Logo

জাতীয়

১৮ বছরে পাহাড়ধসে ৩১২ জনের মৃত্যু

কক্সবাজারের ৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার বসতি

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ১১:১২

কক্সবাজারের ৫১ পাহাড়ে ২২ হাজার বসতি

ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার শহর ও আশপাশের ৫১টি পাহাড়ে গড়ে উঠেছে প্রায় ২২ হাজার অবৈধ বসতি, যেখানে ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন কয়েক লাখ মানুষ। চলতি সপ্তাহের টানা ভারী বৃষ্টিতে পাহাড়ধসে ২২ জনের মৃত্যু হয়েছে।

পরিবেশবাদীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে পাহাড়ধসে প্রাণ হারিয়েছেন ৩১২ জন। রাজনৈতিক প্রভাব, ভূমিদস্যু চক্র এবং পুনর্বাসনের অভাবে পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ বন্ধ হচ্ছে না বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

টানা বর্ষণে কক্সবাজারের পাহাড়তলী, বাদশাঘোনা, ছাত্তারঘোনা, খাজা মঞ্জিল, লারপাড়া, টেকনাইফ্যা পাহাড়সহ বিভিন্ন এলাকায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা বেড়েছে। বাসিন্দাদের ভাষ্য, ভারী বৃষ্টির সময় পাহাড়ে ফাটল ধরার শব্দই তাদের সবচেয়ে বড় আতঙ্ক। ঝুঁকি সম্পর্কে জানা থাকলেও বিকল্প আশ্রয়ের অভাবে অনেকেই পাহাড় ছাড়তে পারছেন না।

শুধু গত এক সপ্তাহেই জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে চার শতাধিক ভূমিধসের ঘটনায় পাঁচ মাদ্রাসাছাত্রীসহ অন্তত ২২ জন নিহত হয়েছেন। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন পাহাড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাস করছেন বলে স্থানীয় সূত্রের দাবি।

প্রতি বর্ষায় প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিলেও বৃষ্টি শেষে আবার শুরু হয় পাহাড় কাটা ও অবৈধ বসতি নির্মাণ। পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, ভূমিদস্যু চক্র দরিদ্র মানুষের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে পাহাড় দখল ও বিক্রি করছে। এতে একদিকে যেমন প্রাণহানি বাড়ছে, অন্যদিকে বন উজাড় ও পরিবেশের ভারসাম্যও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা ছাড়া পাহাড়ের বসতি স্থায়ীভাবে উচ্ছেদ করা কঠিন। তবে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষ সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং গত তিন দিনে অন্তত পাঁচ হাজার মানুষকে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে।

পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাদশাঘোনা এলাকায় ৭০ থেকে ৮০ ফুট উঁচু একটি পাহাড়ের ঢাল, চূড়া ও পাদদেশে অন্তত ৬০০টি ঘর নির্মাণ করা হয়েছে। সম্প্রতি সেখানে নতুন করে পাহাড় কেটে ঘর নির্মাণের চিহ্নও পাওয়া গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট পাহাড়ি জমি দখল ও বিক্রি করছে।

পরিবেশবাদীদের দাবি, কক্সবাজার পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের ৫১টি পাহাড়ে গত তিন দশকে ২২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বসতিতে লাখো মানুষ বাস করছেন। তাদের অধিকাংশই ভাসমান শ্রমজীবী, জলবায়ু উদ্বাস্তু ও নিম্নআয়ের মানুষ।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি করিম উল্লাহ বলেন, পাহাড় কাটার ফলে শুধু গাছপালা ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে না, পাহাড়ের পানি ধারণক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। ফলে একদিকে যেমন পাহাড়ধসের ঝুঁকি বাড়ছে, অন্যদিকে শহরে জলাবদ্ধতাও ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

কক্সবাজার পৌরসভার সাবেক মেয়র সরওয়ার কামাল বলেন, রাজনৈতিক দলের নাম ব্যবহার করে ১০-১২টি সিন্ডিকেট রোহিঙ্গাদের দিয়ে পাহাড় কাটছে। পাহাড় কাটা বন্ধ না হওয়ায় শহরের জলাবদ্ধতাও দূর করা যাচ্ছে না। বর্ষার সময় পাহাড় কাটার মাটি বৃষ্টির পানিতে ভেসে শহরের নালা-ড্রেন ভরাট হচ্ছে, আধঘণ্টার বৃষ্টিতে পুরো শহর ডুবে যায়।

পৌরসভার প্রশাসনিক কর্মকর্তা ছৈয়দুল হক আজাদ বলেন, তিন বছর আগে শহরের পাহাড়গুলোতে অতিঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে থাকা নয় হাজারের বেশি মানুষের তালিকা করা হয়েছিল। কিন্তু পুনর্বাসনের বিকল্প ব্যবস্থা না থাকায় সরানো যায়নি। এখন সংখ্যা আরও বেড়েছে।

পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ‘এনভায়রনমেন্ট সোসাইটির (ইয়েস)’ এক জরিপ প্রতিবেদনে ভূমিধসে নিহতের পরিসংখ্যান পাওয়া যায়। ওই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ সাল থেকে চলতি ২০২৬ সালের ৮ জুলাই পর্যন্ত ১৮ বছরে ৩১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০০৮ সালে ১৩ জন, ২০০৯ সালে পাঁচ জন, ২০১০ সালে ৬২ জন, ২০১২ সালে ২৯ জন, ২০১৫ সালে পাঁচ জন, ২০১৬ সালে ১৭ জন, ২০১৭ সালে ২৬ জন, ২০১৮ সালে ২৮ জন, ২০১৯ সালে ২২ জন, ২০২০ সালে ২৯ জন, ২০২২ সালে ২৫ জন, ২০২৩ সালে ছয় জন, ২০২৪ সালে ১০ জন এবং চলতি ২০২৬ সালে ৩৫ জন। এর মধ্যে রোহিঙ্গা ৫৪ জন।

পাহাড়ধসের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ছিল ২০১০ সালের ১৫ জুন। ওই দিনের টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জেলায় ৬২ জনের মৃত্যু হয়েছিল উল্লেখ করেন ইয়েস চেয়ারম্যান মুজিবুল হক।

২০১০ সাল থেকে পাঁচ শতাধিক দখলদারের বিরুদ্ধে ৩৪০টি মামলা করে পরিবেশ অধিদপ্তর। এর মধ্যে পাহাড় নিধন মামলা ২২০টি। এরপরও পাহাড় নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না বলে মন্তব্য করেন পরিবেশ অধিদপ্তর কক্সবাজার কার্যালয়ের উপপরিচালক খন্দকার মাহমুদ পাশা। তিনি বলেন, বৃষ্টির সময় বিশেষ করে সন্ধ্যা থেকে গভীর রাতে পাহাড় নিধন চলে। তখন অভিযানে নামার সুযোগ থাকে না।

গত এক বছরে জেলায় পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে বন বিভাগ মামলা করে ৩০৪টি। এসব মামলায় কয়েকশ ব্যক্তিকে আসামি করা হলেও ধরা পড়েছে খুবই অল্প। কর্মকর্তারা বলেন, জনবলসংকট এবং আধুনিক প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে দুর্গম পাহাড়ের পাহাড় নিধন বন্ধ এবং অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা যাচ্ছে না।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন