গণমাধ্যমকে নিখুঁত করার দায়িত্ব গণমাধ্যমকেই নিতে হবে: তথ্যমন্ত্রী
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫ জুন ২০২৬, ১৮:৫০
ছবি: সংগৃহীত
গণমাধ্যমকে নিখুঁত করে গড়ে তোলার দায়িত্ব গণমাধ্যমকেই নিতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন। তিনি বলেছেন, গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের আয়না। সেই আয়না যত নিখুঁত হবে, সমাজের চেহারা তত স্পষ্টভাবে দেখা যাবে।
সোমবার (১৫ জুন) সকালে রাজধানীতে চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে (ডিএফপি) ‘ফ্যাসিবাদ মোকাবিলায় মিডিয়ার ব্যর্থতা’ শীর্ষক সেমিনারে মন্ত্রী এ কথা বলেন। ‘বাকশালি শাসনে সংবাদপত্র বন্ধের কালো দিবস উপলক্ষে’ এই সেমিনারের আয়োজন করে ন্যাশনাল এডিটরস কাউন্সিল (এনইসি)। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্যমন্ত্রী।
অনুষ্ঠানে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার কথা বলতে গেলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বহু মতের সহাবস্থানের প্রশ্ন আসে। আর দায়িত্বশীলতার কথা বলতে গেলে আসে জবাবদিহির প্রশ্ন। এই দুই বিষয় একসঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারায় বাংলাদেশের গণমাধ্যম এত দিনেও শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি। এ ব্যর্থতার দায় বিগত সরকারগুলোকেই বহন করতে হবে।
গণমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট সব সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে জানিয়ে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এর উদ্দেশ্য সব পক্ষকে একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ করা। সবার লক্ষ্য ও উপসংহারে তেমন কোনো পার্থক্য খুঁজে পাননি বলেও জানান তিনি। এই ঐকমত্যকেই কমিশন গঠনের সুযোগ হিসেবে দেখছেন মন্ত্রী।
সম্মিলিতভাবে ভিন্নমত চর্চার সংস্কৃতিকে কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক করা যায়নি উল্লেখ করে জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, ভিন্নমতকে অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামোর মধ্যে এনে এবং এর তর্ক-বিতর্কের প্রতিযোগিতাকে প্রগতির উপাদানে পরিণত করতে হবে। তিনি বলেন, দেশ এবং মানবতার সমৃদ্ধির লক্ষ্যে গণমাধ্যমকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তা না হলে গণতন্ত্রের চর্চা করা সম্ভব হবে না।
আলোচনায় তথ্যমন্ত্রী উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ তুলে ধরেন। যুক্তরাজ্যের অফকম, যুক্তরাষ্ট্রের এফসিসি এবং ইউরোপের বিভিন্ন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মতো একটি গ্রহণযোগ্য ও অংশগ্রহণমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তার মতে, এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে যেমন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়, তেমনি দায়িত্বশীলতার সীমারেখাও নির্ধারিত থাকে।
তথ্যমন্ত্রী বলেন, ‘১৯৭৫ সালে সমস্ত গণমাধ্যমের কণ্ঠস্বরকে হত্যা করা হয়েছিল। তাই আজকের এই দিনটি শুধু সেই ঘটনার স্মারক হিসেবে নয়, আমরা চাইলে এটিকে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দিবস হিসেবেও চর্চা করতে পারি।’
তিনি বলেন, ‘যারা ১৬ জুনকে কালো দিবসে পরিণত করেছিল, তাদের বিপরীতে ১৬ জুনকেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো নির্মাণের দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা যেতে পারে। ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতার বিপরীতে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার চেয়ে মধুর প্রতিশোধ আর হতে পারে না।’
গণমাধ্যম খাতের সংস্কার প্রসঙ্গে জহিরউদ্দিন স্বপন বলেন, দেশে একটি স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই কমিশনে কোয়াসি-জুডিশিয়াল ক্ষমতা থাকতে পারে এবং এটি গণমাধ্যম সংশ্লিষ্টদের জন্য একটি গ্রহণযোগ্য অভিভাবকত্বের জায়গা হিসেবে কাজ করবে।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন প্রতিদিনের বাংলাদেশ সম্পাদক মারুফ কামাল খান। প্রবন্ধে গণমাধ্যম পুনর্গঠনে স্বাধীন গণমাধ্যম কমিশন গঠনে সময়ক্ষেপণ না করার পরামর্শ দেওয়া হয়। এ ছাড়া ফ্যাসিবাদী আমলে অভিযুক্ত সাংবাদিকদের মামলা পর্যালোচনায় কমিটি গঠন, বিলুপ্ত প্রেস ট্রাস্ট পুনরুজ্জীবন, সম্পাদকদের মর্যাদা রক্ষা, সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত, বিজ্ঞাপন বণ্টনে সুষমতা এবং কর কমানোর দাবিও জানানো হয়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে তথ্যমন্ত্রী বলেন, এ রকম একটি লিখিত সম্মিলিত সর্বসম্মত বক্তব্য পাওয়ায় চলমান গণমাধ্যম কমিশন গঠন করার তৎপরতা অনেক বেশি বেগবান হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন দৈনিক আমার দেশের সম্পাদক মাহমুদুর রহমান। এতে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী, সভাপতি ওবায়দুর রহমান শাহীন, নয়াদিগন্ত সম্পাদক সালাহউদ্দিন বাবর, মানবকণ্ঠ সম্পাদক মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম, দ্য নিউ নেশন সম্পাদক মো. মোকাররম হোসেন, বাংলাদেশের খবর-এর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন, দ্য ডেইলি ওয়াদা সম্পাদক শফিকুল আলম, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সভাপতি আবু সালেহ আকন, প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশের (পিআইবি) মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ প্রমুখ। সেমিনারটি সঞ্চালনা করেন যুগান্তর সম্পাদক আবদুল হাই শিকদার।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

