Logo

জাতীয়

নিম্ন আয়ের গ্রাহকের দাম পুনর্বহাল

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে বাড়তি চাপ

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০০:৫৪

বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধিতে জনজীবনে বাড়তি চাপ

ছবি: সংগৃহীত

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট পেশের মাত্র কয়েক দিন আগে দেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ঘোষণা সামগ্রিক অর্থনীতি ও জনজীবনে বড় ধরনের উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। তবে ঘোষণার মাত্র এক দিনের মাথায় তীব্র সমালোচনার মুখে সিদ্ধান্ত সংশোধন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। দেশের মোট গ্রাহকের প্রায় ৬৫ শতাংশ- যারা ‘লাইফলাইন’ (০-৫০ ইউনিট) এবং প্রথম ধাপের (০-৭৫ ইউনিট) আওতাভুক্ত- তাদের ক্ষেত্রে বর্ধিত দাম প্রত্যাহার করে আগের দামই বহাল রাখা হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষদের সুরক্ষায় নেওয়া এই সংশোধনের ফলে বিদ্যুতের খুচরা গড় দাম ১০ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে সামান্য কমে ১০ টাকা ৪০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে।

অন্যদিকে, বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল (হুইলিং চার্জ) বৃদ্ধির ফলে পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) বার্ষিক আয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বৃদ্ধির নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। 

তবে এই স্বস্তির সমান্তরালেই দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। বাজেট ঘোষণার ঠিক আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের (অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিন) এই মূল্যবৃদ্ধি দেশের ৯ দশমিক ০৪ শতাংশের উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদরা। 

কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) এবং পোশাক খাতের উদ্যোক্তারা (বিকেএমইএ) সতর্ক করেছেন যে কাঠামোগত অনিয়ম ও ক্যাপাসিটি চার্জের মতো সমস্যা সমাধান না করে এমন তাড়াহুড়ো করে দাম বাড়ানোর ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ও পরিবহন ব্যয় বহুগুণ বেড়ে যাবে, যা বৈশ্বিক বাজারে দেশের রপ্তানি সক্ষমতা হ্রাস করার পাশাপাশি সাধারণ মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের জীবনযাত্রাকে চরম সংকটের মুখে ফেলবে।

এদিকে ইতোমধ্যে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে সরব নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনে নেমেছে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী জোট। 

আগের দামেই ফিরল নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের বিদ্যুতের দর: দাম বাড়ানোর ঘোষণার এক দিনের মাথায় বিদ্যুতের দামে সংশোধন করা হলো। আবাসিক খাতে প্রথম দুটি শ্রেণির গ্রাহকেরা আগের দামেই বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ করবেন। নিম্ন আয়ের মানুষদের বাড়তি দাম থেকে রেহাই দিতে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে বিতরণ সংস্থার ঘাটতি পূরণে সরকারকে ভর্তুকি দিতে হবে। বৃহস্পতিবার (৪ জুন) পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে দাম সংশোধনের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আবাসিকে প্রান্তিক গ্রাহকদের ০-৫০ ইউনিট ব্যবহারকারী লাইফলাইন শ্রেণি ও প্রথম ধাপের ৭৫ ইউনিট পর্যন্ত ব্যবহারকারীর জন্য আগের দাম পুনর্বহাল করতে বিতরণ সংস্থাগুলো আবেদন করেছে। এ আবেদন বিবেচনায় নিয়ে নতুন দাম কার্যকর না করে আগের দাম বহাল রাখা হলো। 

বিইআরসির আদেশে গত বুধবার আবাসিকে প্রান্তিক গ্রাহকদের (০-৫০ ইউনিট) প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ৫ টাকা ৩২ পয়সা, যা আগের চেয়ে ৬৯ পয়সা বেশি। এতে মাসে তাদের বিল বাড়ত ৩৪ টাকা ৫০ পয়সা। ০-৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীদের জন্য ইউনিটপ্রতি নতুন দাম ৬ টাকা ১৮ পয়সা। এই শ্রেণিতে বাড়ানো হয় ৯২ পয়সা। মাসে বিল বাড়ত ৬৯ টাকা।

এই দুই শ্রেণির গ্রাহকেরা সাধারণত একাধিক বাতি ও একটি বা দুটি ফ্যান ব্যবহার করেন। মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের ৬৫ শতাংশ এই দুই শ্রেণির ব্যবহারকারী। আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে সবচেয়ে কম বিদ্যুৎ ব্যবহার করে তারা। এখন এ দুটি ধাপের দাম আগের মতোই রাখা হলো।

ফলে আবাসিকে ‘লাইফলাইন’ শ্রেণির গ্রাহকের জন্য প্রতি ইউনিট ৪ টাকা ৬৩ পয়সা ও প্রথম ধাপের ৭৫ ইউনিট ব্যবহারকারীর দাম প্রতি ইউনিট ৫ টাকা ২৬ পয়সা থাকছে।

বছরে পাওয়ার গ্রিডের আয় বাড়তে পারে ৭০০ কোটি টাকা: বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুৎ সঞ্চালন মাশুল (হুইলিং চার্জ) বৃদ্ধির কারণে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ লিমিটেডের (পিজিসিবি) বার্ষিক আয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা পর্যন্ত বাড়তে পারে।

বৃহস্পতিবার এক মূল্য সংবেদনশীল তথ্যে বিষয়টি জানিয়েছে শেয়ারবাজারে বিদ্যুৎ খাতে তালিকাভুক্ত কোম্পানিটি। দেশের বড় শেয়ারবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) ওয়েবসাইটেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

পিজিসিবি কর্তৃপক্ষ জানায়, তাদের আয়ের মূল উৎস বিদ্যুৎ সঞ্চালন আয়, যা বিভিন্ন বিদ্যুৎ বিতিরণকারী প্রতিষ্ঠানের থেকে বিদ্যুৎ সঞ্চালনের মাধ্যমে পাওয়া যায়। গত বুধবার বিইআরসি কর্তৃক বিদ্যুৎ সঞ্চালন মূল্য হার বাড়ানো হয়েছে, যা চলতি জুন মাস থেকেই কার্যকর হবে। এতে কোম্পানির বার্ষিক বিদ্যুৎ সঞ্চালন আয় প্রায় ৭০০ কোটি টাকা বাড়তে পারে। তবে বিষয়টি বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদার উপর অনেকটা নির্ভর করে। 

কোম্পানিটি আরো জানায়, সরকার নির্ধারিত নতুন দাম অনুযায়ী, হুইলিং চার্জ ২৩০ কেভির ক্ষেত্রে ০.৩০৫৭ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৭৮৯ টাকা, ১৩২ কেভির ক্ষেত্রে ০.৩০৮৬ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৮২৫ টাকা এবং ৩৩ কেভির ক্ষেত্রে ০.৩১৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ০.৩৮৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় গ্রিড ব্যবহার করে বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলোর বিদ্যুৎ সঞ্চালনের ওপর এই বর্ধিত হার কার্যকর হবে।

বাজেটের আগেই নতুন ধাক্কা, মানুষের পকেটে বাড়তি চাপ: অর্থনীতিবিদরা বলছেন, সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় আগামী বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, ঋণ পরিশোধের চাপ সামাল দেওয়া এবং অর্থনীতিতে গতি ফিরিয়ে আনা। এর মধ্যেই বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে বাজেট বাস্তবায়নের আগে সরকারকে কঠিন অর্থনৈতিক বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করা হতে পারে। প্রস্তাবিত বাজেটের আকার প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা, যা চলতি অর্থবছরের ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকার বাজেটের তুলনায় প্রায় ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে বাজেটের আকার বাড়ছে প্রায় ১৯ শতাংশ।

সরকার বাজেটকে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, সামাজিক সুরক্ষা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ উৎসাহ এবং অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরতে চাইলেও বাস্তবায়ন সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা। কারণ রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বৈদেশিক সহায়তা প্রবাহ কমে যাওয়ার মতো চ্যালেঞ্জ এখনও বিদ্যমান।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুলাই-এপ্রিল সময়ে বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ বাবদ বাংলাদেশ পরিশোধ করেছে ৩৮০ কোটি ২০ লাখ ডলার। আগের অর্থবছরের একই সময়ে এ ব্যয় ছিল ৩৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে ঋণ পরিশোধ বেড়েছে প্রায় ৮ দশমিক ৪১ শতাংশ।

অন্যদিকে একই সময়ে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে ঋণের অর্থছাড় হয়েছে ৪২৩ কোটি ৬০ লাখ ডলার, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৫৩ দশমিক ৮৪ শতাংশ। নতুন ঋণের প্রতিশ্রুতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী অর্থবছরে শুধু বৈদেশিক ঋণের কিস্তি ও সুদ পরিশোধেই প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। অর্থাৎ সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ উন্নয়ন ব্যয়ের পরিবর্তে ঋণ পরিশোধেই চলে যাবে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, ঋণ পরিশোধের এই চাপ আগামী কয়েক বছর আরও বাড়বে। ফলে স্বাস্থ্য, শিক্ষা, সামাজিক নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ দেওয়া কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

ঋণের চাপের পাশাপাশি উচ্চ মূল্যস্ফীতি এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের কারণ। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে। মার্চে ছিল ৮ দশমিক ৭১ শতাংশ। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে মূল্যস্ফীতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে।

সরকার আগামী অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি সেই লক্ষ্য অর্জনকে আরও কঠিন করে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত, আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা এবং ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়েছে। এর প্রভাব সরাসরি দেশের বাজারে পড়ছে।

বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, ‘বাজেট সামনে রেখে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে মূল্যবৃদ্ধির ফলে মানুষের ব্যয় কতটা বাড়বে, সে বিষয়ে কোনও অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এ মন্তব্য নিয়ে অর্থনীতিবিদদের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু বিদ্যুৎ বিল বাড়ায় না, বরং পুরো অর্থনীতিতে ব্যয়ের একটি নতুন ঢেউ তৈরি করে।’

বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি তেলের দামও সম্প্রতি আবার বাড়ানো হয়েছে। এপ্রিল মাসে এক দফা বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির পর জুনে আবারও অকটেন, পেট্রোল ও কেরোসিনের দাম লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়ানো হয়েছে। যদিও ডিজেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।

সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণে এই সমন্বয় অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।

কিন্তু ভোক্তারা বলছেন, বাস্তবে এর প্রভাব সরাসরি তাদের জীবনযাত্রার ওপর পড়ছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি অর্থনীতিতে একটি ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ তৈরি করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. এম এম আকাশ বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়লে কৃষি, শিল্প, পরিবহন, বিপণন এবং সেবা খাতÑ সবখানেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত সেই অতিরিক্ত ব্যয় পণ্যের দামের মাধ্যমে ভোক্তার ওপর চাপানো হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যয় বাড়বে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে পারে, সেবা খাতে ব্যয় বৃদ্ধি পাবে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ আরও কঠিন হবে।

সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর। 

ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ সংস্থা কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব)-এর কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এস এম নাজের হোসাইন বলেন, ‘বিদ্যুৎ, গ্যাসসহ সব ধরনের জ্বালানি দেশের অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। ফলে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেলে তার সরাসরি ও পরোক্ষ প্রভাব অর্থনীতির প্রায় সব খাতে পড়ে। ব্যক্তিপর্যায় থেকে শুরু করে শিল্প-কারখানা, কৃষি, পরিবহন ও সেবা খাত- সব ক্ষেত্রেই উৎপাদন ও পরিচালন ব্যয় বেড়ে যায়। শেষ পর্যন্ত এই অতিরিক্ত ব্যয়ের চাপ ভোক্তার ওপরই বর্তায়, যা মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও বাড়িয়ে দেয় এবং মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়।’

তিনি বলেন, ‘নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই বিদ্যুৎ, ডিজেল, কেরোসিনসহ বিভিন্ন জ্বালানির দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য নেতিবাচক বার্তা বহন করে। অর্থনীতিকে চাঙা করা এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরির পরিবর্তে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।’

এস এম নাজের হোসাইন আরও বলেন, ‘বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির আগে দীর্ঘদিন ধরে ক্যাবসহ বিভিন্ন সংগঠন বিদ্যুৎ খাতের অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম, দুর্নীতি, সিস্টেম লস এবং ক্যাপাসিটি চার্জের মতো বিষয়গুলো সমাধানের দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু এসব কাঠামোগত সমস্যা দূর করার পরিবর্তে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ আরোপ করা হয়েছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’

ক্যাবের এই নেতা আরও বলেন, ‘বিশ্বব্যাপী বর্তমানে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার সম্প্রসারণে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ খাতে প্রয়োজনীয় গতি ও কার্যকর উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান নয়। দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য জ্বালানির উন্নয়নে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দিলে জ্বালানি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি হতে পারে।’

শিল্প উদ্যোক্তারাও বিদ্যুৎ ও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। নিট পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেছেন, বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার মধ্যে থাকা রফতানি খাতে নতুন করে ব্যয় বৃদ্ধি বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘শিল্প খাতকে টিকিয়ে রাখতে হলে দাম বাড়ানোর পরিবর্তে নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’

বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাম্প্রতিক মূল্যবৃদ্ধি ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, নিম্ন আয়ের মানুষের সুরক্ষা এবং উৎপাদন খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখার কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে। সামষ্টিক অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় তাই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের সফলতা নির্ভর করবে শুধু বড় অঙ্কের বরাদ্দের ওপর নয়, বরং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং ঋণনির্ভরতা কমানোর মতো কঠিন লক্ষ্যগুলো কতটা অর্জন করা যায় তার ওপর।

বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে বিদ্যুতের নতুন দাম ঘোষণা করেছে বিইআরসি। নতুন এ দাম জুন থেকেই কার্যকর হচ্ছে।

তাড়াহুড়া করে মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, কোনো চাপ ছিল না। বাজেট মাথায় রেখে দ্রুত করা হয়েছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, দাম বাড়ানোর ফলে মানুষের ব্যয় বাড়বে, তবে অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়নি। এটা করার সুযোগ আছে।

সরকারি-বেসরকারি সব বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তি অনুসারে নির্ধারিত দামে বিদ্যুৎ কিনে নেয় পিডিবি। এরপর তারা উৎপাদন খরচের চেয়ে কিছুটা কমে সরকার নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। ঘাটতি মেটাতে পিডিবি সরকারের কাছ থেকে ভর্তুকি নেয়, তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে কোম্পানি চালায়।

সবশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ বাড়ানো হয়। একই সঙ্গে পাইকারি দর ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা করা হয়।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন