Logo

জাতীয়

হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে মৃত্যু

Icon

রায়হান উল্লাহ

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৬, ০০:৫৮

হামের প্রাদুর্ভাবে বাড়ছে মৃত্যু

ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে দ্রুত বিস্তার লাভ করা সংক্রামক রোগ হাম এখন এক গভীর জনস্বাস্থ্য সংকটে রূপ নিয়েছে। সাম্প্রতিক পরিস্থিতিতে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও চার শিশুর মৃত্যু এবং ৬৮৫ জনের আক্রান্ত হওয়ার খবর পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে স্পষ্ট করে তুলেছে। চলতি বছরে ইতোমধ্যে অন্তত ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার বড় অংশই ঘটেছে মার্চ মাসে। রাজধানী ঢাকা থেকে শুরু করে রাজশাহী, ময়মনসিংহ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রকোপ ক্রমাগত বাড়ছে এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

এই প্রাদুর্ভাবকে ঘিরে উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি এবং প্রস্তুতির অভাব। স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ভাষায়, ‘বজ্রপাতের মতো’ হঠাৎ এই পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও বাস্তবে দীর্ঘদিনের টিকা সরবরাহ সংকট, জনবল ঘাটতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতা এ সংকটকে তীব্র করেছে। একই সঙ্গে টিকাদানে ব্যর্থতা ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থার অভাব নিয়ে আইনি প্রশ্নও উঠেছে; উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত এবং সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ না হওয়া পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার দাবিতে রিট আবেদন পর্যন্ত করা হয়েছে।

হাসপাতালগুলোর চিত্রও উদ্বেগজনক- শিশুদের পাশাপাশি প্রাপ্তবয়স্করাও আক্রান্ত হচ্ছেন, আইসিইউ পর্যন্ত পূর্ণ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধার অভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে। দেশের বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও বিশেষায়িত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে প্রতিদিন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

বিশ্বব্যাপী প্রেক্ষাপট বিবেচনায় দেখা যায়, করোনা-পরবর্তী সময়ে টিকাদান কর্মসূচির ব্যাঘাতের কারণে অনেক দেশেই হামের পুনরুত্থান ঘটেছে। বাংলাদেশেও সেই প্রভাব স্পষ্ট- টিকাদানের হার কমে যাওয়া এবং ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হওয়ায় শিশুরা বিশেষভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছে, এমনকি টিকা নেওয়ার আগেই সংক্রমিত হওয়ার ঘটনাও বাড়ছে।

দেশে হামে আরও চার শিশুর মৃত্যু, আক্রান্ত ৬৮৫ জন: গত ২৪ ঘণ্টায় (একদিনে) দেশে বায়ুবাহিত রোগ হামে আক্রান্ত হয়ে চার শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এই সময়ে রোগটিতে আক্রান্ত হয়েছে আরও ৬৮৫ শিশু।

গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

নতুন চার শিশুসহ চলতি বছর হাম রোগে অন্তত ৪২ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে মার্চ মাসেই মৃত্যু হয়েছে ৩২ শিশুর। ঢাকা ছাড়াও রাজশাহী, ময়মনসিংহসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় রোগটি ছড়িয়েছে।

হামে শিশুর মৃত্যু, উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত ও স্কুল বন্ধ চেয়ে রিট মামলা: দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত এবং প্রকোপ না কমা পর্যন্ত স্কুল বন্ধ রাখার নির্দেশনা চেয়ে রিট আবেদন করেছেন এক আইনজীবী।

গতকাল বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী লুতফে জাহান পূর্ণিমা সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট দায়ের করেন।

এতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পরিবার কল্যাণ বিভাগসহ সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে বিবাদী করা হয়েছে।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত করতে ব্যর্থতা, টিকার প্রাপ্যতা নিশ্চিত না করা এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবায় ঘাটতি সংবিধানের ২৭, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন। প্রাদুর্ভাবের মধ্যে স্কুলে সংস্পর্শ নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণে ব্যর্থতা- জননিরাপত্তার প্রতি বেপরোয়া অবহেলা এবং জীবনের জন্য আসন্ন ঝুঁকি তৈরি করছে।

আবেদনে টিকাদানে ব্যর্থতা, টিকার ঘাটতি ও প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থায় বিলম্বের কারণ অনুসন্ধানে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বাধীন ও সময়াবদ্ধ তদন্ত পরিচালনার নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। কেন সময়মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, তদন্ত করে সেই ফল আদালতের সামনে উপস্থাপনের আরজি জানানো হয়েছে।

পাশাপাশি মৃত্যুর সংখ্যা, সংক্রমণের হার, টিকার প্রাপ্যতা এবং এ পর্যন্ত নেওয়া পদক্ষেপের বিষয়ে আদালতে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে। এছাড়া অবিলম্বে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি গ্রহণ করে টিকা, সিরিঞ্জ ও প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহ পর্যাপ্ত ও নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে।

ঢাকায় হাসপাতালে হামের রোগীর চাপ: দুই বছর বয়সী ছেলে হোসাইনকে নিয়ে রাজধানীর ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে সাত দিন ধরে আছেন আফিয়া বেগম। হোসাইন অতি ছোঁয়াচে হামে আক্রান্ত। তাই তাকে হাম ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে হাসপাতালে কথা হয় আফিয়া বেগমের সঙ্গে। তিনি মহাখালীর কড়াইল বস্তি এলাকা থেকে সন্তানের চিকিৎসার জন্য এসেছেন।

আফিয়া বেগম বলেন, ‘এখানে সাত দিন ধরে ভর্তি আছি। আমার বাচ্চার কাশি এখনো কমছে না, ডাক্তার থাকতে বলেছেন। তাই আছি।’

হোসাইনের অসুস্থতা শুরু হয়েছিল জ্বর, সর্দি ও কাশি দিয়ে। পরবর্তী সময়ে শরীরে র‌্যাশ দেখা দেওয়ায় ছেলেকে নিয়ে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে যান মা আফিয়া। পরে সেখানকার পরামর্শে আসেন ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালে।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩৭৬ জন রোগী এখানে ভর্তি হয়েছে। এর মধ্যে ১৩৬ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে। বর্তমানে ভর্তি আছে ২৪০ জন, সাধারণ ওয়ার্ডে ১৮৭ জন এবং আইসিইউ ওয়ার্ডে ৫৩ জন। তারা হাম ও এই ব্যাধির উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি আছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে এসেছে ৭৫ জন নতুন রোগী, যার মধ্যে ৫৮ জন হামে আক্রান্ত। আক্রান্ত রোগীদের বেশির ভাগই শিশু, তবে প্রাপ্তবয়স্করাও আছেন।

ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, রোগীর চাপ বাড়ায় সোমবার থেকে এই হাসপাতালে হামের জন্য আলাদা ওয়ার্ড করে রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এখানে প্রতিদিন নতুন রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে রোগীদের এখানে পাঠানো হচ্ছে। এর মধ্যে বেশির ভাগ রোগীরই বয়স কম।

ডিএনসিসি কোভিড-১৯ ডেডিকেটেড হাসপাতালের সহকারী পরিচালক আসিফ আহমেদ হাওলাদার বলেন, ‘এখানে রোগীর যথেষ্ট চাপ আছে, আমরা সেবা দেওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। এখানে রোগীদের চিকিৎসার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। পাশাপাশি সংকটাপন্ন রোগীদের প্রয়োজনীয় বিশেষ সাপোর্ট দেওয়া হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় ওষুধসামগ্রী সরবরাহ করা হচ্ছে।’

হামের উপসর্গ নিয়ে চট্টগ্রামে আরও এক শিশুর মৃত্যু: চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত বুধবার রাতে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ওই শিশুর মৃত্যু হয়। কক্সবাজারের কুতুবদিয়া থেকে আসা শিশুটির বয়স ৯ মাসের কম বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ নিয়ে চট্টগ্রামে হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশুর মৃত্যু হলো।

চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সিভিল সার্জন কার্যালয় জানায়, শিশুটি এর আগে নগরের একটি বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি ছিল। অবস্থার অবনতি হলে বুধবার রাতে শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (পিআইসিইউ) নেওয়া হয়। পরে সেখানে শিশুটির মৃত্যু হয়।

হামের উপসর্গ: ময়মনসিংহ মেডিকেলে একদিনে ২৬ শিশু ভর্তি: হামের উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ২৬ শিশু ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার সকালে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল থেকে পাঠানো বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মুহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।

তিনি বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে গত ১৭ মার্চ থেকে হাসপাতালে ১৭২ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এর মাঝে মৃত্যু হয়েছে ৫ শিশুর। আর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ৯৪ শিশু। গত ২৪ ঘণ্টায় সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১০ শিশু। বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছে ৭৯ শিশু।

জেলার সিভিল সার্জন (ভারপ্রাপ্ত) ফয়সল আহমেদ বলেন, জনসংখ্যার তুলনায় ময়মনসিংহে যা আক্রান্ত আছে, সেটা ততটা বেশি নয়। চিকিৎসকরা সাধ্যমতে রোগীদের সেবা দিতে চেষ্টা করে যাচ্ছেন।

বজ্রপাতের মতো হঠাৎ এসেছে হাম, আমাদের প্রস্তুতি ছিল না-স্বাস্থ্যমন্ত্রী: দেশে হঠাৎ করে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়াকে বজ্রপাতের সঙ্গে তুলনা করে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল বলেছেন যে, এই পরিস্থিতির জন্য তাদের পূর্ব কোনো প্রস্তুতি ছিল না। 

বৃহস্পতিবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অনাকাঙ্ক্ষিত সংকটের কথা স্বীকার করেন। এর আগে বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি জানান, উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার দেশব্যাপী জরুরি ভিত্তিতে হামের টিকাদান কর্মসূচি শুরু করতে যাচ্ছে। মূলত ৬ মাস থেকে ১০ বছর বয়সী শিশুদের এই বিশেষ টিকাদান কার্যক্রমের আওতায় আনা হচ্ছে যাতে দ্রুত সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও জানান, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ নির্দেশনায় বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে কম সময়ের মধ্যে এই ‘ন্যাশনাল ইমারজেন্সি ভ্যাকসিন ক্যাম্পেইন’ বা জাতীয় জরুরি টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। আগামী রোববার থেকে মাঠপর্যায়ে সরাসরি টিকা দেওয়ার কাজ শুরু হবে। 

ইতিহাসে এর আগে এত অল্প সময়ের প্রস্তুতিতে এমন বড় কোনো টিকাদান অভিযান পরিচালিত হয়নি বলে তিনি দাবি করেন। কর্মসূচির সফল বাস্তবায়নে আজ শুক্র ও আগামীকাল শনিবারের মধ্যে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রয়োজনীয় টিকা ও আনুষঙ্গিক সরঞ্জাম পৌঁছে দেওয়ার সব প্রস্তুতি ইতিমধ্যে সম্পন্ন করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

রাজশাহী মেডিকেলে হামের উপসর্গে শিশুর মৃত্যু, ভর্তি ২০: রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে আসা রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত হাসপাতালে ১৩২ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছে। দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।

তিনি জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে ২০ জন। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে একজনের মৃত্যু হয়েছে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে চারজন। মার্চ মাসের শুরু থেকে এ পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৩৪০ জনে।

রাজশাহী বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি হামের প্রাদুর্ভাব দেখা গেছে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায়। এ ছাড়া নওগাঁ, নাটোর ও পাবনা থেকেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোগী আসছে হাসপাতালে। রোগীর চাপ আরও বাড়লে আইসোলেশন সুবিধা বাড়ানো হবে বলেও জানিয়েছেন এই চিকিৎসক।

ফরিদপুরে বাড়ছে হাম উপসর্গের রোগী, এক শিশুর মৃত্যু: সারা দেশের মতো ফরিদপুরেও ক্রমেই বেড়ে চলেছে হামে উপসর্গের রোগীর সংখ্যা। হাম উপসর্গ নিয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় ১০ জন শিশু ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে।

এছাড়া ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে এক শিশুর।

ফরিদপুরের সিভিল সার্জন মাহমুদুল হাসান বলেন, হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যায় রহিমার বয়স সাত মাস। শিশুটির পরিবার মাদারীপুর জেলার ঝাউদি সদর উপজেলার বাসিন্দা।

গত ২৭ মার্চ শিশুটি হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। পাঁচ দিন চিকিৎসা শেষে বুধবার বিকালে শিশুটির মৃত্যু হয়।

সচেতন মহল দুষছেন বিগত সরকারকে: স্বাস্থ্য খাতে বড় ধরনের অব্যবস্থাপনা, অবহেলা, অনিয়ম ও জনবল সংকট থাকার অভিযোগ আছে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় থেকে বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও। বিশেষ করে টিকা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি অভিযোগ জোরালোভাবেই দেখা যাচ্ছে। 

এদিকে স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকার ও বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওগুলোর ঐকান্তিক ও ধারাবাহিক প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ বিশ্বে টিকাদান কর্মসূচিতে সুনাম অর্জন করেছে। যক্ষ্মা হলে রক্ষা নেই- এর মতো ভীতিকর স্লোগানও এখন অতীত। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও), ইউনিসেফসহ বিদেশি অনেক আর্থিক ও কৌশলগত সহায়ক শক্তি এখানে বড় ভূমিকা রেখেছে।

টিকাদান কর্মসূচিতে সাফল্য থাকলেও নানা সময়ে হামের প্রাদুর্ভাবের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের জুলাই মাসে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের পাহাড়ি এলাকায় একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, সেখানে ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল। তখন দুর্গম অঞ্চলে টিকাদান কর্মসূচির ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। সীতাকুণ্ডের সেই ধাক্কা থেকে শিক্ষা নেওয়া হয়নি, যার কারণে ২০২০ সালের মার্চ মাসে পার্বত্য চট্টগ্রামে হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময়ও সেখানে দুটি জাতিগোষ্ঠীর ৯টি শিশু মারা গিয়েছিল ।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ডেটাবেস বলছে, ২০১৭ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত দেশে হামের টিকার প্রথম ডোজ দেওয়ার হার ছিল প্রতিবছর ৯৭ শতাংশ। এরপরও গত এক যুগে এ কয়েক বছরে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের ঘটনা ঘটে। ২০১৭ সালে ৪ হাজার, ২০১৯-এ প্রায় ৬ হাজার আর বাকি দুই বছরে দুই সহস্রাধিক করে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে হামের প্রাদুর্ভাব দুই-তিন বছরে ফিরে আসার প্রবণতা ছিল। তবে টিকাদান কর্মসূচির উন্নতির ফলে সেই ব্যবধান এখন অঞ্চলভেদে ৫-১০ বছরে দাঁড়িয়েছে এবং প্রাদুর্ভাবগুলোর মাত্রাও ছোট হয়ে এসেছে। তবে এবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় মাত্রায় হামের প্রাদুর্ভাব দেখা যাচ্ছে।

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে এবারের হামের প্রাদুর্ভাব মূলত বিগত করোনা মহামারির প্রভাবের কারণে। ২০২৪ সালের শেষ দিকে এবং ২০২৫-এর শুরুতে ডব্লিউএইচও এবং ইউনিসেফ একটি যৌথ প্রতিবেদনে জানায় যে করোনার কারণে টিকাদান কর্মসূচির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ঘটেছিল।

বর্তমানে বিশ্বের অন্যান্য দেশে হাম ছড়িয়ে পড়লেও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে হামে মৃত্যুর হার অনেক বেশি। টিকাদানে ঘাটতি ও ব্যর্থতার পাশাপাশি এ মৃত্যুহারের সঙ্গে যুক্ত ভঙ্গুর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন