যুক্তরাষ্ট্রকে ৫ দিনের আলটিমেটাম ইরানের
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৩৫
# ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব
# মাথা নত করবে না ইরান: পেজেশকিয়ান
কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য পাঁচ দিনের সময়সীমা দিয়েছে ইরান। শর্ত না মানলে প্রণালিটি বন্ধই থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব মেজর জেনারেল মোহসেন রেজাই। নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সাইডলাইনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যেই ইরান এ অবস্থান জানিয়েছে।
এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি ‘রোডম্যাপ’ বা কর্মপরিকল্পনা দিয়েছে ইরান। এতে পুরো অঞ্চলে সর্বোচ্চ ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতি, ধাপে ধাপে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া এবং সংঘাত অবসানে বড় পরিসরে আলোচনার সময়সূচির প্রস্তাব রয়েছে বলে আঞ্চলিক কয়েকটি সূত্র জানিয়েছে। সূত্রগুলোর দাবি, ইরানের প্রস্তাবে আরব প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলা বন্ধের বিষয়টিও রয়েছে।
নিউইয়র্কে অবস্থানরত ইরানি কর্মকর্তারা বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের সুযোগ এখনো রয়েছে। তবে যেকোনো চুক্তিতে ইরানের দাবিগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। এর মধ্যে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টিও রয়েছে।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন কূটনীতির পথের জন্য এখনো উন্মুক্ত। তবে সামরিক পদক্ষেপের সম্ভাবনাও তারা ধরে রেখেছে। দুই পক্ষের অবস্থান এখনো বেশ কঠোর। ফলে আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় পৌঁছানোর সুযোগ কতটা তৈরি হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
এদিকে কূটনৈতিক তৎপরতার মধ্যেই ইরান ও দেশটির আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে জড়িত হামলায় আরব উপদ্বীপের আশপাশে জাহাজ চলাচল ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হরমুজ প্রণালিতে উত্তেজনা কমানো এবং জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে কাতার পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করছে।
ইরানের শর্তগুলো যুক্তরাষ্ট্রের কাছে জাতিসংঘের বৈঠকের সময় পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। ইরানি কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে তেহরান প্রস্তুত।
এর আগে এক জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, যুক্তরাষ্ট্র সামরিক চাপ কমিয়ে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর অবরোধ তুলে নিলে এক সপ্তাহের মধ্যে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া সম্ভব। ইরানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রথমে কূটনৈতিকভাবে সংকট সমাধানের ইচ্ছা আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করারও আহ্বান জানানো হয়েছিল।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার জন্য ইরান যে শর্তগুলো তুলে ধরেছে, তার মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ অবিলম্বে প্রত্যাহার, ইরানের জব্দ করা সম্পদ মুক্ত করা এবং ইরান যেসব ‘রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’-এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে উল্লেখ করে, সেসব এলাকায় যুদ্ধের অবসান।
২৩ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনা হয়। এতে জ্যারেড কুশনারও যুক্ত ছিলেন বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ইরানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বৈঠকে নতুন কোনো শর্ত উপস্থাপনের পরিবর্তে তেহরানের বিদ্যমান শর্তগুলোই যুক্তরাষ্ট্রের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও বাণিজ্যিক নৌপথ। ফলে এর দীর্ঘস্থায়ী বন্ধাবস্থা বা সীমিত চলাচল আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথের বাণিজ্য এবং আমদানিনির্ভর দেশগুলোর ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের জন্যও বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ২৩ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সাইডলাইনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে বৈঠকে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতির কারণে বাংলাদেশি জাহাজ ও কনটেইনারের চলাচল এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন। বাংলাদেশ হরমুজ দিয়ে বাংলাদেশি জাহাজ ও কনটেইনারের নিরাপদ চলাচলে ইরানের সহযোগিতাও চেয়েছে।
বাংলাদেশ মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের দ্রুত কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে এবং নিজেদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রেখে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
ফলে হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার প্রশ্নটি এখন শুধু ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের বিষয় নয়; এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈশ্বিক বাণিজ্য, মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত প্রবাসীদের নিরাপত্তা এবং বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশগুলোর অর্থনৈতিক স্বার্থও সরাসরি যুক্ত।
এদিকে ইরানের বিমান চলাচল বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সহযোগিতা করা প্রতিবেশী দেশগুলোকেও সতর্ক করেছেন তিনি। ইরানের বিমানকে নিজেদের বিমানবন্দর ব্যবহারের সুযোগ না দিলে এসব দেশের বিমানবন্দর অচল করে দেওয়ার ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি দেন।
মাথা নত করবে না ইরান- পেজেশকিয়ান: যুক্তরাষ্ট্রের হুমকি ও চাপের মুখে ইরান কখনো মাথা নত করবে না বলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে স্পষ্ট হুঙ্কার দিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প কর্তৃক ইরানকে চিরতরে ধূলিসাৎ করার হুমকির পরদিনই তিনি পাল্টা এই প্রতিক্রিয়া জানান।
ট্রাম্পকে উদ্দেশ্য করে পেজেশকিয়ান জানান, নিষেধাজ্ঞা, অতিরিক্ত চাপ ও হুমকি বাড়লে ইরানি জনগণের প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী হবে। তিনি বলেন, ‘আমরা কখনোই মাথা নত করব না কিংবা হাঁটু গেড়ে বসে পড়ব না।’ তা সত্ত্বেও ইরান শান্তির স্বার্থে কূটনৈতিক আলোচনার পথ খোলা রেখেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ভাষণের শুরুতে পেজেশকিয়ান ইরানের সংঘাতের প্রথম দিকে নিহত ৮৬ বছর বয়সী সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির একটি ছবি হাতে তুলে ধরেন। ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম আঘাতেই তিনি নিহত হয়েছিলেন। এর পাশাপাশি মার্কিন বিমান হামলায় নিহত হওয়া বেশ কিছু ইরানি শিশু এবং তাদের কবরের ছবি পুরো অধিবেশনের সামনে তুলে ধরেন পেজেশকিয়ান।
পরমাণু কর্মসূচি সংক্রান্ত আলোচনার মধ্যেই গত ফেব্রুয়ারিতে ইরানের ওপর যৌথ আক্রমণ চালায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। এরপর দুটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিল হয়ে যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর পাশাপাশি ইয়েমেন এবং লেবাননেও ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

