প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফর
বাণিজ্য-শ্রমবাজারসহ ৯ বিষয়ে একমত
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২২ জুন ২০২৬, ২১:৩২
# সম্পর্ক ও সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা
# লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান
# পুত্রাজায়ায় তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা
# সম্পর্কের নতুন অধ্যায়ের প্রত্যাশা প্রধানমন্ত্রীর
# দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে অঙ্গীকার
# রোহিঙ্গা সংকটে একসঙ্গে কাজ করবে দু’দেশ
# দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়ার আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
# আনোয়ার ইব্রাহিমকে সস্ত্রীক ঢাকা সফরের আমন্ত্রণ
# মালয়েশিয়ায় সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথমবার রাষ্ট্রীয় সফরে বিদেশে অবস্থান করছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। বর্তমানে তিনি মালয়েশিয়া সফর শেষে বিশ্বের অন্যতম উন্নত অর্থনীতির দেশ চীনের উদ্দেশে রওয়া দিয়েছেন। তবে আপাতত ফোকাস মালয়েশিয়া সফর নিয়ে। এই সফরে বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় আরও শ্রমিক নিয়োগ ও দ্রুত শ্রমবাজার খুলে দেওয়া ছাড়াও দুই দেশের মধ্যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। সফরে বাংলাদেশ রিজিওনাল কম্প্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ বা আরসিইপিতে যোগ দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুই দেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবর্তন, অভিবাসী শ্রমিকদের সুরক্ষা এবং দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের বিষয়ে আবারও অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রতিরক্ষাসহ বিভিন্ন খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া।
সোমবার (২২ জুন) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর নিয়ে দেশটির শাংগ্রিলা হোটেলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। তিনি বলেন, ‘এই সফর দুই দেশের সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।’
লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান: মালয়েশিয়ার আমন্ত্রণে কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমানকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়া সরকারের ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রী জুলকিফলি হাসান ও তাঁর সহধর্মিণী। পরে প্রধানমন্ত্রীকে লালগালিচা সংবর্ধনা ও গার্ড অব অনার প্রদান করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে লালগালিচায় উষ্ণ অভ্যর্থনা জানিয়েছেন মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
পুত্রাজায়ায় তারেক রহমানকে উষ্ণ অভ্যর্থনা: স্থানীয় সময় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টায় কুয়ালা লামপুরের সাংগ্রি-লা হোটেল থেকে মোটর শোভাযাত্রা সহকারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমান মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক রাজধানী পুত্রাজায়ার উদ্দেশে রওনা হন। সকাল ৯টার দিকে তারা মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ‘পরদানা পুত্রা’ ভবন প্রাঙ্গণে পৌঁছান। এসময় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানকে স্বাগত জানান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও তার সহধর্মিনী ওয়ান আজিজাহ ওয়ান ইসমাইল।
এরপর লাল গালিচায় সংবর্ধনা দেওয়া হয় তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে; গার্ড অব অনার প্রদান করেন মালয়েশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর একটি সুসজ্জিত দল। এ সময় মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত পরিবেশন করা হয়। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের পর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর কাছে সফরসঙ্গীদের পরিচয় করিয়ে দেন তারেক রহমান। একইভাবে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী তার মন্ত্রিসভার সদস্যদের বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন।
পরিচয় পর্বের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ভবনের প্রবেশ পথে অতিথি বইয়ে সই করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে আনোয়ার ইব্রাহিম পঞ্চম তলায় যান, সেখানে তারা একান্ত বৈঠকে মিলিত হন।
এদিকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে পুত্রাজায়ায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় অভিমুখী সড়কের দুই পাশে টানানো হয়েছে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার জাতীয় পতাকা। সফরকালে প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে প্রথমে একান্ত বৈঠক এবং পরে প্রতিনিধি পর্যায়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে যা বলেছেন তারেক রহমান: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, সফরে তিনি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যমান প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার অংশ হিসেবে যৌথ কমিশন সভা এবং দুই দেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দ্বিপাক্ষিক পরামর্শ, সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছি। আমরা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের বৃদ্ধি স্বাগত জানাই এবং বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, তাদের আলোচনা আইসিটি, জ্বালানি, অবকাঠামো, জনশক্তি, হালাল শিল্প, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সেমিকন্ডাক্টর এবং অন্যান্য উচ্চ-মূল্যবান খাতসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তৃত ছিল।
বাংলাদেশ থেকে আরও শ্রমিক নিয়োগ ও যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে আহ্বান জানিয়েছেন উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধকরণ এবং আটক বাংলাদেশিদের সম্ভব হলে প্রত্যাবাসনের বিষয়েও আলোচনা করেছি। আমরা একমত হয়েছি যে, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য ও সাশ্রয়ী হওয়া উচিত, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং শ্রমিকদের ব্যয় হ্রাস পায়।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তিনি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার অব্যাহত সমর্থনের জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, ‘আমরা আঞ্চলিক সহযোগিতাও আলোচনা করেছি। বাংলাদেশ আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছে। আমরা রিজিওনাল কম্প্রিহিনসিভ ইকনমিক পার্টনারশিপে (আরসিইপি) যোগদানের আগ্রহও প্রকাশ করেছি।
তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম এবং তার সহধর্মিণীকে সুবিধাজনক সময়ে বাংলাদেশ সফরের জন্য আমন্ত্রণ জানিয়েছেন বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানান তারেক রহমান।
তিনি বলেন, ‘আজকের আলোচনা বাংলাদেশ–মালয়েশিয়া সম্পর্কের একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা করবে। আমরা অভিন্ন সমৃদ্ধি, আঞ্চলিক শান্তি এবং আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার জন্য ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করার প্রত্যাশা করছি।’
সংবাদ সম্মেলনে মাহদী আমিন বলেন, ‘রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া এসেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রায় ১৮ ঘণ্টার সংক্ষিপ্ত সফরে তিনি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও দেশটির রাজা সুলতান ইব্রাহিম সুলতান ইস্কান্দারের সঙ্গে বৈঠক করেন। সফরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আছেন তার সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানসহ ছোট একটি প্রতিনিধিদল। কুয়ালালামপুরে পৌঁছানোর পর প্রধানমন্ত্রী প্রবাসী বাংলাদেশিদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। সেখানে তিনি আগামীর বাংলাদেশ নিয়ে তার পরিকল্পনা তুলে ধরেন। দেশের উন্নয়নে প্রবাসীদের অবদানের কথা স্মরণ করেন তিনি।’
৩৩ পয়েন্টের যৌথ বিবৃতি: সফরকালে সোমবার দুই প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে প্রথমে একান্ত, পরে প্রতিনিধিদল পর্যায়ে বৈঠক হয় বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি বলেন, ‘বৈঠকে রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, শ্রমবাজার, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা, নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা হয়। নয়টি বিষয়ে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যে ৩৩ দফার যৌথ বিবৃতি দেওয়া হয়েছে।’
দুই দেশের আলোচনায় রাজনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, হালাল শিল্প, ডিজিটাল অর্থনীতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর, শ্রমিক কল্যাণ, শিক্ষা, পর্যটন, জ্বালানি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয় গুরুত্ব পায়।
শ্রমবাজার ফের চালু ও শ্রম সহযোগিতা: মালয়েশিয়ার বর্তমান বৈদেশিক শ্রমিক নীতির আলোকে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া উভয় দেশই স্বীকার করেছে যে নতুন বিদেশি কর্মীদের কোটার অনুমোদন বর্তমানে নিয়োগকর্তার যাচাইকৃত প্রয়োজনীয়তা এবং খাতভিত্তিক সর্বোচ্চ সীমার ওপর ভিত্তি করে কঠোরভাবে কেস-বাই-কেস (প্রতিটি ঘটনা আলাদাভাবে) মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, অনুমোদিত এ ধরনের যেকোনো কোটার ক্ষেত্রে উভয় দেশই কেবল নির্ভরযোগ্য ও যোগ্য নিয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ প্রক্রিয়াটি স্বচ্ছ, ন্যায্য, বৈষম্যহীন এবং প্রতিযোগিতামূলক নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে।
মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মীদের অব্যাহত, নিরাপদ এবং পারস্পরিক কল্যাণকর অভিবাসন নিশ্চিত করতে দুই দেশই জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপের (জেডব্লিউজে) বৈঠক আহ্বান করতে সম্মত হয়েছে। এই বৈঠকে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) মূল্যায়ন এবং উভয় দেশের বর্তমান প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নতুন ও হালনাগাদ সমঝোতা স্মারক প্রণয়নের ভিত্তি স্থাপনের ওপর আলোকপাত করা হবে।
কর্মী নিয়োগের বিষয়ে বাংলাদেশের দেওয়া প্রস্তাবকে সাধুবাদ জানিয়েছে মালয়েশিয়া। দুই প্রধানমন্ত্রী জনগণের মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্ব তুলে ধরে মালয়েশিয়ার উন্নয়নে বাংলাদেশি কর্মীদের অবদানকে স্বাগত জানান। তারা উল্লেখ করেন, মালয়েশিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি প্রবাসীরা দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও পারস্পরিক বিনিময় বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন।
শিক্ষা, প্রতিরক্ষা ও পর্যটন সহযোগিতা: মালয়েশিয়ায় অধ্যয়নরত প্রায় ১১ হাজার বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, শিক্ষাগত বিনিময় ও আর্থ-সামাজিক সম্পর্ক উন্নয়নে তাদের ইতিবাচক অবদান রাখার পাশাপাশি দেশে ফিরে আসার পর তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার মূল্য বিবেচনায় নিয়ে দুই নেতা শিক্ষাক্ষেত্রে সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছেন।
এ সহযোগিতার আওতায় বিশ্ববিদ্যালয়-থেকে-বিশ্ববিদ্যালয় (ইউনিভার্সিটি-টু-ইউনিভার্সিটি) অংশীদারত্ব, যৌথ গবেষণা কর্মসূচি এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের (টিভিইটি) ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। উভয় পক্ষ পারস্পরিকভাবে স্বীকৃত শিক্ষাগত যোগ্যতা, যৌথ ডিগ্রি কর্মসূচি এবং নমনীয় শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণের ওপর জোর দিয়েছে।
দুই নেতা শ্রমবাজারের চাহিদা এবং উভয় দেশের অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত খাতগুলোর সঙ্গে শিক্ষাক্রমের সামঞ্জস্য নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। বিশেষ করে স্নাতকদের কর্মসংস্থান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
মালয়েশিয়ার ‘ভিজিট মালয়েশিয়া ২০২৬’ (ভিএম২০২৬) এবং ‘মালয়েশিয়া ইয়ার অব মেডিকেল ট্যুরিজম ২০২৬’ (এমওয়াইএমটি২০২৬) প্রচারণাকে সামনে রেখে পর্যটন সহযোগিতা সম্প্রসারণের ব্যাপারে তারা উভয়েই আশাবাদ ব্যক্ত করেন। মালয়েশিয়া বাংলাদেশি পর্যটকদের আন্তরিক অভ্যর্থনা জানায় এবং দুই দেশের মধ্যে পর্যটন বিষয়ে প্রচার ও সাংস্কৃতিক বিনিময় বৃদ্ধির বিষয়ে তারা একমত হন। এছাড়াও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বৃদ্ধি, সামরিক প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রম এবং সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলায় সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা: বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসনে মালয়েশিয়ার সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এছাড়া আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকা এবং রিজিওনাল কমপ্রিহেনসিভ ইকোনমিক পার্টনারশিপ (জঈঊচ)-এ বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে মালয়েশিয়ার সহযোগিতার বিষয়টি আলোচনায় আসে।
সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর: সফরে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। পাশাপাশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি এক্সচেঞ্জ অব নোটস বিনিময় করা হয়।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার বড় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ছিল পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পারডুয়া ও এমএমসি পোর্ট।
প্রেস কনফারেন্সে মাহ্দী আমিন বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দ্রুত খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কম খরচ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মীর কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরির অনুরোধ করেছেন তিনি। দেশটিতে অনিয়মিত অবস্থায় থাকা বা কারাগারে থাকা বাংলাদেশিদের মানবিকভাবে বৈধতা দেওয়া অথবা নিরাপদে দেশে ফেরানোর বিষয়েও আলোচনা হয়েছে।
জ্বালানি খাতে এলএনজি, তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে মালয়েশিয়ার বিনিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। তিনি আরও বলেন, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও সম্মানজনক প্রত্যাবাসন, আসিয়ানের সেক্টরাল ডায়ালগ পার্টনার এবং আঞ্চলিক সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে (আরসিইপি) বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তিতে মালয়েশিয়ার সহায়তা চাওয়া হয়েছে।
সফরে সংস্কৃতি বিষয়ে একটি সমঝোতা স্মারক এবং বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও সন্ত্রাস দমনে দুটি ‘এক্সচেঞ্জ অব নোটস’ বিনিময় হয়েছে বলে জানান মাহ্দী আমিন। এসময় তিনি বলেন, পেট্রোনাস, আজিয়াটা, এয়ারএশিয়া, পার্ডুয়া ও এমএমসি পোর্টের শীর্ষ কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। সব মিলিয়ে এ সফর দুই দেশের সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ সহযোগিতায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে।
মালয়েশিয়ায় সফর শেষে চীনের পথে প্রধানমন্ত্রী: মালয়েশিয়ায় সফর শেষ করে চীনের পথে রওনা হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। আজ সোমবার বিকেল ৫টায় কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বাংলাদেশ বিমানের বিশেষ ফ্লাইটে তিনি দালিয়ান শহরের উদ্দেশে রওনা হন।
প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন বলেন, মালয়েশিয়া থেকে চীনের দালিয়ানের উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যাত্রা শুরু করেছেন। দালিয়ানে দুইদিন কর্মব্যস্ত কর্মসূচিতে থাকবেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী চীনের রাজধানী বেইজিং যাবেন। সেখানে চীনে প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রীয় সফরের মূল কর্মসূচি শুরু হবে।
দালিয়ানে বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। কুয়ালা লামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভিআইপি টার্মিনাল বুঙ্গা রায় কমপ্লেক্সে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিদায় জানান মালয়েশিয়ার ধর্মমন্ত্রী জুলফিকলি হাসান।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠনের চার মাস পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল রোববার মালয়েশিয়া যান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম শনিবার ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে মালয়েশিয়া ও চীনে প্রধানমন্ত্রীর ছয় দিনের সফরসূচি তুলে ধরেন।
সচিব সিয়াম জানান, চীন সফরের প্রথম দুইদিন ২৩ থেকে ২৪ জুন দালিয়ানে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম-ডব্লিউইএফের সম্মেলনের পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় বিভিন্ন বৈঠকে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী। এই সম্মেলন ‘সামার দাভোস’ নামে পরিচিত।
ডব্লিউইএফের সম্মেলনে সরকারপ্রধান, নীতিনির্ধারক, ব্যবসায়ী, উদ্ভাবক এবং প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক উদ্ভাবন, ভবিষ্যতে পৃথিবীর প্রবৃদ্ধি নিয়ে আলোচনা এবং মতবিনিময় করেন। সরকারপ্রধান মঙ্গলবার ‘ক্লাইমেট লিডারশিপ ইন শিফটিং গ্লোবাল ল্যান্ডস্কেপ’ শীর্ষক একটি অধিবেশনে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন। সন্ধ্যায় চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াং আয়োজিত স্বাগত নৈশভোজে তিনি যোগ দেবেন।
আসাদ আলম সিয়াম বলেছিলেন, ২৪ জুন সকালে ১৭তম বার্ষিক ‘সামার দাভোসের’ উদ্বোধন অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর দুপুরে ট্রেনে করে বেইজিংয়ের পথ ধরবেন তিনি।
পররাষ্ট্র সচিব জানান, সফরকালে চীনের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ডায়াওইউতাই গেস্ট হাউজে থাকবেন তারেক রহমান। পরদিন সকালে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের মিনিস্টার অব ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট অব সিপিসি সেক্টর কমিটি, পানি সম্পদ মন্ত্রী, সিটকা চেয়ারম্যান এবং এক্সিম ব্যাংক চেয়ারম্যানের সঙ্গে আলাদা বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। ২৫ জুন বিকেলে চীনের গ্রেট হলে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার তথ্য দেন পররাষ্ট্র সচিব।
তিনি বলেছিলেন, যেখানে দুইদেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট সকল বিষয় এবং ভবিষ্যতে এসবকে আরও কীভাবে এগিয়ে নেওয়া যায়, সে বিষয়ে আলোচনা হবে। বৈঠকের পর উভয় দেশের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হবে। পরদিন ২৬ জুন প্রধামন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে স্ট্যান্ডিং কমিটি অব ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের চেয়ারম্যান ঝাউ লি’র সঙ্গে।
চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার তথ্য দিয়ে পররাষ্ট্র সচিব বলেছিলেন, বৈঠকে দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক এবং বৈশ্বিক বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। বৈঠক শেষে ওইদিন তিনি বিকেলে বেইজিং থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন। সন্ধ্যায় ঢাকায় অবতরণ করবেন।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

