের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। তবে, তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতদের কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে, ইসরাইলের সঙ্গে লেবাননের সরাসরি আলোচনার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন হিজবুল্লাহর নেতা শেখ নাইম কাসেম। তিনি এই আলোচনার কাঠামোকে মার্কিন-ইসরাইলি দাবির কাছে লেবাননের সার্বভৌমত্ব সমর্পণের শামিল বলে অভিহিত করেছেন। তাই লেবানন সরকারকে ইসরাইলের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা থেকে সরে আসার আহ্বান জানিয়েছেন নাইম কাসেম। তিনি এই প্রক্রিয়াকে ব্যর্থ ও অপমানজনক বলে আখ্যায়িত করেছেন।

যুক্তরাজ্যকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বললেন নেতানিয়াহু: ‘বর্তমান যুক্তরাজ্যকে ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন বলা যায়’- এমন মন্তব্য করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তাঁর দেশকে নিয়ে ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো কীভাবে খবর প্রকাশ করে, সেটি বোঝাতে গিয়ে তিনি এ কথা বলেন।

নেতানিয়াহু ‘মেলেখ ব্লিটজার হাইম’ নামের একটি পডকাস্টে অংশ নিয়েছিলেন। যেটি প্রচার হয় বৃহস্পতিবার। সেখানে তিনি যুক্তরাজ্যকে নিয়ে ওই মন্তব্য করেন। 

ইসরায়েলি গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, আলাপের এক পর্যায়ে ব্রিটিশ লেখক র‌্যান্ডলফ চার্চিলের প্রসঙ্গ তোলেন নেতানিয়াহু। জানান, ১৯৬৭ সালের ছয়দিনের যুদ্ধের সময় চার্চিল ইসরায়েলকে নিয়ে ইতিবাচক প্রতিবেদন করতেন।  

এরপর ব্যঙ্গাত্মকভাবে নেতানিয়াহু বলেন, ‘আজকের ব্রিটেনে এমন প্রতিবেদন খুঁজে দেখুন। দেশটিকে আপনি ইসলামিক রিপাবলিক অব ব্রিটেন বলতে পারেন।’ 

যুক্তরাজ্য দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত। পডকাস্টের পরের আলাপে নেতানিয়াহু ২০২২ সালে করা জেডি ভ্যান্সের একটি মন্তব্যের প্রসঙ্গ তোলেন। বর্তমানে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্স তখন বলেছিলেন, ‘যুক্তরাজ্য বিশ্বের প্রথম পারমাণবিক অস্ত্রধারী ইসলামপন্থী দেশ হতে পারে।’

ভ্যান্সের ওই মন্তব্যের প্রতি ইঙ্গিত করে নেতানিয়াহু বলেন, ‘কেউ একজন বলেছিলেন, পারমাণবিক অস্ত্রধারী প্রথম ইসলামিক প্রজাতন্ত্র হবে ব্রিটেন। ইরান যাতে এমন আরেকটি দেশ না হয়, আমরা তা নিশ্চিতের চেষ্টা করছি।’


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন