Logo

আইন ও বিচার

আইনমন্ত্রী

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরকার পর্যালোচনা করছে

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ২১:৩৫

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ সরকার পর্যালোচনা করছে

# আমলে নেওয়ার মতো অভিযোগ নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

# ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা’ দেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

# আলাদা কোনো অনুসন্ধান নয়: বাংলাদেশ ব্যাংক

# আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ

# সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্ত চায় রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম

অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল ও সংস্থা থেকে নানাবিধ অভিযোগ উঠছে। এর মধ্যে দুর্নীতি ও আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ এবং জুলাই বিপ্লব ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ অন্যতম। ইতোমধ্যে এনসিপিসহ একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবিও জানিয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেছে ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম’ নামের দুটি সংগঠন। তবে দুদকের চেয়ারম্যান ও ইসলামী ব্যাংকের পরিচালক থাকাকালে ওঠা বিভিন্ন দুর্নীতির অভিযোগ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে পর্যালোচনা করছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।  তিনি বলেন, তদন্ত শেষে জনস্বার্থ বিবেচনায় আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

রোববার দুপুরে চট্টগ্রাম জেলা আইনজীবী সমিতির উদ্যোগে নবীন আইনজীবীদের বরণ ও প্রশিক্ষণ কর্মশালা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী আরও বলেন, ‘সরকার কোনো ব্যক্তির প্রতি অবিচার করতে চায় না। তবে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই চলছে। তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ মিললে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘সরকার সবকিছু যাচাই-বাছাই করে যথাসময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে। এ বিষয়ে সরকারপ্রধান ও আমাদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। আমরা যেমন জনদাবিকে গুরুত্ব দেবো, একইসঙ্গে কেউ অন্যায়ের শিকার হোক, সেটাও চাই না। তাই বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কী করণীয় আছে, সেটা সরকার যথাসময় করবে।’

সাবেক রাষ্ট্রপতির বিদেশযাত্রায় আইনি কোনো বাধা রয়েছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এ ধরনের কোনো নিষেধাজ্ঞা বা আইনি বাধা আছে কি না, সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলতে পারবে। এগুলো গোপনীয় বিষয়, এভাবে প্রকাশ্যে আমরা বলতে পারব না। কার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে, আর কার নেই, তা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে যথাসময়ে প্রকাশ করা হবে।’

নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘সংবিধানের বিধান অনুযায়ীই পরবর্তী কার্যক্রম পরিচালিত হবে। এ বিষয়ে সরকার সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই অনুসরণ করবে।’

অনুষ্ঠানে তিনি দাবি করেন, গত ১৬ বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার বিদেশে পাচার হয়েছে, যা দেশের দুই থেকে তিনটি জাতীয় বাজেটের সমপরিমাণ। তিনি আরও অভিযোগ করেন, খুলনায় পৌনে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণে ২৮০ কোটি টাকা বরাদ্দ এবং পিরোজপুরে এলজিইডির সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকার প্রকল্পে কাগজে-কলমে উন্নয়ন দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে।

জুলাই অভ্যুত্থান-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পাঠিয়ে দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলেও জানান আইনমন্ত্রী। পাশাপাশি তিনি দাবি করেন, বর্তমানে মিথ্যা মামলার প্রবণতা আগের তুলনায় অনেক কমেছে।

আমলে নেওয়ার মতো অভিযোগ নেই : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

এনসিপিসহ একাধিক বিরোধী রাজনৈতিক দল সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে এ বিষয়ে আপাতত সরকার আমলে নেওয়ার মতো কোনো উপাদান দেখেনি বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘এখন যারা তার (সাবেক রাষ্ট্রপতি) বিরুদ্ধে বক্তব্য দিচ্ছে, তাদের সেটা অধিকার আছে। আমরা গণঅভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়ে কী প্রত্যাশা করি? রাজনৈতিকভাবে মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা থাকবে, প্রতিবাদ করার স্বাধীনতা থাকবে। সেটা আছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, বিরোধীদলের পক্ষ থেকে এনসিপি এবং অন্যান্যরা তার বিরুদ্ধে কিছু অভিযোগ উত্থাপন করছে। সেটা করতে পারে। কিন্তু আমরা আমলে নেওয়ার মতো কোনো বক্তব্য ওখানে নেই।’  

গতকাল দুপুরে সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে ‘পুলিশের সাহসিকতা ও প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান’ অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।

সাহাবুদ্দিনকেও ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা’ দেওয়া হবে: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সংবিধানে রাষ্ট্রপতিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। যার ফলে তার বিরুদ্ধে আদালতে ফৌজদারি আইনে মামলা করা যায় না। এছাড়া পদ ছেড়ে দেওয়ার পরও একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত রাষ্ট্রপতিকে ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা’ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সেই হিসেবে, সদ্য পদত্যাগ করা রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকেও ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা’ দেওয়া হবে। 

তিনি বলেন, ‘তিনি (মো. সাহাবুদ্দিন) সাংবিধানিকভাবে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বিধি-বিধান অনুযায়ী করেছেন। আমরা রাষ্ট্রপতির সহযোগিতা পেয়েছি। এখন সেই সময়টায় সংবিধান অনুসারে, তিনি প্রিভিলেজড এবং ইমিউনিটি আছে তার, ফৌজদারি অপরাধ ইত্যাদির বিষয়ে কোনো আদালতে মামলা করা যায় না।’

সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ‘সুরক্ষা ও নিরাপত্তা’র বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, তিনি আইনানুগ যা সুবিধা পাবেন অবশ্যই পাবেন এবং তার প্রটেকশনের জন্য এসএসএফ-পিজিআর সুবিধা পাওয়ার ছয় মাসের বিধান আছে। এছাড়া পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থার মাধ্যমে তার নিরাপত্তার বিষয় গ্রহণ করা হবে।

এদিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, লন্ডনে চিকিৎসা নিতে গিয়ে সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে টেলিফোনে সরাসরি আলাপ করেছেন—এমন কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছে নেই।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা পত্রিকায় দেখেছি। কোনো পত্রিকা এরকম একটা নিউজ দিল, কী তথ্য প্রমাণ আছে সেটা তাকেই জিজ্ঞেস করতে হয়। আমাদের কাছে সে রকম কোনো তথ্য নেই। আর কথা বলার জন্য লন্ডন যেতে হয় নাকি? আজকালকার ইন্টারনেটের দুনিয়ায় লন্ডন গিয়ে কারও সঙ্গে কথা বলতে হয় না, এটা আমার কাছে অলিক মনে হয়। কথা বলতে চাইলে তো এখান থেকেও বলা যায়।’

এর আগে, গত ২৩ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল যে, চিকিৎসাধীন অবস্থায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন যুক্তরাজ্যে (লন্ডন) গিয়ে ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ফোনালাপ করেছেন। 

রাষ্ট্রপতি পদে অধিষ্ঠিত হওয়ার আগে মো. সাহাবুদ্দিন দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং ব্যাংকের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখনকার সময়ের কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা দেশের প্রচলিত আইনানুসারে চলবে বলে জানান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি উল্লেখ করেন, ‘সেই সময় দায়িত্ব পালনকালীন তার বিরুদ্ধে কি কোনো অভিযোগ কেউ দিয়েছিল? দিয়ে থাকলে সেটা তখনকার সময়ে যদি কোনো কিছুর রেকর্ড করে থাকে সেটা তখনকার বিষয়, বিধি-বিধান অনুসারে চলবে, আইনানুসারে চলবে।’  

পাশাপাশি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও নিশ্চিত করেন, সংবিধানে আইনগতভাবে যা যা সুযোগ-সুবিধা ও নিরাপত্তা পাওয়ার কথা, তার সবই নিয়ম অনুযায়ী পাবেন সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন।

তিনি বলেন, সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে তার বিশেষ সুরক্ষার জন্য এসএসএফ, পিজিআরসহ ছয় মাসের একটি নির্দিষ্ট আইনি বিধান রয়েছে। সেই ছয় মাসের নিরাপত্তার পূর্ণ সুযোগ তিনি নিয়ম অনুযায়ী পাবেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ পুলিশ ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকেও তাঁর নিরাপত্তার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। আইনানুগভাবে তিনি যেসব সুযোগ-সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তার সবই পাবেন।

সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে আলাদা অনুসন্ধান নয়: বাংলাদেশ ব্যাংক

সদ্য সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে আলাদা করে কোনো আর্থিক অনিয়মের তদন্ত করবে না বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে কোনো প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম খতিয়ে দেখার সময় যদি কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে। গতকাল দুপুরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ তথ্য জানান বাংলাদেশে ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান। 

আরিফ হোসেন বলেন, শাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে রাষ্ট্রের শীর্ষ পদে ছিলেন, তাই তার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা কোনো অনুসন্ধান চালাবে না নিয়ন্ত্রক সংস্থা। তবে দেশের আর্থিক খাতের সংস্কারে ব্যাংকভিত্তিক যে তদন্তগুলো চলছে, সেখানে কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেয়া হবে৷

তিনি বলেন, মো. সাহাবুদ্দিন সাংবিধানিকভাবে দেশের সর্বোচ্চ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাই তাঁকে লক্ষ্য করে ব্যক্তিগতভাবে আলাদা কোনো অনুসন্ধান বা তদন্ত পরিচালনার পরিকল্পনা নেই।

আরিফ হোসেন খান আরও বলেন, দেশের ব্যাংকিং খাতে সুশাসন নিশ্চিত করতে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানভিত্তিক তদন্ত চলছে। এসব তদন্তে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাহাবুদ্দিন ও হামিদের নামে ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ: পিলখানা থেকে শুরু করে জুলাই অভ্যুত্থান–বিভিন্ন সময়ে দেশে ‘গণহত্যা, গুম ও খুনের’ ঘটনায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দুই সাবেক রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন নেতৃত্বের দায়ভার বা ‘সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটি’র অভিযোগ তদন্ত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ এবং গ্রেপ্তারের আবেদন জানিয়েছে ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম’ নামের দুটি সংগঠন।

গতকাল রোববার দুপুরে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে ‘বাংলাদেশ আজাদ পার্টি’ ও ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম (এসডিএফ)’ নামের দুটি সংগঠন পৃথকভাবে এই আবেদনগুলো জমা দেয়। বাংলাদেশ আজাদ পার্টির পক্ষ থেকে দুই সাবেক রাষ্ট্রপতিরই বিচার চাওয়া হয়েছে।

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ শপথ নিয়ে পর পর দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন আবদুল হামিদ। তারপর আওয়ামী লীগের মনোনয়নে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন মো. সাহাবুদ্দিন। মেয়াদ পুরো হওয়ার পৌনে দুই বছর বাকি থাকতেই গত শুক্রবার তিনি দায়িত্ব থেকে ইস্তফা দেন। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া কী হবে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের প্রসিকিউটর গাজী এম এইচ তামীম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমাদের কাছে যখন কোনো অভিযোগ আসে, আমরা তা গ্রহণ করে রেজিস্ট্রারভুক্ত করি। তারপর তদন্তের জন্য তদন্ত সংস্থায় পাঠাই। তদন্ত সংস্থা যদি মনে করে এটি তদন্ত করার মত, তখন তারা একটি অভিযোগ রেজিস্ট্রারভুক্ত করে তদন্ত শুরু করে।’

এই অভিযোগগুলো তদন্ত সংস্থায় পাঠানো হবে কি না, সে বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি জানিয়ে তামীম বলেন, ‘অভিযোগ থাকলেই হয় না। যার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়, শুধু তাকেই আমরা অভিযুক্ত বলতে পারি বা আসামি বলতে পারি।’

বোরহান মাহমুদ বলেন, ‘পিলখানা হত্যাকাণ্ড, শাপলা চত্বরের ঘটনা, জুডিশিয়াল কিলিং এবং আয়নাঘরসহ দেশে সংঘটিত নারকীয় ঘটনাগুলোর সময় আবদুল হামিদ ও মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। একটি গণহত্যার ঘটনার সময় ওখানে যে রাষ্ট্রের বা যে দলের যে সর্বোচ্চ ব্যক্তি থাকেন, তার ওপরে মূলত এর অপরাধটা বর্তায়। তৎকালীন যে প্রেসিডেন্টরা এই ফ্যাসিস্ট গভার্নমেন্টকে সাপোর্ট দিয়েছেন, সবধরনের নিরাপত্তা দিয়েছেন, যেহেতু তিন বাহিনী তার হাতে ছিল এবং রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাগুলো তার হাতে ছিল, তিনি এই অন্যায়গুলোর প্রতিবাদ করেন নাই। তারা কখনো এই অন্যায়ের সাথে এবং এই অন্যায়ের দায় এড়াতে পারেন না।’

চিফ প্রসিকিউটর অভিযোগ গ্রহণ করেছেন এবং যথাযথ আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন বলে দাবি করেন বোরহান মাহমুদ।

আজাদ পার্টির সভাপতি অবসরপ্রাপ্ত কর্নেল হাসিনুর রহমান বলেন, ‘তিন বাহিনীর প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতির যুদ্ধ ঘোষণার মত সর্বোচ্চ ক্ষমতা থাকলেও তারা কোনো ভূমিকা রাখেননি। ৫ অগাস্ট পর্যন্ত সংঘটিত গুম, খুন ও আয়নাঘরের মত অপরাধে তাদের মৌন সম্মতি ছিল।’

সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতার কারণে রাষ্ট্রপতির কিছু করার সুযোগ ছিল কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে হাসিনুর রহমান বলেন, ‘একটা সুযোগ উনার অন্তত ছিল, উনি পদত্যাগ করতে পারতেন। উনি পদত্যাগ করেন নাই, উনি ক্ষমতা ভোগ করেছেন। প্রেসিডেন্ট যখন দেখতাছে এত লোক মারা যাচ্ছে, এদের টাকায় উনার বেতন-ভাতা সুযোগ-সুবিধা পান, উনি কোনো ভূমিকা রাখবেন না, এটা কোনোভাবে কাম্য না। আমরা তো পরিবর্তন চাই, নজির স্থাপন করতে পারতেন।’

অন্যদিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান দমাতে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের’ ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্তের জন্য ট্রাইব্যুনালে পৃথক আবেদন করেছে ‘রাষ্ট্র সংস্কার ফোরাম’।

সংগঠনটির সদস্য সচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস বলেন, তারা চিফ প্রসিকিউটর বরাবর দুটি অভিযোগ দিয়েছেন, যেখানে সাহাবুদ্দিনকে গ্রেপ্তারের আবেদন জানানো হয়েছে। তদন্তের পর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রসিকিউশন ব্যবস্থা নেবে বলে তারা আশা করছেন।

সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্ত চায় রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম: এদিকে, জুলাই আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডসহ আওয়ামী লীগের শাসনামলে গুম-নির্যাতনের ঘটনায় সাবেক রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা নিয়ে তদন্ত চেয়ে ট্রাইব্যুনালে আলাদা আবেদন করেছে রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম (এসডিএফ)।

সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব আল নূর মোহাম্মদ আয়াস চিফ প্রসিকিউটরের কাছে এ আবেদন জমা দেন।

আবেদনে আয়াস দাবি করেন, সাবেক রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগ দাবিতে শাহবাগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জেরে ২০২৫ সালের ১৮ জানুয়ারি রাতে মহাখালী বাসস্ট্যান্ড থেকে মুখোশধারী ব্যক্তিরা তাকে অপহরণ করে।

অপহরণের পর তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয় অভিযোগ করে তিনি বলেন, সেখানে আন্দোলন স্থগিতের আহ্বান জানিয়ে ভিডিও বার্তা দিতে আমাকে বাধ্য করা হয়। পরদিন আমাকে কারওয়ানবাজার-বাংলামোটর এলাকায় ফেলে রেখে যাওয়া হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হই।

সাবেক এই রাষ্ট্রপতির আইনি দায় নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আয়াস বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারী ছাত্র-জনতার ওপর গুলিবর্ষণ, অমানবিক নির্যাতন, খুন-গুমের হুকুমদাতা হিসেবে মো. সাহাবুদ্দিনের ভূমিকা তদন্ত করে আইনের আওতায় এনে বিচারের দাবি জানাচ্ছি। ২০২৪ সালের নির্বাচন, মানবাধিকার লঙ্ঘন এবং গণঅভ্যুত্থান সংশ্লিষ্ট ঘটনায় তার কোনো আইনগত দায় বা সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, তা নিরপেক্ষ ও স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।

গত শুক্রবার রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন স্বাস্থ্যগত কারণ দেখিয়ে পদত্যাগ করেন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তার পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। গত শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার এ তথ্য জানান।

স্পিকার বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’

রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের বিধান আছে।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন