Logo

জাতীয়

সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন বাড়ছে জামায়াতের

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২৬, ০০:২৩

সরকারের সঙ্গে টানাপড়েন বাড়ছে জামায়াতের

ছবি: সংগৃহীত

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, প্রশাসন ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ বাতিল, ইসলামী ব্যাংককে ঘিরে সরকারি পদক্ষেপ এবং উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগের ইস্যুতে সরকার ও সংসদের প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সম্পর্কে  টানাপোড়ন চলছে। আওয়ামী লীগ-পরবর্তী রাজনৈতিক বাস্তবতায় দুই পক্ষের মধ্যে যে সমন্বয়ের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে তার বদলে একের পর এক ইস্যুতে প্রকাশ্য মতপার্থক্য সামনে আসছে। 

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দৃশ্যমান বিরোধের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন। তবে এর আড়ালে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে আরও গভীর অস্বস্তি কাজ করছে।

জামায়াতের অভিযোগ, সরকার ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ থেকে দল-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন জায়গায় দেওয়া নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এসব পদক্ষেপকে দলটি নিজেদের সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল করার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখছে।

এ ছাড়া জামায়াতের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের এলাকায় উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে সরকারি দলের নারী এমপিদের সম্পৃক্ত করা, বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ থেকে বিরোধী দলের এমপিদের বঞ্চিত করা এবং স্কুল-কলেজের পরিচালনা পর্ষদে সরকারি দলের একচ্ছত্র প্রভাব প্রতিষ্ঠার অভিযোগও তুলছে দলটি। তাদের দাবি, এসব কারণে নিজ নিজ এলাকায় জনপ্রতিনিধি হয়েও অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছেন না বিরোধী দলের এমপিরা।

জামায়াত নেতাদের ভাষ্য, সরকার গঠনের পর থেকেই বিএনপি এমন কিছু নীতি ও সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থানকে দুর্বল করছে। অন্যদিকে বিএনপির বক্তব্য, রাষ্ট্র পরিচালনায় সরকারকে নিজস্ব পরিকল্পনা ও নীতির ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। ফলে বিরোধী দলের সব প্রত্যাশা বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে সম্পর্কের অবনতি এখন স্পষ্ট। তার মতে, সরকার সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে নিজস্ব অগ্রাধিকার অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে চাইছে। অন্যদিকে জামায়াত রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের দাবিগুলো আদায়ে সরকারকে চাপ দিচ্ছে। এই টানাপোড়ন দীর্ঘস্থায়ী হলে দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। তবে, দল দুটির দীর্ঘ সম্পর্কের বিশ্লেষণ করে তিনি বলেন, হয়তো বা তাদের দূরত্ব বেশিদিন থাকবে না। 

জুলাই সনদ থেকেই দৃশ্যমান বিরোধ: সরকার গঠনের পর থেকেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন প্রশ্নে দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ প্রকাশ্যে আসে। জামায়াতের দাবি, গণঅভ্যুত্থানের চেতনা অনুযায়ী রাজনৈতিক সংস্কার, বিচার বিভাগে পরিবর্তন এবং সনদে থাকা গুরুত্বপূর্ণ প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নে সরকার ধীরগতি দেখাচ্ছে।

অন্যদিকে সরকারের অবস্থান, জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি থেকে তারা সরে যায়নি। বরং ধাপে ধাপে সব অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করা হবে। তবে এ ইস্যুতে বিরোধী দলের ধারাবাহিক চাপকে সরকার ইতিবাচকভাবে নেয়নি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংরক্ষিত সংসদ সদস্য সেলিমা রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে রাজনৈতিক চাপের ইস্যুতে পরিণত করায় পরিস্থিতি জটিল হয়েছে। তার দাবি, বিএনপি সনদ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতিতে অটল রয়েছে।

এদিকে সুপ্রিম কোর্টের সাতজন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১১ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলের পদত্যাগ দুই পক্ষের দূরত্ব আরও স্পষ্ট করেছে। পদত্যাগপত্রে তারা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অগ্রগতির অভাব, পৃথক সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় গঠন বাতিল এবং বিচারপতি নিয়োগসংক্রান্ত অধ্যাদেশ বাতিলের বিষয় উল্লেখ করেন।

এ ছাড়া জুলাই-আগস্ট আন্দোলনের স্মরণে ৩৬ দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট। দলীয় সূত্র বলছে, চলতি বাজেট অধিবেশন শেষে সরকারকে জুলাই সনদসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দাবি বাস্তবায়নে চাপ বাড়াতে আরও কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে।

উন্নয়ন ও প্রশাসনে বৈষম্যের অভিযোগ: জামায়াতের অভিযোগ, তাদের এমপিদের নির্বাচনী এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে সরকারি দলের নারী এমপিদের সম্পৃক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সরকারি দলের এমপিরা বিশেষ বরাদ্দ ও প্রশাসনিক সহযোগিতা পেলেও বিরোধী দলের এমপিরা অনেক ক্ষেত্রেই বঞ্চিত হচ্ছেন।

দলটির আরও অভিযোগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজিং কমিটি ও গভর্নিং বডি গঠনের ক্ষেত্রেও সরকার একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধী দলের জনপ্রতিনিধিদের রাজনৈতিক অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।

ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতেও অস্বস্তি: জামায়াতের সঙ্গে সরকারের সম্পর্কের অবনতির অন্যতম কারণ হিসেবে উঠে এসেছে ইসলামী ব্যাংক ইস্যু। দলটির অভিযোগ, ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদ থেকে জামায়াতপন্থি ব্যক্তিদের সরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, জামায়াতের প্রভাব রয়েছে বলে পরিচিত অন্যান্য আর্থিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিও সরকার বিশেষ নজর দিচ্ছে বলে মনে করছে দলটি। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনাকেও একই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবে দেখছেন দলটির নেতারা।

জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও ঢাকা-১২ আসনের সংসদ সদস্য সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, সরকার বিভিন্নভাবে জামায়াতকে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে। তার দাবি, বিরোধী দলের এমপিদের নানা ক্ষেত্রে বঞ্চিত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ইসলামী ব্যাংকসহ যেসব প্রতিষ্ঠান জামায়াত-ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত, সেগুলোর ওপরও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। তার অভিযোগ, এসব পদক্ষেপের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা চলছে।

তবে বিএনপির বক্তব্য ভিন্ন বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, প্রশাসন, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা উন্নয়ন কার্যক্রমে কোনো সিদ্ধান্তই নির্দিষ্ট কোনো দলের চাপ বা প্রত্যাশার ভিত্তিতে নেওয়া হবে না। তার ভাষ্য, আন্দোলনের সময় রাজনৈতিক সমঝোতা থাকলেও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতা ভিন্ন। তাই সরকারকে নিজস্ব নীতি ও পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোতে হচ্ছে। ফলে বিরোধী দলের সব প্রত্যাশা সব সময় পূরণ করা সম্ভব নয়।

নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত: জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে মতবিরোধ, আইন অঙ্গনে পদত্যাগ, উন্নয়ন বরাদ্দে বৈষম্যের অভিযোগ এবং ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগ- সব মিলিয়ে সরকার ও জামায়াতের মধ্যে টানাপড়েন নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দল যদি সরকারবিরোধী কর্মসূচি আরও জোরদার করে এবং সরকারও কঠোর অবস্থান নেয়, তাহলে দুপক্ষের দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। তবে আওয়ামী লীগবিরোধী যুগপৎ আন্দোলনের পুরোনো সমীকরণ ভেঙে নতুন রাজনৈতিক মেরুকরণ তৈরি হবে কি না, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন