হুতিদের হামলা অব্যাহত, সৌদিতে সতর্কতা জারি
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯:৪৩
# ইয়েমেনে ৫৮ বিমান অভিযান সৌদির
# হুতিদের নিন্দা ও রিয়াদকে সমর্থনের আশ্বাস শেহবাজের
ইয়েমেনের সবচেয়ে বেশি জনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং দেশটির উত্তরাঞ্চলের বড় একটি অংশ হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। গত জুলাইয়ে সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে হুতিরা। এরপর থেকে তারা সৌদি আরবের দিকে হামলা চালিয়ে আসছে। হুতিদের এসব হামলার লক্ষ্য ছিল লোহিত সাগরে চলাচলকারী সৌদি জাহাজ। হামলার কারণে ওই অঞ্চলে সৌদি জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন করে নিরাপত্তা উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
এদিকে, সৌদি আরবের চারটি শহরে সতর্কতা জারি করেছিল দেশটির বেসামরিক প্রতিরক্ষা কর্তৃপক্ষ। শহরগুলো হলো নাজরান, খামিস মুশাইত, জাজান ও আবহা। পরে খামিস মুশাইত ও আবহা শহরের জন্য আবারও সতর্কতা জারি করা হয়। তবে কিছু সময় পর এসব সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।
সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত শহরে অবস্থিত কিং খালিদ বিমান ঘাঁটিতে ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠী। গতকাল সোমবার হুথির সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি এক বিবৃতিতে এ দাবি করেছেন।
সামরিক মুখপাত্র বলেন, ঘাঁটির হ্যাঙ্গার, রাডার, রানওয়ে ও অস্ত্রভান্ডার লক্ষ্য করে ডজন ডজন ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছোড়া হয়েছে। হামলায় ঘাঁটিতে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে এ বিষয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হুতির ভাষ্য, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সাম্প্রতিক বিমান হামলার জবাবেই সৌদি ভূখণ্ডে এই হামলা চালানো হয়েছে। গত পাঁচ দিনে ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায় সৌদি যুদ্ধবিমান তিন শতাধিক হামলা চালিয়েছে বলেও অভিযোগ করেছে গোষ্ঠীটি।
এদিকে খামিস মুশাইত এলাকায় সাময়িক সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি সিভিল ডিফেন্স। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার কথা জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে থাকার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ভিড় এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ইয়েমেনে সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকলে সৌদি ভূখণ্ডে হামলার মাত্রা আরও বাড়ানোর হুমকিও দিয়েছে হুতি।
২০১৪ সালে ইয়েমেনের রাজধানী সানা দখলের পর থেকে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সংঘাতে রয়েছে হুতি গোষ্ঠী। এক দশকের বেশি সময় ধরে চলা এই সংঘাতে সাম্প্রতিক পাল্টাপাল্টি হামলায় উত্তেজনা আবারও বেড়েছে।
ইয়েমেনে ৫৮ বিমান অভিযান সৌদির: ইরানের মদতপুষ্ট হুথি বিদ্রোহীদের বিভিন্ন স্থাপনা লক্ষ্য গত শনিবার রাত থেকে রোববার রাত পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ইয়েমেনে ৫৮টি বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে সৌদি আরব। হুথি গোষ্ঠীর সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারী এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বার্তায় ইয়াহিয়া সারী বলেন, ‘গত ২৪ ঘণ্টায় অপরাধী সৌদি শত্রুরা ইয়েমেনে ৫৮টি বিমান অভিযান চালিয়েছে।’
ইয়েমেনের হুথিপন্থি টেলিভিশন চ্যানেল আল মাসিরাহ তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, উত্তর ইয়েমেনের সা’দা, মোনাব্বিহ জেলা এবং আল জৌফ প্রদেশে পরিচালনা করা হয়েছে এসব অভিযান। এই তিন এলাকাই হুথি বাহিনীর শক্তিশালী ঘাঁটি এলাকা।
শনিবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলীয় সারুরাহ সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল সৌদি, তার পাল্টা জবাব দিতেই সৌদি বিমান বাহিনী এসব বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আগস্টের শেষ সপ্তাহ থেকে হুথি গোষ্ঠীর সঙ্গে তীব্র উত্তেজনা শুরু হয়েছে সৌদি আরবের। ইতোমধ্যে কয়েক দফা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা করে সৌদি আরবের জ্বালানি খাতের উল্লেখযোগ্য ক্ষয়ক্ষতির পর গত ১১ সেপ্টেম্বর রাতে লোহিত সাগর ও এডেন সাগরকে সংযুক্তকারী বাব এল মান্দেব প্রণালি দখল করেছে হুথি যোদ্ধারা, যা সৌদির জন্য বড় দুঃসংবাদ। কারণ, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বাব এল মান্দেব প্রণালি দিয়ে এত দিন নিজেদের অধিকাংশ জ্বালানি তেল রপ্তানি করে আসছিল সৌদি আরব।
গত ৮ সেপ্টেম্বর থেকে ইয়েমেনে বিমান অভিযান পরিচালনা করছে সৌদি আরব। হুথি বিদ্রোহীদের তথ্য অনুযায়ী রোববারের আগ পর্যন্ত ১৩০টিরও বেশি বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে সৌদি বিমানবাহিনী।
ইয়েমেনের সেনাবাহিনীও উত্তর ইয়েমেন এবং রাজধানী সানা-কে হুথিদের দখলমুক্ত করতে অভিযানে নেমেছে। সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের কোনো মুখপাত্র ইয়েমেনে সাম্প্রতিক বিমান অভিযান নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি, তবে এক প্রতিবেদনে এএফপি জানিয়েছে, সৌদির বিমান অভিযানগুলো এখন পর্যন্ত মূলত সম্মুখসারিতে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর সহায়তার ওপরই সীমাবদ্ধ আছে; রাজধানী সানা-সহ হুথিদের ক্ষমতার মূল কেন্দ্রগুলোকে এখনও লক্ষ্যবস্তু করা হয়নি।
হুতিদের নিন্দা ও রিয়াদকে সমর্থনের আশ্বাস শেহবাজের: সৌদি আরবের বেসামরিক ও অর্থনৈতিক অবকাঠামোর ওপর ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনীর সাম্প্রতিক হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ। গত রোববার সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে ফোনে আলাপকালে তিনি এই নিন্দা জানান এবং সৌদি নেতৃত্ব ও জনগণের প্রতি পাকিস্তানের পূর্ণাঙ্গ সংহতি প্রকাশ করেন।
টেলিফোন আলাপে শেহবাজ শরিফ বলেন, হুতি হামলা শুধু আঞ্চলিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্যই হুমকি নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতি ও জ্বালানি সরবরাহকেও মারাত্মক ঝুঁকিতে ফেলবে। এ ছাড়া সংঘাত নিরসনে তিনি সৌদি যুবরাজের বিচক্ষণ নেতৃত্বের প্রশংসা করেন। জবাবে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় পাকিস্তানের অটল সমর্থনের কথা স্বীকার করে দুই দেশের মধ্যে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ বজায় রাখার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।
সম্প্রতি সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ত্রিপক্ষীয় ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ স্বাক্ষরের পর ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা সৌদি ভূখণ্ডে হামলা চালালে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ শুরুতে সামরিক পদক্ষেপের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। তবে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে সরাসরি জড়ালে নিজস্ব নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি হওয়া এবং প্রতিবেশী ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টি মাথায় রেখে পাকিস্তান দ্রুতই অবস্থান স্পষ্ট করে জানায়—চুক্তিটি শুধু আত্মরক্ষামূলক, তাই সরাসরি যুদ্ধে নামার কোনো বাধ্যবাধকতা তাদের নেই। সরাসরি সামরিক সহায়তা থেকে পাকিস্তানের এই পিছু হটায় রিয়াদের সঙ্গে তৈরি হওয়া সম্ভাব্য ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক রাখতেই মূলত প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ সৌদি যুবরাজকে ফোন করে সার্বিক সমর্থনের কথা জানিয়েছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে জানা গেছে, আগামী ২৩ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন শেহবাজ শরিফ। সেই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের মাত্র কয়েক দিন আগেই সৌদি যুবরাজের সঙ্গে এই সৌহার্দ্যপূর্ণ ফোনালাপ হলো, যা ওয়াশিংটন ও রিয়াদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় ইসলামাবাদের জন্য একটি বিশেষ পদক্ষেপ বলে মনে করা হচ্ছে।
সম্প্রতি ইয়েমেনের যুদ্ধ পরিস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। হুতি বাহিনী লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোখা বন্দর এবং বাব এল-মানদেব প্রণালির কাছের একটি দ্বীপ দখল করে নেওয়ায় বৈশ্বিক নৌপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এতে করে সৌদি-সমর্থিত সরকারি বাহিনীর সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ চরম আকার ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

