কলকাতার হোটেলে ভয়াবহ আগুনে ঘুমন্ত ৯ জনের মৃত্যু
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২১:২৮
# নিহত পাঁচ বাংলাদেশির পরিচয় মিলেছে
# স্ত্রী-সন্তান, শ্বশুরসহ পুড়ে মরলেন কুষ্টিয়ার সাংবাদিক
# মরদেহগুলো দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী
# নরেন্দ্র মোদির শোক প্রকাশ
# জরুরি সহায়তায় হেল্পলাইন চালু
ভারতের কলকাতার নিউ মার্কেট থানা এলাকার মির্জা গালিব স্ট্রিটের একটি আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ বাংলাদেশিসহ ৯ জনের মৃত্যু মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আহত ছয়জনকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে মারা যাওয়া পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
বুধবার স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার সম্পাদক গাজী মাহবুব রহমান গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করেন। এর আগে মঙ্গলবার দিনগত রাত দুইটার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে সংবাদ সংস্থা এএনআই জানিয়েছে, নিহত নয়জনই বাংলাদেশি নাগরিক। তারা চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়েছিলেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগুন লাগার সময় হোটেলের বেশিরভাগ লোক ঘুমিয়ে ছিলেন। আগুনের সঙ্গে ঘন ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ায় অনেকে ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। খবর পেয়ে দমকল বাহিনীর চারটি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। তাদের সঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দলের সদস্যরাও উদ্ধারকাজে অংশ নিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে এবং আটকে পড়াদের উদ্ধার করে।
নিহত পাঁচ বাংলাদেশির ৪ জন একই পরিবারের: মারা যাওয়া পাঁচ বাংলাদেশির মধ্যে একই পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়া গেছে।
শনাক্ত হওয়া মৃত ব্যক্তিরা হলেন— কুষ্টিয়া সদর উপজেরার আরুয়াপাড়ার বাসিন্দা ও আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া জেলা প্রতিনিধি দেবাশিস দত্ত (৪০), তার স্ত্রী আফসানা শিম্মিন (২৫), তাদের তার শিশুসন্তান শর্ণশিষ দত্ত (২) এবং দেবাশিসের শশুর মো. আকরাম আলী (৬৪)। নিহতদের বাড়ি কুষ্টিয়া শহরের আড়ুয়াপাড়া এলাকায়। এছাড়া ঢাকার সাভারের বেগুনবাড়ি এলাকার শিশু আহমেদ বাবু (২) এবং ভারতের ঝাড়খণ্ডের গিরিডি জেলার ১৯ বছর বয়সী তরুণ সন্দীপ পাসওয়ান।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, উদ্ধার হওয়া বাকি তিনজনের পরিচয় এখনো পাওয়া যায়নি। তাদের নাম-পরিচয় নিশ্চিত করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কর্তৃপক্ষ। তবে নিহত ৯ জনের শরীরে বড় ধরনের পোড়া দাগ পাওয়া যায়নি। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিষাক্ত ধোঁয়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, আগুনের সময় অনেকে ধোঁয়া থেকে বাঁচতে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ল্যাডার ব্যবহার করে ভবনের বিভিন্ন অংশ থেকে আটকে পড়াদের উদ্ধার করেন।
নিহত দেবাশীষ দত্ত স্থানীয় দৈনিক আজকের আলো পত্রিকার ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি তিনি আজকের পত্রিকার কুষ্টিয়া প্রতিনিধি ও চ্যানেল নাইনের কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এর আগে তিনি এশিয়ান টেলিভিশন, নাগরিক টিভিসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে কুষ্টিয়া প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেছেন।
নরেন্দ্র মোদির শোক প্রকাশ: কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। গতকাল বুধবার সকালে এক্স হ্যান্ডেলে তা পোস্ট করল প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর।
প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের তরফে পোস্ট করা ওই এক্স বার্তায় লেখা হয়েছে, ‘কলকাতায় অগ্নিকাণ্ডে প্রাণহানির খবর শুনে অত্যন্ত মর্মাহত। এই দুর্ঘটনায় যাঁরা তাঁদের প্রিয়জনকে হারিয়েছেন, তাঁদের প্রতি আমার সমবেদনা রইল। আহতরা যেন দ্রুত আরোগ্য লাভ করেন। স্থানীয় প্রশাসন দুর্গতদের সহায়তা করছে।’
মরদেহগুলো দ্রুত ফিরিয়ে আনা হবে: কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় একটি হোটেলে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি নাগরিকদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হবে বলে জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম।
মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ সরকার বহন করবে কি না—সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, নিহতরা শ্রমিক বা প্রবাসী কল্যাণের আওতাভুক্ত না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যবস্থা হয়তো এখানে সরাসরি প্রযোজ্য নয়। তবে নিহতদের পরিবার যদি মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার খরচ বহন করতে না পারে, তাহলে সরকার অবশ্যই বিষয়টি দেখবে।
গতকাল পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি জানান, কলকাতার হোটেল অগ্নিকাণ্ডে পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের মরদেহ শনাক্ত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের চারজন সদস্য রয়েছেন। তিনি বলেন, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, নিহতদের পরিবার চাইলে মরদেহ দেশে আনার খরচ সরকার বহন করবে।
এর আগে কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। দুর্ঘটনায় আহত ও নিহত বাংলাদেশিদের পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে কলকাতায় বাংলাদেশ উপহাইকমিশন একটি সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন চালু করেছে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ‘সংশ্লিষ্ট সকলের সদয় অবগতির জন্য জানানো যাচ্ছে যে, কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বাংলাদেশি নাগরিকদের জরুরি পরিষেবা ও দুর্ঘটনায় আহত ও নিহতদের বাংলাদেশে অবস্থানরত পরিবার পরিজনদের যোগাযোগের প্রয়োজনে একটি সার্বক্ষণিক হেল্পলাইন চালু করা হয়েছে।’
জরুরি যোগাযোগের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. ওমর ফারুক আকন্দ, দ্বিতীয় সচিব (রাজনৈতিক)। তাঁর মোবাইল নম্বর +৯১ ৮২৭৪৮২১৩৫২ এবং হোয়াটসঅ্যাপ নম্বর +৮৮০১৭১৭২৯১২৬৬ ও +৯১৯৯০৩৪২৬১১৯।
এদিকে, পুলিশ জানিয়েছে, হোটেলের তিন তলায় রাত ২টা ৭ মিনিটে আগুন লাগে। আগুন ছড়িয়ে পড়ে অন্তত চারটি ঘরে। চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘুম ভেঙে যায় হোটেলের বাসিন্দাদের। আগুন দ্রুত আশেপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে হোটেলের কক্ষগুলো ঘন কালো ধোঁয়ায় ভরে যায়। এতে হোটেলের বাসিন্দা আতঙ্কিত হয়ে দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করেন। জীবন বাঁচাতে হুড়োহুড়ি করে বাইরে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেন। তবে ধোঁয়ার কারণে হোটেল থেকে বের হওয়ার সুযোগ পাচ্ছিলেন না তারা। অনেকেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
রাত ২টা ৭ মিনিটে ফায়ার সার্ভিসকে অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টি জানানো হয়। খবর পাওয়ার পরপরই ফায়ার সার্ভিসের ৪টি ইঞ্জিন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। এর পাশাপাশি একটি বিপর্যয় মোকাবিলা দলও (ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট টিম) উদ্ধার কাজে যোগ দেয়। দমকলকর্মীরা ভবনের ভেতরে আটকে পড়া মানুষদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। দুই ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনে হোটেলের একাংশ পুড়ে যায়।
প্রাথমিক তদন্তের বরাতে এনডিটিভি জানিয়েছে, হোটেলটিতে ন্যূনতম অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। এই ঘটনায় কলকাতা পুলিশ একটি মামলা করেছে। হোটেলের মালিক ও কর্মীরা পলাতক রয়েছেন। পুলিশ তাদের খুঁজছে।
উদ্ধার অভিযানে গিয়ে ভবনটি থেকে প্রায় ৬০ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, হোটেলের তৃতীয় তলা থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। একটি এয়ার কন্ডিশনার (এসি) বিস্ফোরণের কারণে এই আগুন লেগে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
দমকলকর্মীরা হোটেলের ভেতর থেকে অজ্ঞান অবস্থায় ৯ জনকে উদ্ধার করে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। হাসপাতাল সূত্রে খবর, তাদের সকলকেই মৃত অবস্থায় আনা হয়েছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় আহত কয়েকজনকে কলকাতা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। পুলিশ এলাকাটি ঘিরে রেখে ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে। গুরুতর আহত ৬ জনের চিকিৎসা চলছে কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে।
আগুন লাগার সঠিক কারণ এখন পর্যন্ত নিশ্চিত করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ। এসি বিস্ফোরণের কারণে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখার কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
আগুনে নিহতরা বাংলাদেশি বলে ভারতীয় গণমাধ্যম এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তারা চিকিৎসার জন্য সেখানে গেছেন। নিহতদের মধ্যে ছয়জন পুরুষ, দুজন নারী ও একটি শিশু রয়েছে বলে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। আহত ছয়জনকে এসএসকেএম হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা সংবাদ সংস্থা পিটিআইকে বলেন, ‘ঘন ধোঁয়ার কারণে দমকলকর্মীদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়েছিল। আগুনে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। আরও মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে।’
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

