‘বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবুক’ প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা
কপিরাইট সুরক্ষায় খোশরোজ কিতাব মহলের পক্ষে হাইকোর্টের রায়
মাসুম আহম্মেদ
প্রকাশ: ১৫ জুলাই ২০২৬, ১৩:৪৭
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ প্রায় সাত দশক ধরে আইনজীবী, বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, আইন শিক্ষার্থী এবং বিচারপ্রার্থীদের কাছে নির্ভরযোগ্য রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে ‘বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবুক’। বহুল প্রচারিত এই আইনগ্রন্থকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের কপিরাইট বিরোধের অবসান ঘটিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।
আদালত স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, কামরুল বুক হাউস আর এই বই প্রকাশ, মুদ্রণ কিংবা বাজারজাত করতে পারবে না।
সংশ্লিষ্টদের মতে, এ রায় শুধু একটি বইয়ের প্রকাশনা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি নয়; বরং বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে কপিরাইট সুরক্ষা এবং মেধাস্বত্ব রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।
বুধবার (১৫ জুলাই) বিচারপতি মোহাম্মদ উল্লাহ ও বিচারপতি মো. লুৎফর রহমান সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এ রায় দেন। আদালতে আবেদনকারীর পক্ষে শুনানি করেন অ্যাডভোকেট এস এম আরিফ মন্ডল।
আদালতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, খোশরোজ কিতাব মহল ১৯৫৮ সালে প্রথম ‘পুলিশ হ্যান্ডবুক’ নামে একটি সংকলন প্রকাশ করে। বইটিতে এক মলাটে স্থান পায় ফৌজদারি কার্যবিধি, দণ্ডবিধি, সাক্ষ্য আইন এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মাইনর অ্যাক্টস। আইন পেশার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের কাছে এটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বইটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবুক’। এরপর প্রতিটি আইন সংশোধন, নতুন বিধান, বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং প্রাসঙ্গিক পরিবর্তন যুক্ত করে ধারাবাহিকভাবে নতুন সংস্করণ প্রকাশ হতে থাকে। বর্তমানে বইটির ৪২তম সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছে।
কিন্তু বইটির ব্যাপক বাজারচাহিদাকে কেন্দ্র করে কপিরাইট বিরোধের সৃষ্টি হয়। অভিযোগ ওঠে, মূল প্রকাশকের অনুমতি ছাড়াই কামরুল বুক হাউস একই নামে বই মুদ্রণ ও বিক্রি করে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিকভাবে লাভবান হয়ে আসছিল।
শুনানিতে আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী এস এম আরিফ মন্ডল আদালতকে জানান, বৈধ প্রকাশক হিসেবে খোশরোজ কিতাব মহলই দীর্ঘদিন ধরে বইটির প্রকাশনা, সম্পাদনা ও হালনাগাদ সংস্করণ প্রকাশ করে আসছে। অথচ কপিরাইট আইনের বিধান উপেক্ষা করে অপর একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান একই বই বাজারজাত করছে, যা মেধাস্বত্বের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।
তিনি আদালতে আরও যুক্তি তুলে ধরেন, বইটির জনপ্রিয়তা ও বাজারমূল্য বিবেচনায় অবৈধ পুনর্মুদ্রণ শুধু প্রকাশকের আর্থিক ক্ষতিই করেনি, বরং পাঠকদের মাঝেও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছে। কারণ একই নামে একাধিক সংস্করণ বাজারে থাকলে কোনটি প্রকৃত ও হালনাগাদ সংস্করণ- তা নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের আইনবিষয়ক প্রকাশনার ইতিহাসে ‘বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবুক’ একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। আদালতে জানানো হয়, বইটির প্রথম অনুবাদক ও রচয়িতা ছিলেন অ্যাডভোকেট অধ্যাপক এটিএম কামরুল ইসলাম।
পরবর্তীতে দেশের খ্যাতিমান আইনবিদ, গবেষক ও আইনগ্রন্থ রচয়িতা মরহুম গাজী শামসুর রহমান বইটির ব্যাপক সংশোধন, সংযোজন ও আধুনিকায়নের দায়িত্ব পালন করেন। নতুন আইন, সংশোধনী, গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক সিদ্ধান্ত এবং প্রশাসনিক পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তিনি বইটিকে সময়োপযোগী রূপ দেন।
পরবর্তীকালে বিচারপতি সিদ্দিকুর রহমান মিয়া বইটির সর্বশেষ হালনাগাদ সংস্করণে প্রয়োজনীয় সংযোজন ও সংশোধনের কাজ অব্যাহত রাখেন। ফলে কয়েক প্রজন্ম ধরে আইনবিদদের শ্রম, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার সমন্বয়ে বইটি দেশের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আইনগ্রন্থে পরিণত হয়েছে।
বুধবার বেশ কয়েকজন আইনজীবী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, একটি বইয়ের কপিরাইট শুধু লেখকের নয়; প্রকাশক, সম্পাদক এবং গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও সৃজনশীল শ্রমের স্বীকৃতি বহন করে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অনুমতি ছাড়া একই বই প্রকাশ করলে তা শুধু কপিরাইট লঙ্ঘন নয়, বরং বৈধ প্রকাশকের ব্যবসায়িক অধিকারও ক্ষুণ্ন করে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী মোহাম্মদ আলী বলেন, আইনবিষয়ক বইয়ের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও সংবেদনশীল। কারণ একটি ভুল, অসম্পূর্ণ বা পুরোনো সংস্করণ আদালতের কার্যক্রম, আইনচর্চা কিংবা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। হাইকোর্টের এই সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে কপিরাইট লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা হিসেবে কাজ করবে।
দেশে প্রতিবছর অসংখ্য বই প্রকাশিত হলেও কপিরাইট লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন নয়। জনপ্রিয় আইনগ্রন্থ, শিক্ষা সহায়ক বই এবং বিভিন্ন পরীক্ষার গাইড বই প্রায়ই অনুমতি ছাড়া পুনর্মুদ্রণের অভিযোগের মুখে পড়ে।
প্রকাশনা সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, অনেক সময় বইয়ের প্রচ্ছদ, বিন্যাস কিংবা নাম সামান্য পরিবর্তন করে বাজারজাত করা হয়। এতে লেখক, প্রকাশক ও প্রকৃত স্বত্বাধিকারীরা আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি নৈতিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন।
তাদের মতে, আদালতের এই রায় ভবিষ্যতে প্রকাশকদের আরও সতর্ক করবে এবং বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো বই প্রকাশের প্রবণতা কমাতে সহায়ক হবে।
সংশ্লিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, মেধাস্বত্ব রক্ষায় আদালতের এই অবস্থান অত্যন্ত সময়োপযোগী। বাংলাদেশে কপিরাইট আইন কার্যকর থাকলেও বাস্তবে এর প্রয়োগ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। অনেক লেখক ও প্রকাশক বছরের পর বছর আইনি প্রতিকার না পেয়ে ক্ষতির মুখে পড়েন।
তাদের মতে, এই রায় কেবল একটি বইয়ের স্বত্ব রক্ষাই করেনি; বরং সৃজনশীল কর্মের প্রতি আইনের সুরক্ষা যে বাস্তব ও কার্যকর- সেই বার্তাও দিয়েছে।
হাইকোর্টের রায়ের ফলে কামরুল বুক হাউস আর ‘বাংলাদেশ পুলিশ হ্যান্ডবুক’ প্রকাশ, মুদ্রণ কিংবা বিক্রি করতে পারবে না। অন্যদিকে খোশরোজ কিতাব মহল বৈধ প্রকাশক হিসেবে পূর্বের মতো বইটির প্রকাশনা ও বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে।
আইন অঙ্গনের পর্যবেক্ষকদের মতে, এ রায়ের মধ্য দিয়ে আদালত একটি স্পষ্ট নীতি তুলে ধরেছেন- জনপ্রিয়তা কোনো বইয়ের মালিকানা তৈরি করে না; আইনি স্বত্বই নির্ধারণ করে কে বৈধ প্রকাশক। লেখক, সম্পাদক ও প্রকাশকের মেধা, শ্রম এবং প্রকাশনা-স্বত্বের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করাই আইনের উদ্দেশ্য। সেই নীতিরই প্রতিফলন ঘটেছে হাইকোর্টের এই রায়ে, যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে কপিরাইট সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য নজির হিসেবে বিবেচিত হবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

