Logo

আন্তর্জাতিক

নেপালে বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১৬৫, দেড় হাজার পর্যটক নিখোঁজ

Icon

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১৩:০৭

নেপালে বন্যায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ১৬৫, দেড় হাজার পর্যটক নিখোঁজ

ছবি: সংগৃহীত

নেপালের তিব্বত সীমান্তে হিমবাহ ধসে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা ১৬০ ছাড়িয়েছে। ধ্বংসস্তূপ ও কাদার স্রোতে ভেসে গেছে বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জনপদ।

বুধবারের (২৬ আগস্ট) এ ঘটনায় ৮০০ জন বিদেশি নাগরিকসহ প্রায় দেড় হাজার পর্যটক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালের পর্যটন মন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) মৃত ও নিখোঁজের সংখ্যা জানিয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে তল্লাশি চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।

এমন একটি পাহাড়ি এলাকায় এ বিপর্যয় ঘটেছে, যা ট্রেকিং ও তীর্থযাত্রার জন্য জনপ্রিয়। নেপাল পুলিশের বরাত দিয়ে রয়টার্স জানিয়েছে, বৃহস্পতিবার সকাল পর্যন্ত ১৬৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।

পুলিশের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া মৃতদেহের মধ্যে ৬৪ জনের লাশ পাওয়া গেছে নিম্নাঞ্চলীয় চিতওয়ান জেলায়। এ ছাড়া পূর্ব নওয়ালপরাসি জেলা থেকে আরও ২৬ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে।

বুধবার সকালে উত্তর নেপালের পাহাড়ি ভোটেকোশি নদীতে এই আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। এর জেরে তিব্বত সীমান্তের কাছে রসুয়া জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।

ভিডিওতে দেখা যায়, সীমান্ত এলাকায় কাদা, পাথর ও পানির প্রবল স্রোত বহু মানুষকে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। নেপাল ও চীন—দুই দেশের কর্মকর্তারাই আশঙ্কা করছেন, হতাহতের সংখ্যা আরও অনেক বেশি হতে পারে।

এদিকে বানের পানি ক্রমাগত বাড়তে থাকায় দেশটির বেশ কয়েকটি প্রশাসনিক এলাকায় উচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। বিশেষ করে জঙ্গল সাফারির জন্য জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র চিতওয়ান জেলাকে রাখা হয়েছে বিশেষ সতর্কতায়।

রয়টার্স লিখেছে, নেপালে ঘরবাড়ি, সড়ক ও বিদ্যুৎ প্রকল্প পানির তোড়ে ভেসে গেছে। আর তিব্বতের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, গিরং জেলার একটি সীমান্ত স্থলবন্দর ধসের মাটির নিচে চাপা পড়ায় তারা বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা করছেন।

এ বিপর্যয়ের মধ্যে বেঁচে যাওয়া নেপালি নাগরিক ৬৮ বছর বয়সী কেশব প্রসাদ বারাল একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিনি রয়টার্সকে বলেন, এটি ছিল কাদার বিশাল এক ঢল, আর সেটা সরাসরি আমাদের দিকে ধেয়ে আসছিল। কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে সেটি আরও উঁচু হতে থাকে। যখন দেখলাম কাদা আমাদের ঘরে ঢুকে পড়েছে, তখন আমি আমার স্ত্রীর হাত ধরে তাকে ছাদে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করি। কিন্তু কাদা তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

তিনি বলেন, চার-পাঁচ ঘণ্টা পর একটি হেলিকপ্টার এসে আমাকে উদ্ধার করে। আমার স্ত্রী এখনো কোথাও কাদার নিচে আছে।

আরেকজন বেঁচে যাওয়া ব্যক্তি জানান, তিনি একটি আমগাছ আঁকড়ে ধরে নিজেকে রক্ষা করেন। সেখান থেকে তিনি দেখতে পান, যে বাড়িতে তিনি কাজ করছিলেন সেটি পানির স্রোতে হারিয়ে যাচ্ছে।

নেপালের কর্মকর্তারা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিলেন, ওই এলাকায় একটি ভূমিকম্পের কারণে হিমবাহের নিচের অংশ ধসে পড়ে বন্যার সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

তবে পরে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানায়, দুর্যোগের সময় রেকর্ড হওয়া চার দশমিক চার মাত্রার যে ভূমিকম্পের কথা প্রাথমিকভাবে বলা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহের পাথর ও বরফ ধসে পড়া এবং ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পনজনিত শক্তি।

নিহত ও নিখোঁজদের অনেকেই কৈলাস ও মানসসরোবরের তীর্থযাত্রী ছিলেন। তিব্বতের এই স্থান হিন্দু, বৌদ্ধসহ বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পবিত্র। হিন্দুদের বিশ্বাস, কৈলাস পর্বত দেবতা শিবের আবাস। এই পর্বতের অবস্থান মানসসরোবর তীরে।

নেপাল ট্যুরিজম বোর্ডের মুখপাত্র সুনীল শর্মা জানিয়েছেন, নিখোঁজ পর্যটকদের মধ্যে ৪৭ জন যুক্তরাষ্ট্রের, ৩৪ জন অস্ট্রেলিয়ার, ৩৩ জন যুক্তরাজ্যের এবং ২৪ জন কানাডার নাগরিক।

যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের এক মুখপাত্র বলেন, নেপালে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত আমেরিকানদের বিষয়ে পররাষ্ট্র দপ্তর অবগত আছে এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি এক এক্সে পোস্টে বলেন, তার দেশও পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।

জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত নেপালের জনগণকে সহায়তা করতে জাতিসংঘের দল ও সহযোগী সংস্থাগুলো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও জনবল পাঠানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম জানিয়েছে, গিরং এলাকায় তিনজন নিহত এবং ২৬৫ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তবে হতাহতের সংখ্যা এখনো যাচাই করা হচ্ছে এবং উদ্ধার অভিযান চলছে।

অস্ট্রেলিয়ার ৩৪ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানিয়েছেন দেশটির প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ।

তিনি বলেন, আপনারা জানেন, নেপাল একটি উন্নয়নশীল দেশ। অস্ট্রেলিয়ায় এমন একটি ঘটনায় যে ধরনের সম্পদ ব্যবহার করা যেত, নেপালের কাছে তা নেই। ফলে তথ্য পাওয়া কঠিন।

দক্ষিণ কোরিয়া জানিয়েছে, একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে কর্মরত তাদের আট নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। মালয়েশিয়া ও জাপানও তাদের নাগরিক নিখোঁজ হওয়ার খবর জানিয়েছে।

নেপাল সীমান্তের তিব্বত অংশ থেকে ধারণ করা সিসিটিভি ভিডিওতে দেখা যায়, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত ভবন ও জনপদ ধ্বংস করে দেওয়ার আগে বহু মানুষ পালানোর চেষ্টা করছেন। ওই স্রোতে অনেক মানুষ প্রাণ হারান।

ক্ষতিগ্রস্ত নুয়াকোট ও ধাদিং এলাকার বাসিন্দাদের নেপাল সেনাবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্রের বাইরে জড়ো হয়ে নিখোঁজ স্বজনদের বিষয়ে তথ্য জানার চেষ্টা করতে দেখা গেছে। ওই কেন্দ্র থেকেই হেলিকপ্টার দিয়ে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে।

ব্যারাকের ফটকের বাইরে পুলিশ নিখোঁজ ব্যক্তিদের নাম লিপিবদ্ধ করছিল। জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় পুরো এলাকায় বিদ্যুৎ ছিল না। ফলে পুলিশ মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট জ্বালিয়ে কাজ চালানোর চেষ্টা করছিল।

দুর্যোগকবলিত এলাকায় ঘরবাড়ি, গাছপালা ও যানবাহন কাদার নিচে চাপা পড়েছে বা পানিতে তলিয়ে গেছে। দিনভর হেলিকপ্টারগুলো ওই এলাকায় চক্কর দিয়ে বেঁচে যাওয়া মানুষদের উদ্ধার করে নিয়ে গেছে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছে, প্ল্যানেট ল্যাবসের স্যাটেলাইট ছবির প্রাথমিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বরফ ও পাথরের ধসের কারণে লেন্দে নদীতে কাদা ও পাথরের বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাধি সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে ওই ঘটনা ঘটে।

কর্মকর্তারা জানান, প্রায় ৫০ হাজার জনসংখ্যার পাহাড়ি জেলা রাসুওয়ার শ্যাপ্রু বেসি ও তিমুরে উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার অবতরণ করতে পারেনি। সেখানে নদীর পানি স্বাভাবিক সীমার অনেক উপরে বইছে।

টেলিভিশনের ভিডিওতে ধসে পড়া বাড়িঘর, পানিতে ভাসতে থাকা গাড়ি এবং পানির তোড়ে ভেসে যাওয়া একটি ধাতব সেতু দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীরা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, পানির স্রোতে গ্রামের পর গ্রাম তলিয়ে গেছে।

রাসুওয়ার স্বাস্থ্যকর্মী তুলা বাহাদুর বিকি রয়টার্সকে বলেন, যেদিকে তাকাই, শুধু ধ্বংসযজ্ঞ। নদীর পাশে থাকা বসতিগুলো পুরোপুরি ভেসে গেছে। আমার নিজের পাঁচজন আত্মীয় নিখোঁজ।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, ভূমিধসে সীমান্তবর্তী গিরং বন্দর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শিগাতসে অঞ্চলের সড়ক, যোগাযোগব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভিকে এক উদ্ধারকর্মী বলেন, তারা গিরং সীমান্তবন্দরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

ড্রোন দিয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে দেখা গেছে, সীমান্তের সব সড়ক পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে।

সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার মিটার উচ্চতা থেকে নেমে আসা কাদামিশ্রিত পানির প্রবল স্রোতের কারণে ভারতের উত্তর প্রদেশ ও বিহারেও বন্যার সতর্কতা জারি করা হয়েছে।

নেপাল সীমান্তবর্তী এ দুই রাজ্যের মধ্য দিয়ে বেশ কয়েকটি নদী পাহাড় থেকে সমতলের দিকে নেমে গেছে।

বিহারের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা ইতোমধ্যে ছয়টি জেলা থেকে প্রায় পাঁচ হাজার মানুষকে সরিয়ে নিয়েছেন। সব মিলিয়ে ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন