ছবি: সংগৃহীত
আমার এক ফুফাতো বোন লিজা স্কুলপড়ুয়া এক ছেলের সঙ্গে পরিকল্পনা করেছে পালিয়ে যাবে। অথচ সে কলেজে পড়ে।
ফুফা লিজাকে বোঝানোর জন্য আমাদের বাসায় নিয়ে এসেছেন। আবার লিজাও আমাকে ধরেছে তার বাবাকে বোঝানোর জন্য। তার বাবাকে বোঝাতে হবে এই ছেলে তার কলিজা, লিভার, ফুসফুস। দুনিয়া কেয়ামত হয়ে গেলেও কেউ তাদের আলাদা করতে পারবে না। এমন ভালো ছেলে দুনিয়ায় এক পিস-ই আছে।
লিজারা হুলুস্থুল টাইপ বড়লোক, এক বাপের এক মেয়ে হওয়ায় আদরে বড় হয়েছে। ফুফা আমাকে ডেকে বললেন, বল তো আমি এখন কী করি? আমাকে ব্যবসার কাজে সারাক্ষণ বাইরে থাকতে হয়। সব সময় একে পাহারা দেওয়া সম্ভব? তোর ফুফু তো আবার গাধার বংশ, আন্তর্জাতিক মানের গাধা, মেয়ের খবর শুনেই চিৎ হয়ে পড়ে আছে...
আমি বললাম, ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ ফুফা। ফুফু কিন্তু আমাদের বংশের।
সরি, মাথা ঠিক নাই রে। কী বলতে কী বলি!
শোনেন ফুফা, আমার কথা শুনলে টেনশন মুক্ত থাকতে পারবেন। ১০০% গ্যারান্টি। বিফলে বুদ্ধি ফেরত।
বুদ্ধি দে।
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, লিজাকে ধরে ওর মাথা ন্যাড়া করে দেন। আপনি চাইলেও অন্তত ছয়মাসের আগে টাকলি মাথা নিয়ে বাসা থেকে বের হবে না। ওই ছেলে নিশ্চয় ন্যাড়া মাথার মেয়ে নিয়ে পালাবে না। এই ছয় মাসে দেখেন ওদের প্রেম বাপ বাপ করে পালাবে। এখনকার মেয়েরা ছয়মাসের বেশি বয়ফ্রেন্ড রাখে না।
আমার কথা শুনে ফুফা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছেন। মনে হয় তিনি বিভ্রান্ত, আমার বুদ্ধি কাজে লাগাবেন কিনা বুঝতে পারছেন না।
আমি ফুফাকে ছেড়ে লিজার কাছে গেলাম। সে কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শুনছে আর পা নাচাচ্ছে। আমাকে দেখে হেডফোন কান থেকে সরিয়ে বলল, ড্যাডকে বলেছ আমার কথা?
আমি তার পাশে বসতে বসতে বললাম, বলেছি। তার আগে আমাকে একটা কথা বল তো, আগে তুই তোর বাবাকে পাপা ডাকতি, এখন ড্যাড ডাকছিস কেন?
আরে দূর! পাপা একটা শব্দ হলো? ডাকতে গেলেই ঠোঁটের লিপস্টিক নষ্ট হয়ে যায়। এরচেয়ে ড্যাড অনেক ভালো। ভাইয়া, আমাকে বিপদ থেকে উদ্ধার করে দাও।
এই বিপদ থেকে কীভাবে উদ্ধার করবো বুঝতে পারছি না, তুই হার্টঅ্যাটাক করলেও না হয় বাঁচানো যেত, কিন্তু তুই উষ্ঠা খেয়েছিস স্কুলে পড়ুয়া ন্যাংটা পোলাপানের কাছে।
ভাইয়া ল্যাঙ্গুয়েজ প্লিজ।
ওকে ওকে। আমাকে একটা কথা বল, তোদের গোপন মিশন তোর বাপ জানলো কেমনে?
আমি ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্ট্যাটাস দিয়েছিলাম।
এই তো সর্বনাশ করেছিস। তোরা একটা প্রেম করেই ফেসবুকে রিলেশনশিপ স্টাটাস দিতে শুরু করিস, বিয়ে করলে তো পুরো এলাকা ফাটায়ে ফেলবি। প্রেম ভালোবাসা জাহির করার বিষয় না। আমরা কী করতাম জানিস? চৌদ্দটা প্রেম করেও ফেসবুকে লিখতাম, আমি সিঙ্গেল। তোরা কবে যে লয়্যাল হবি!
তুমি বিয়ে করলে লোকজন জানবে না?
জানবে। ফেসবুকে স্টাটাস দিব, বহু কষ্টে একটা রে পাইছি রে! আচ্ছা বাদ দে, ঐ ছেলের বাড়িতে তোকে মেনে নিবে?
আর বলো না ভাইয়া, ওর বাপটা বিশ্ব হারামি। কিছুতেই মানতে চায় না।
আমি মাথা চুলকাতে চুলকাতে বললাম, ব্যাপার না, পৃথিবীতে সব বাবাই হিরো, শুধু বয়ফ্রেন্ড /গার্লফ্রেন্ডদের বাপ ভিলেন হয়। এটা ঐতিহাসিকভাবে প্রমাণিত। ওই ছেলের দেশের বাড়ি কই? ঢাকায়?
না বরিশাল।
এই তো ভেজাল লাগিয়ে ফেলেছিস।
লিজা চিন্তিত গলায় বলল, কী ভেজাল?
শোন, বিয়ে করলে সবসময় নিজ জেলায় করবি। কারণ, পর কখনো আপন হয় না। ঢাকার মেয়ে হয়ে বরিশালের ছেলে বিয়ে করা কি উচিত হবে?
লিজা বিরক্ত গলায় বলল, খালি উল্টাপাল্টা কথা বইলো না, টেনশনে আমার মাথার সব চুল পড়ে যাচ্ছে। এমন কোনো তেল নাই যা ব্যবহার করি নাই। এখন শুধু কেরাসিন তেল দিতে বাকি।
চুল পড়ুক সমস্যা নাই, তুই ন্যাড়া হয়ে যা। তোর বাপ মনে করবে তুই ঐ ছেলের জন্য পাগল হয়ে গেছিস। বিয়ে না দিয়ে যাবে কই?
কথা শুনে লিজা আমার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল।
আমি তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললাম, টেনশন করিস না, ঐ ছেলের খোঁজ খবর নিতে আমার এক বন্ধুকে পাঠিয়েছি। ব্যাপারটা আমার ওপর ছেড়ে দে। যেহেতু এমন ভালো ছেলে পৃথিবীতে এক পিস-ই আছে, বিয়েটা ওই ছেলের সঙ্গেই হবে। ছেলের লেখাপড়া কম এটা বিষয় না। তোর বাচ্চাকাচ্চা হলে তুই পড়াবি না? তখন বাচ্চার বাপও না হয় তোর কাছে পড়তে বসবে...
লিজা রেগে যায়, দূর! তোমার খালি আউলফাউল কথা! তোমার সাহায্য চাওয়াই ভুল হয়েছে।
আহা! এতো অস্থির হলে হবে? একটা সত্যি কথা বল তো, ঐ ছেলে তোকে কেমন ভালোবাসে?
লিজা হড়বড় করে বলল, অস্থির ভালোবাসে। আমি যা বলি তাই শোনে। যদি বলি আটতলা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে নিচে লাফ দেও, সঙ্গে সঙ্গে লাফ দেবে। বিষ খেতে বললে ঢকঢক করে খেয়ে ফেলবে, কোনো কারণ জিজ্ঞেস করবে না। ওর এমন কোনো কথা নাই যা আমি জানি না। ও ভুলেও অন্য মেয়েদের দিকে তাকায় না।
ওরে বাবা! লাইলি-মজুন, শিরি-ফরহাদের প্রেমও তোদের প্রেমের কাছে নস্যি, রোমিও-জুলিয়েট তো পাত্তাও পাবে না। ওর বিকাশের পিন নাম্বার জানিস?
লিজা এবার নিজের মাথা চুলকাতে লাগল, না তো ভাইয়া, এটা তো জানি না। তারপরই চিন্তিত হয়ে বলল, আচ্ছা বিকাশের পিন নাম্বার আমাকে বলে নাই কেন? তাহলে কি ও বিকাশে অন্য কারও সঙ্গে প্রেম করে? হায় আল্লাহ! এখন আমার কী হবে! লিজা আহাজারি করতে লাগল।
আমি বললাম, তুই যে ঐ ছেলের চেয়ে বয়সে বড় তা কি সে জানে?
না, আমি বয়স লুকিয়েছি।
ব্যাপার না, মেয়েরা প্রেমে পড়লে বয়স লুকাতে হয়। আর ছেলেরা প্রেমে পড়লে বয়স, ভুঁড়ি, মানিব্যাগের স্বাস্থ্য, টাক কতকিছু যে লুকাতে হয়!
আমি বন্ধু লিমনকে ফোন দিলাম, এই শালা তুই কই?
লিমন বলল, আমি তো হাসপাতালে এসেছি।
আমি বিরক্ত গলায় বললাম, শালা, তোকে একটা দায়িত্ব দিলাম, আর তুই হাসপাতালে গিয়ে বসে আছিস? ওই ছেলে কি হাসপাতালে? কেউ ওর ঠ্যাং ভেঙে দিয়েছে?
না, আমার ভাবি হাসপাতালে। তার টুইন বাচ্চা হয়েছে।
বলিস কী রে! একসঙ্গে দুইটা?
লিমন বলল, হবে না! পোয়াতি পেটে চ্যালেঞ্জ ২, আশিকি ২, পাগলু ২ মুভি দেখলে তো টুইন বেবি হবেই।
আমি হাসতে হাসতে বললাম ভাগ্য ভালো তোর ভাবি বাপ বেটা ৪২০, খোকা ৪২০, জামাই ৪২০ মুভিগুলো দেখে নাই, তাহলে খবর ছিল। ঐ ছেলের খবর নিয়েছিস?
নিয়েছি, ঐ ছেলে তো বিশ্ব বদমাশ। রিয়া নামে আরেকটা মেয়ের সঙ্গে ওর সম্পর্ক আছে।
কী বলিস তুই? ঠিকঠাক খবর নিয়েছিস তো?
নিয়েছি। রিয়া আমার ছোটবোনের সঙ্গে পড়ে। ও-ই খবরটা দিল।
আমি বিষয়টা লিজাকে জানালাম। সে কিছুতেই বিশ্বাস করতে চায় না। ওর ধারণা আমি মিথ্যা কথা বলছি।
আমি লিজাকে বললাম, কল দিয়ে ওই ছেলের সঙ্গে কথা বল।
লিজা সেই ছেলেকে ফোন দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলল, হ্যালো জান।
বলো কলিজা।
একটা সত্যি কথা বলবা?
অবশ্যই বলবো। আমি কখনো তোমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলি না।
লিজা ইতস্তত করে বলল, রিয়া কে?
ঐ পাশ থেকে প্রশ্ন আসলো, লিমন কে?
লিজা বলল, আই লাভ ইউ, জান।
ঐ পাশের উত্তর, মি টু কলিজা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

