নরওয়ের রাজা হ্যারাল্ডের মৃত্যু, নতুন রাজা হাকন
অনলাইন ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৩৫
রাজা পঞ্চম হারাল্ড
নরওয়ের রাজা পঞ্চম হারাল্ড ৮৯ বছর বয়সে মারা গেছেন। বিরল এক ধরনের রক্তজনিত রোগের চিকিৎসার জন্য গত সপ্তাহে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল। অসলো রাজপ্রাসাদ জানিয়েছে, আজ শুক্রবার স্থানীয় সময় সকাল ৬টা ৩৫ মিনিটে অসলো ন্যাশনাল হাসপাতালে তিনি শান্তিপূর্ণভাবে মারা যান। এ ঘটনায় রাজপ্রাসাদের ছাদে থাকা রাজকীয় পতাকা অর্ধনমিত করা হয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, মৃত্যুর আগের ২৪ ঘণ্টায় রাজপরিবারের সদস্যরা রাজাকে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন। এ সময় সাধারণ মানুষ রাজপ্রাসাদের সামনে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। হারাল্ড ছিলেন চতুর্দশ শতাব্দীর পর নরওয়েতে জন্ম নেওয়া দেশটির প্রথম রাজা। তাঁর মৃত্যুর পর তার ৫৩ বছর বয়সী ছেলে হাকন নতুন রাজা হিসেবে সিংহাসনে বসেছেন।
৩৫ বছর সিংহাসনে থাকা হারাল্ডকে নরওয়ের জনপ্রিয় সংস্কারমুখী রাজা মনে করা হয়। তিনি রাজতন্ত্রকে আধুনিক করেছিলেন, রাজপরিবারের দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে একজন সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করেছিলেন এবং নরওয়ের সবচেয়ে কঠিন সময়গুলোতে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ রাখার ভূমিকা পালন করেছিলেন।
রাজপরিবারের পর্যবেক্ষকেরা তাঁকে মাটির কাছাকাছি থাকা, শ্রদ্ধেয় ও ভালোবাসার একজন মানুষ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ তাকে জাতির ‘দাদু’ এবং ‘জনগণের রাজা’ বলে অভিহিত করেছেন। ‘জনগণের রাজা’ উপাধিটি তাঁর বাবা রাজা পঞ্চম ওলাভের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হয়েছিল।
২০১১ সালে অসলো ও উতইয়া দ্বীপে বোমা হামলা ও বন্দুক হামলার পর হারাল্ড নরওয়ের জনগণের প্রতি একে অপরকে সহযোগিতা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তিনি তাদের সতর্ক করে বলেছিলেন, যেন তারা ‘ভয়কে নিয়ন্ত্রণ নিতে না দেয়।’
সাম্প্রতিক সময়ে হারাল্ড ও তাঁর পরিবার স্বাস্থ্যগত নানা সমস্যা এবং কিছু কেলেঙ্কারির মুখোমুখি হয়েছিলেন। এর মধ্যে বিশেষভাবে ছিল তাঁর পুত্রবধূ মেটে-মারিতের প্রয়াত যৌন অপরাধী জেফ্রি এপস্টেইনের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি এবং তার ছেলে মারিয়ুস বর্গ হইবির ধর্ষণের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ঘটনা।
ইতিহাসবিদ এবং টিভি২-এর রাজপরিবারবিষয়ক সংবাদদাতা ওলে-ইয়ের্গেন শুলসরুদ-হানসেন বিবিসিকে বলেন, হারাল্ডের শাসনামলে নরওয়ের রাজতন্ত্র আরও সমতাভিত্তিক ও স্বচ্ছ হয়ে উঠেছিল। বিশেষ করে রাজপরিবারের অর্থ ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন দেখা যায়। নেটাভিসেনের রাজপরিবারবিষয়ক সংবাদদাতা তোভে তালেসেন প্রয়াত রাজাকে ‘আমাদেরই একজন’ বলে বর্ণনা করেছেন। আর সি ও হোর ম্যাগাজিনের রাজপরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যারোলিন ভাগলে বলেছেন, তিনি ‘সবসময়ই জনগণের খুব কাছের ছিলেন’।
নরওয়ের জাতীয় ফুটবল দল যুক্তরাষ্ট্র থেকে দেশে ফেরার পরও হারাল্ড তাদের রাজপ্রাসাদে স্বাগত জানিয়েছিলেন। দলটি প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছানোর পর দেশে ফিরেছিল। হারাল্ড তাঁর প্রায় ৫৮ বছরের স্ত্রী রানি সোঞ্জা, তাদের মেয়ে প্রিন্সেস মার্থা লুইস, ছেলে নতুন রাজা হাকন এবং ছয় নাতি-নাতনি রেখে গেছেন।
হারাল্ড ১৯৩৭ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অসলো শহরের কাছে স্কাউগুম এস্টেটে জন্মগ্রহণ করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর দিকে নাৎসি জার্মানির স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলার যখন নরওয়ে আক্রমণের নির্দেশ দেন, তখন হারাল্ডের বয়স ছিল মাত্র তিন বছর। হারাল্ডের মা সন্তানদের নিয়ে সীমান্ত পেরিয়ে সুইডেনে পালিয়ে যান। পরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ফ্র্যাঙ্কলিন ডি. রুজভেল্টের আমন্ত্রণে তাঁরা যুক্তরাষ্ট্রে চলে যান।
যুদ্ধ শেষে প্রিন্স হারাল্ড পরিবারের সঙ্গে নরওয়েতে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি পড়াশোনা শেষ করেন এবং বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। ১৯৫৭ সালে তিনি ক্রাউন প্রিন্স বা যুবরাজ হন। এরপর ১৯৬০ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যালিওল কলেজে সামাজিক বিজ্ঞান, ইতিহাস ও অর্থনীতি নিয়ে পড়াশোনা করেন।
এক ব্যবসায়ীর মেয়ে সোঞ্জা হারালসেনের সঙ্গে একটি অনুষ্ঠানে হারাল্ডের পরিচয় হয়। কিন্তু তাকে বিয়ে করার অনুমতি পাওয়ার জন্য ক্রাউন প্রিন্সকে নয় বছর অপেক্ষা করতে হয়েছিল। তাঁর বাবা রাজা ওলাভ সবসময় চেয়েছিলেন, তিনি যেন কোনো ইউরোপীয় রাজপরিবারের রাজকন্যাকে বিয়ে করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হারাল্ড তাঁর বাবাকে জানান, সোঞ্জাকে বিয়ে করতে না দিলে তিনি সারা জীবন অবিবাহিত থাকবেন। নরওয়ের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমকে রাজা হারাল্ড নিজেই এই কথা জানিয়েছিলেন।
শেষ পর্যন্ত তাঁর বাবা বিয়েতে সম্মতি দেন। ১৯৬৮ সালের ২৯ আগস্ট অসলো ক্যাথেড্রালে তাদের বিয়ে হয়। হারাল্ডের এই সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে তার নিজের দুই সন্তানকেও সাধারণ নাগরিককে বিয়ে করার পথ তৈরি করে দেয়। রাজপরিবারবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যারোলিন ভাগলের মতে, এই সিদ্ধান্ত ‘অত্যন্ত পুরুষ-প্রধান রাজপরিবারের অবসান ঘটাতে সহায়তা করেছিল’। তিনি বলেন, ‘তিনি কখনোই আবেগ, রসবোধ বা নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে ভয় পাননি। আর এ কারণেই তিনি এতটা মানবিক হয়ে উঠেছিলেন।’
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

