Logo

আন্তর্জাতিক

যুদ্ধবিরতি নয়, অবসান চায় ইরান

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ আগস্ট ২০২৬, ২১:৩০

যুদ্ধবিরতি নয়, অবসান চায় ইরান

# ইরানের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা নেই: ট্রাম্প

# ইরান-আমিরাত বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত 

# উপসাগরীয় দেশগুলোকে ফের হুঁশিয়ারি ইরানের

ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের অধীনে পররাষ্ট্রনীতিতে প্রতিবেশী দেশগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানো এবং প্রতিবেশীদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জোরদারে ইরান কাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। 

মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আরাঘচি বলেন, ড. পেজেশকিয়ানের প্রশাসনের অধীনে প্রতিবেশী দেশগুলোকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, এই নীতির অংশ হিসেবে প্রতিটি প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যে কোনো উত্তেজনা দূর করা এবং বৃহত্তর প্রতিবেশী সম্পৃক্ততার পাশাপাশি প্রাদেশিক কূটনীতি অনুসরণ করা হচ্ছে।

সাম্প্রতিক অস্থিরতার সময় সহযোগিতার জন্য প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রশংসা করেন আরাঘচি। তিনি বলেন, কয়েকটি প্রতিবেশী দেশ ইরানকে পণ্য ও ওষুধ সরবরাহ করেছে। এছাড়া এসব দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে আটকে পড়া ইরানিদের দেশে ফেরার সুযোগ দেওয়া হয়েছে এবং ইরানি বিমানকে তাদের আকাশসীমা ব্যবহারের অনুমতিও দেওয়া হয়েছে।

যুদ্ধের শুরুর দিকে যুদ্ধবিরতির আহ্বান ইরান প্রত্যাখ্যান করেছিল বলেও জানান আরাঘচি। তিনি বলেন, আমরা যুদ্ধবিরতি চাই না; আমরা যুদ্ধের অবসান চাই।  আরাঘচি বলেন, যে সংঘাত যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে থেমে যাওয়ার পর কয়েক মাস পর আবার শুরু হয়েছিল, ইরান চায় না সেটি একটি ধারায় বা নিয়মে পরিণত হোক।

ইরানের সঙ্গে আলোচনার পরিকল্পনা নেই- ট্রাম্প: ইরানের সঙ্গে কোনো আলোচনা চলছে না এবং পরিকল্পনাও নেই বলে জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গত মঙ্গলবার তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের নৌবাহিনীর কঠোর অবরোধের মুখে হরমুজ প্রণালী খোলা রয়েছে।

ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে বর্তমানে কোনো আলোচনা বা কথাবার্তা চলছে না, এমন কোনো বৈঠকও নির্ধারিত নেই।’

তিনি আরও যোগ করেন, নৌবাহিনীর এই অবরোধ পুরোপুরি বহাল ও কার্যকর রয়েছে। হরমুজ প্রণালী খোলা আছে এবং স্বাভাবিকভাবে চালু রয়েছে। সব মাইন অপসারণ করা হয়েছে কিংবা ধ্বংস করা হয়েছে।

একজন মার্কিন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সিএনএন মঙ্গলবার জানিয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষদূতদের ইরানের সঙ্গে আলোচনা স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। 

সিএনএনের পরিচিত একটি সূত্রের মতে, হোয়াইট হাউসের কর্মকর্তারা সম্প্রতি রাজনৈতিক মিত্রদের জানিয়েছেন, তারা কৌশল পরিবর্তন করছেন– অর্থাৎ ‘যত দ্রুত সম্ভব ইরানে আঘাত হানা’ থেকে সরে এসে ধীরে ধীরে তাদের ‘দমিয়ে রাখা’র নীতিতে যাচ্ছেন।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, কর্মকর্তারা জানিয়েছেন ট্রাম্পের সঙ্গে দেশটির কিছু ‘ইতিবাচক আলোচনার’ পরেই তিনি তার আলোচনাকারী দলকে–যার মধ্যে রয়েছেন উপরাষ্ট্রপতি জেডি ভ্যান্স এবং দূত স্টিভ উইটকফ ও জারেড কুশনার–তেহরানের সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করার নির্দেশ দিয়েছেন।

এদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্প মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সামাজিক মাধ্যমে একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছেন। সেখানে হরমুজ প্রণালিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড বা অঞ্চল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্য দিয়ে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথটির সার্বভৌমত্ব দাবির হুমকিকে তিনি আরও জোরালো করলেন।

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্পের প্রকাশিত মানচিত্রে হরমুজ প্রণালির ওপর বৃত্ত আঁকা হয়েছে। ওপরে লেখা- ‘নতুন মার্কিন ভূখণ্ড’। পৃথক আরেকটি পোস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট লিখেছেন, ‘ইরানের সঙ্গে কোনো ধরনের আলোচনা চলছে না। পরে হওয়ারও পরিকল্পনা নেই। নৌ অবরোধ সম্পূর্ণভাবে কার্যকর আছে। হরমুজ প্রণালী উন্মুক্ত ও সেখানে চলাচল স্বাভাবিক। সমস্ত মাইন সরিয়ে ফেলা অথবা নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে।’

ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থগিত আমিরাতের: ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য ও আর্থিক লেনদেন স্থগিতের ঘোষণা দিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক আঞ্চলিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) এই কড়া পদক্ষেপ নেয় আবুধাবি।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যোগাযোগ বিষয়ক পরিচালক আফরা আল হামেলি এক বিবৃতিতে জানান, ‘চলমান আঞ্চলিক উত্তেজনার কথা বিবেচনা করে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ইরানের সঙ্গে সব ধরনের বাণিজ্য, বাণিজ্যিক লেনদেন এবং আর্থিক ট্রানজেকশন বন্ধ রাখা হয়েছে।’

বাণিজ্য বন্ধের এই ঘোষণার প্রায় দুই ঘণ্টা আগে আমিরাতের বাসিন্দাদের ফোনে সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জরুরি সতর্কতা সংকেত দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো সেই বার্তায় বাসিন্দাদের অবিলম্বে নিকটস্থ নিরাপদ ভবনে আশ্রয় নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও অল্প সময় পর তা তুলে নেওয়া হয়। 

উল্লেখ্য, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি ইরানি হামলার বড় লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। এ সময় দেশটিতে প্রায় ৩,০০০ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়, যা এই অঞ্চলের মধ্যে সর্বোচ্চ। তবে জুনে দুই দেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক কার্যকর হওয়ার পর কিছুদিন হামলা বন্ধ ছিল। সম্প্রতি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি ‘এডনক’-এর একাধিক তেল ট্যাংকার বারবার হামলার শিকার হয়েছে। 

নিরাপত্তা সতর্কতার পরপরই আমিরাত অভিযোগ তোলে যে, ইরান পারস্য উপসাগরের বাণিজ্যিক জাহাজ লক্ষ্য করে দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সমুদ্রসীমায় দুটি ক্ষেপণাস্ত্র শনাক্ত করা হয়, যার মধ্যে একটি আঞ্চলিক সীমার বাইরে এবং অন্যটি জলসীমার ভেতরে সাগরে গিয়ে পড়ে। বিজ্ঞপ্তিতে দাবি করা হয়, হামলাগুলো আন্তর্জাতিক নৌ-চলাচলকে লক্ষ্য করে চালানো হয়েছে। তবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের এই অভিযোগ সম্পূর্ণরূপে প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাইল বাকায়ি দাবি করেন, ইরান কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেনি। আরব আমিরাতের এমন দাবি আঞ্চলিক নিরাপত্তামূলক প্রচেষ্টার জন্য ক্ষতিকর। তবে তা সত্ত্বেও, ইরান কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো চূড়ান্ত শান্তি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ‘হরমুজ প্রণালি’ বন্ধ রাখা হবে। উল্লেখ্য, আমিরাতের বন্দরগুলো থেকে সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্য পাঠানোর জন্য এই প্রণালি ব্যবহার করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

উপসাগরীয় দেশগুলোকে ফের ইরানের হুঁশিয়ারি: আঞ্চলিক উত্তেজনার মধ্যে মার্কিন সামরিক বাহিনীকে কোনো ধরনের সুবিধা দেওয়ার বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ইরানের চিপ অব স্টাফ মেজর জেনারেল আলী আবদুল্লাহি। গতকাল বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বার্তায় তিনি এই কথা জানান। আনাদোলু এজেন্সির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।

উপসাগরের দক্ষিণ উপকূলের যেসব দেশ তেহরানের বিরুদ্ধে তাদের ভূখণ্ড ব্যবহারের অনুমতি দেবে না বলে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তাদের উদ্দেশ্যে আবদুল্লাহি বলেন, ‘কোনো কিছুই আমাদের নজর এড়ায় না।’

তিনি উল্লেখ করেন, এই অঞ্চলে অবস্থিত ঘাঁটিগুলোতে বিপুল সংখ্যক মার্কিন সামরিক বিমান, বিশেষ করে আকাশেই জ্বালানি রিফুয়েলিং করার ট্যাঙ্কার বিমানের উপস্থিতি আয়োজক দেশগুলোর অজানা থাকার কথা নয়।

ইরানের চিপ অব স্টাফ কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানান, ‘আগ্রাসী মার্কিন সামরিক বাহিনীকে দেওয়া যেকোনো সহায়তা বা সুবিধাদানকে মার্কিন বাহিনীর সাথে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ হিসেবে গণ্য করা হবে।’


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন