Logo

জাতীয়

জ্বালানি সংকটে বৈশ্বিক সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ১৯:৪৭

জ্বালানি সংকটে বৈশ্বিক সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী

দেশে চলমান জ্বালানি তেলের সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক অংশীজনদের কাছে দুই বিলিয়ন ডলার (প্রায় ২৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা) বৈশ্বিক সহায়তা চাইলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বুধবার দুপুরে সংসদ সচিবালয়ের দফতর থেকে এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি (এজেক) প্লাসের এক অনলাইন সম্মেলনে অংশ নিয়ে তিনি এ সহায়তা চান। 

এছাড়া মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতার প্রেক্ষিতে বিকল্প নতুন শ্রমবাজার সন্ধানে সরকারের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা আছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলেন প্রধানমন্ত্রী। সরকার ১৮০ দিনের কর্মসূচির আলোকে কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

বুধবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ১৪তম কার্যদিবসে প্রশ্নোত্তর পর্বে লিখিত জবাবে তিনি এসব কথা জানান।

সংসদ সদস্য মো. আশরাফ উদ্দিনের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে তারেক রহমান বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি বিবেচনায় বিকল্প শ্রমবাজার সম্প্রসারণে ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সার্বিয়া, গ্রিস, নর্থ মেসিডোনিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ব্রাজিল ও রাশিয়া। এসব দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। 

তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে কর্মী নিয়োগকারী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে উচ্চপর্যায়ের সফরের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি, বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোকে নতুন শ্রমবাজার অনুসন্ধান ও পেশাভিত্তিক চাহিদা নিরূপণের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এছাড়া মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় উন্মুক্ত করতে কাজ চলছে। থাইল্যান্ডের সঙ্গে কর্মী নিয়োগ সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

জনগণকে ই-হেলথ কার্ড দেওয়ার উদ্যাগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় জনগণকে ‘ই-হেলথ কার্ড’ দেওয়ার উদ্যাগ নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ক একটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। খুলনা, নোয়াখালী, বগুড়া, সিরাজগঞ্জ ও নরসিংদী জেলার জনসাধারণকে ই-হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসা সেবা দেওয়ার কার্যক্রম শুরু করা হবে।

পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামসুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে সরকারপ্রধান বলেন, সরকারের ১৮০ দিনের কর্মসূচির আওতায় খাল খনন/পুনঃখনন কর্মসূচি গত ১৬ মার্চ থেকে শুরু হয়েছে। জুন ২০২৬ পর্যন্ত পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও কৃষি মন্ত্রণালয় ১২০৪ কিলোমিটার খাল খনন/পুনঃখনন করবে। এছাড়া দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জুন ২০২৬ পর্যন্ত কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য), কাবিটা (কাজের বিনিময়ে টাকা), টিআর (টেস্ট রিলিফ) এর মাধ্যমে ১৫০০ কিমি খাল পুনঃখনন/সংস্কার করা হবে। আমাদের পরিকল্পনা হলো আগামী ৫ বছরে সর্বমোট ২০,০০০ কিলোমিটার খাল ও নদী খনন এবং পুনঃখনন করা।

সরকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সময়োপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমান। সংসদ সদস্য আলফারুক আব্দুল লতীফের এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে প্রধানমন্ত্রী এ কথা জানান। অধিবেশনের ১৪তম দিন সকালে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম সভাপতিত্ব করেন।

পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান । এরই মধ্যে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও এর অধীন দফতর-সংস্থাগুলোর শূন্য পদের বিপরীতে ২ হাজার ৮৭৯ জন নিয়োগের কার্যক্রম ইতোমধ্যে চলমান। প্রধানমন্ত্রী জানান, সারাদেশে শহর ও গ্রামাঞ্চলে খেলার মাঠ নির্ধারণ ও অবকাঠামো উন্নয়নের লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় পর্যায়ে একটি কমিটি কাজ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রতিটি ইউনিয়নে ৮ বিঘা এবং প্রতিটি উপজেলায় ১০ বিঘা করে উন্মুক্ত খেলার মাঠ গড়ে তোলা হবে। 

তিনি আরও বলেন, হাই-টেক ও সফটওয়্যার পার্ক এবং আইসিটি সেন্টারগুলো কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে দেশে পেপালের কার্যক্রম চালু করতেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বর্তমান সরকার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় রাখতে সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে যাচ্ছে। এ জন্য সশস্ত্র বাহিনীকে বিভিন্ন পরিকল্পনা প্রণয়ন, কলেবর বৃদ্ধি, আধুনিকায়ন ও প্রশিক্ষণের উন্নয়নসহ আধুনিক, দক্ষ ও সময়োপযোগী শক্তিতে রূপান্তর করার নানাবিধ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীকে এমন সক্ষমতায় উন্নীত করা, যাতে জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষায় একটি বিশ্বাসযোগ্য প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়। এ লক্ষ্যে একটি নতুন জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল ও আধুনিক প্রতিরক্ষানীতি প্রণয়ন, সেনাবাহিনীর কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, নৌবাহিনীর মাধ্যমে সমুদ্রপথ, সামুদ্রিক সম্পদ ও ব্লু ইকোনমি সুরক্ষা এবং বিমান বাহিনীর বিমান প্রতিরক্ষা, নজরদারি ও দ্রুত মোতায়েন সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে ‘ম্যাড ইন বাংলাদেশ’ উদ্যোগের মাধ্যমে দেশিয় প্রতিরক্ষা শিল্প গড়ে তুলতে আত্মনির্ভরতা বাড়ানোর ওপরও জোর দেওয়া হচ্ছে। 

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির ২০২৬ সালের নির্বাচনি ইশতেহারে সশস্ত্র বাহিনীকে মডার্ন, কুইক, সেল্ফ কনটেইন্ড, রাজনৈতিক বিতর্কের ঊর্ধ্বে থাকা এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা সক্ষমতা সম্পন্ন বাহিনী হিসাবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতায় সরকার শুধু প্রচলিত অস্ত্র সংযোজনেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায় না। বরং সাইবার স্পেস, তথ্যযুদ্ধ, ড্রোন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, উপকূলীয় নিরাপত্তা, জ্বালানি অবকাঠামো সুরক্ষা এবং আন্তঃবাহিনী সমন্বয়ের মতো নতুন ক্ষেত্রেও সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। বিমান বাহিনীতে ৪.৫ প্রজন্মের আধুনিক যুদ্ধবিমান সংযোজনের কথাও গুরুত্ব পাচ্ছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণ, পেশাগত দক্ষতা, কল্যাণ, অবসরোত্তর মর্যাদা এবং ওয়ান র‌্যাংক ওয়ান পেরশন ওয়ান পেনশনের মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে একটি আধুনিক, জ্ঞানভিত্তিক, প্রযুক্তিমুখী ও জনআস্থাসম্পন্ন সশস্ত্র বাহিনী গড়িয়া তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, এছাড়াও সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনীর জন্য উন্নত অস্ত্রশস্ত্র, আধুনিক যুদ্ধবিমান, নৌযান ও সাবমেরিন, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং অত্যাধুনিক নজরদারি প্রযুক্তি সংযোজনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এ আধুনিকায়ন কার্যক্রম একটি চলমান প্রক্রিয়া, যা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দৃঢ় ভিত্তি গড়ে তুলবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও কৌশলগত অংশীদারিত্ব জোরদার করতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশ সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী বিভিন্ন বন্ধুপ্রতীম দেশের সঙ্গে নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ ও মহড়া পরিচালনা করছে। একইসঙ্গে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে নিয়মিত স্টাফ পর্যায়ে বৈঠক, প্রতিরক্ষা সংলাপ এবং দ্বিপাক্ষিক বৈঠক আয়োজনের মাধ্যমে কৌশলগত সম্পর্ক উন্নয়ন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা হচ্ছে।

এদিকে, এদিন দুপুরে সংসদ সচিবালয়ের দফতর থেকে এশিয়া জিরো এমিশন কমিউনিটি (এজেক) প্লাসের অনলাইন সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি জরুরি পদক্ষেপ, ঐক্যবদ্ধ এবং দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণের দাবি রাখে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জন্য জরুরি সহায়তা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত এজেন্ডার শীর্ষে থাকা উচিত। আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এই আহ্বানে দ্রুত ও ইতিবাচক সাড়া দেওয়ার অনুরোধ জানাই।

চলমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই সংকট আমাদের পারস্পরিক নির্ভরতা ও দুর্বলতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে। কোনো দেশ এককভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার সমস্যা সমাধানে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সমন্বিত ও দূরদর্শী পদক্ষেপ প্রয়োজন।

জ্বালানি সংকট বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর প্রভাব মোকাবিলায় সরকার বেশ কিছু স্বল্পমেয়াদী ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে: সরকারি অফিস ও বাজারের সময়সূচি পরিবর্তনের মাধ্যমে চাহিদা ব্যবস্থাপনা; জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি আমদানি বৃদ্ধি ও বিকল্প উৎসের মাধ্যমে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা এবং ভোক্তা নিয়ন্ত্রণে জ্বালানি রেশনিং ও খুচরা বিক্রয়ে সীমা নির্ধারণ। এছাড়া মজুতদারি ও আতঙ্কজনিত কেনাকাটা রোধে ‘ফুয়েল অ্যাপ’-এর মতো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তারেক রহমান আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই সংকটের মাত্রা ও পরিণতি ১৯৭০-এর দশকের তেল সংকটের চেয়েও ভয়াবহ হতে পারে, যা ১৯৮০ এর দশকের উন্নয়ন কার্যক্রম স্থবির করে দিয়েছিল।  

তিনি বলেন, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, দারিদ্র্য বিমোচন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে নিরলস কাজ করে যাচ্ছে। তবে বর্তমান সংকট সেই অর্জনকে পিছিয়ে দেওয়ার বাস্তব ঝুঁকি তৈরি করেছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশ একা এমন সংকটে পড়েনি; তাই একক প্রচেষ্টায় এটি মোকাবিলা করা সম্ভব না। চলমান জ্বালানি সংকটের প্রভাব নিয়ন্ত্রণে বিশেষ করে স্বল্পোন্নত দেশসহ ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে এর ভয়াবহ অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপর্যয় থেকে সুরক্ষায় একটি দৃঢ় ও সমন্বিত বৈশ্বিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারেক রহমান সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ এ সম্মেলন আয়োজনের জন্য জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচিকে ধন্যবাদ জানান।

ভার্চুয়ালি আয়োজিত এই সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমসহ জাপান, ফিলিপাইন, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম ও পূর্ব তিমুরের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা অংশ নেন। সমাপনী বক্তব্য দেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন