Logo

জাতীয়

৫৯ উপজেলা বন্যাকবলিত, মৃত্যু ৫৪ জনের: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০২৬, ২১:২৩

৫৯ উপজেলা বন্যাকবলিত, মৃত্যু ৫৪ জনের: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনামন্ত্রী

ছবি: সংগৃহীত

টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ৫৯টি উপজেলা নতুন করে বন্যা ও জলাবদ্ধতার কবলে পড়েছে, যা এ পর্যন্ত ৫৪ জনের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। চলমান এই বন্যা পরিস্থিতিতে চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ির বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ঘরবাড়ি, সড়ক অবকাঠামো, ফসলি জমি এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে শত শত কোটি টাকার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে আসছে।

এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগ লাঘব, উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদারে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে সরকার। তবে বন্যা ও জলাবদ্ধতার পানি সরার পাশাপাশি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে তীব্র স্বাস্থ্যঝুঁকি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বন্যা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশের কারণে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশনের চরম সংকট তৈরি হওয়ায় ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডের মতো মারাত্মক পানিবাহিত রোগের পাশাপাশি জন্ডিস (হেপাটাইটিস এ ও ই), চর্মরোগ (স্ক্যাবিস) এবং ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশনের (ইউটিআই) মতো সংক্রামক ব্যাধি ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক, গর্ভবতী নারী এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগে আক্রান্তরা এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছেন।

বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সাংবাদিকদের বিস্তারিত তথ্য জানান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু।

আসাদুল হাবিব দুলু জানান, চলমান বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা। মারা গেছেন ৫৪ জন।

এবার বর্ষায় টানা বর্ষণে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বন্যা দেখা দিয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, মৌলভীবাজার বন্যার কবলে পড়েছে। এখন পানি নামার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে আসছে ক্ষতির চিত্র।

সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনাসহ তার মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন।

তিনি বলেন, ইতোমধ্যে ত্রাণ পরিচালনার জন্য এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া চাল ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম তুলে ধরেন। এর আগে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সভাপতিত্ব করেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

চট্টগ্রাম অঞ্চলে পানি সরতেই বেরিয়ে আসছে ক্ষতি: সপ্তাহব্যাপী অতি ভারীবর্ষণ থামার পর চট্টগ্রাম অঞ্চলের নিম্নাঞ্চল থেকে পানি সরতে শুরু করেছে। পানি নেমে যাওয়ায় উঠে আসছে সড়ক অবকাঠামো ও ফসলি জমির ক্ষয়-ক্ষতির নানা চিত্র। বিভিন্ন স্থানে মানুষের ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, মাছ ও গবাদি পশুর খামারে বড় ধরনের ধ্বংসের ছাপ রেখে গেছে বন্যা। অনেক স্থানে গ্রামীণ সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার বড় ভরসা অভ্যন্তরীণ সড়কের সিংহ ভাগই চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। কোথাও কোথাও ভেঙে পড়েছে সেতু ও কালভার্ট।

তিন পার্বত্য জেলা এবং চট্টগ্রামের কৃষি, সড়কসহ নানা খাতে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ পুরোপুরি জানা যায়নি এখনো। অনেক স্থানে ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণের কাজ শুরু হলেও পুরো চিত্র পাওয়া যায়নি। বেশ কয়েকটি উপজেলায় স্থানীয় প্রশাসন, সড়ক ও কৃষি বিভাগ প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির একটা হিসাব দিয়েছে। এই হিসাবে তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী, লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া উপজেলার কৃষি, সড়ক, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫৮ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি। তবে স্থানীয় জনসাধারণ বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ বাস্তবে অনেকগুণ বেশি। অনেক এলাকায় এখনো পানি থাকায় মাঠপর্যায়ের মূল্যায়ন শেষ হয়নি। ফলে চূড়ান্ত হিসাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া, বাঁশখালী উপজেল ও বান্দরবান জেলা। চট্টগ্রামের সাতকানিয়া ও বাঁশখালীর প্রায় সব উপজেলা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব এলাকার বহু কাঁচা বাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। জমির ফসল, খামারের মাছ নষ্ট হওয়ায় বিপুলসংখ্যক মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকে বাড়ি ও ফসল হারিয়ে পুরোপুরি নিঃস্ব হয়েছেন।

বান্দরবান: বান্দরবানে বন্যায় সড়ক, সেতুসহ যোগাযোগ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে শীলকখালের ব্রিজঘাটা বেইলিসেতু ভেসে গেছে। অকেজো হয়ে পড়েছে রাবার ড্যাম। রাবার ড্যামে আটকে পড়া পানির চাপে বদলে গেছে শীলকখালের পানি প্রবাহের গতিপথ। বাঁধভাঙা স্রোতে ভেসে গেছে ঘরবাড়ি ও বেইলিসেতুর একাংশ। বন্ধ হয়েছে যানবাহন চলাচল।

সপ্তাহব্যাপী বন্যা ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানে প্রায় সাড়ে ১২ হাজার পরিবারের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ কমবেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বন্যায় সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রায় ১৫১ কিলোমিটার সড়ক ও ৪টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া জেলার ৫ হাজার ২৬০ একর কৃষি জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বলেন, বন্যা, পাহাড়ি ঢল, ভূমিধস ও জলাবদ্ধতায় জেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।  তবে ৬ জুলাই থেকে গত সোমবার পর্যন্ত জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ জনবসতি এলাকা প্লাবিত ছিল। বর্তমানে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা ২ হাজার ৫৮২ জন মানুষ নিজ নিজ বাড়িতে ফেরার অপেক্ষায় রয়েছেন।

জেলা প্রশাসক জানান, বন্যার সময় জেলার বিভিন্ন সড়কের ৪৭টি স্থানে ভূমিধস এবং ২১টি স্থানে গাছ উপড়ে পড়ায় যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সওজ, ফায়ার সার্ভিস ও সেনাবাহিনীর যৌথ তৎপরতায় সড়কগুলো আবার চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। তবে দুর্যোগে লামা উপজেলায় ভূমিধসে পাঁচজন এবং বন্যার পানিতে ডুবে দুজনের মৃত্যু হয়েছে।

রাঙামাটি: রাঙামাটিতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে কৃষি খাতে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের হিসাবে, জেলার ১০টি উপজেলায় ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজি, আউশ ও আমন ধান, আদা, হলুদ, ফলের বাগানও রয়েছে। মাঠপর্যায়ে এখনো পানি থাকায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ।

সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের হিসাবে, জেলার ২৬টি স্থানে প্রায় আড়াই কিলোমিটার সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চট্টগ্রাম-রাঙামাটি, বান্দরবান-রাঙামাটি, রাঙামাটি-খাগড়াছড়িসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কের পিচঢালাই ও রক্ষাদেয়াল ধসে গেছে। প্রাথমিক হিসাবে সড়ক খাতে প্রায় ৯ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

এ ছাড়া জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বন্যায় পুকুর, মাছের ঘের ও পোনা নার্সারি ডুবে গিয়ে প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্যমতে, ২৪টি খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১০টি গরু ও ২ হাজার ৪০০ মুরগি মারা গেছে। এ খাতে প্রায় ৩৮ লাখ ৭৭ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রাঙামাটি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মিজানুর রহমান বলেন, জেলায় সব মিলিয়ে মৎস্য খাতে এখন পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ১৫ লাখ টাকার মতো আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।

রাঙামাটি জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মনিরুজ্জামান বলেন, জেলার ১০টি উপজেলায় প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে। এখন পর্যন্ত পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় মোট ৩ হাজার ৬৭৫ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

খাগড়াছড়ি: খাগড়াছড়ির মাইনি ও চেঙ্গী নদীর পানি নেমে যাওয়ায় জেলার সার্বিক পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক হয়েছে। তবে পানি সরে গেলেও দুর্গত মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। অনেক পরিবারের বসতঘর ও গৃহস্থালির আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষি, মৎস্য ও সড়ক অবকাঠামোয় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে।

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা রাজু আহমেদ বলেন, এবারের বন্যায় জেলায় প্রায় আড়াই কোটি টাকার মাছ ও মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) খাগড়াছড়ির নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আনোয়ার উল্লাহ বলেন, জেলার ৯টি উপজেলায় ২৫টি ছোট-বড় সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি সড়ক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় যান চলাচল স্বাভাবিক করতে জরুরি ভিত্তিতে সংস্কারকাজ চলছে।

খাগড়াছড়ি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নাসির উদ্দীন বলেন, বন্যায় জেলার প্রায় ১ হাজার ৩১ হেক্টর ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত হিসাব প্রস্তুত করা হবে।

লোহাগাড়া ও সাতকানিয়া: চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর ক্ষয়ক্ষতির চিত্র স্পষ্ট হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে উপজেলার ৩০ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক ও ১৭টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া ১ হাজার ৬২০টি মৎস্য খামার ডুবে প্রায় ৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

কৃষি বিভাগের হিসাবে, ১৬ হাজার ৫০০ কৃষকের প্রায় ৬০ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে। এ ছাড়া প্রাণিসম্পদ খাতে ৬টি ছাগল, ১ হাজার ৫০০ মুরগি ও ২০০ হাঁস মারা গেছে। পশুখাদ্য, খামারের ক্ষতিসহ এ খাতে প্রায় সাড়ে ১৩ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।

সাতকানিয়ায় পানি দ্রুত নেমে গেলেও ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ হিসাব এখনো প্রস্তুত হয়নি। কৃষি বিভাগ মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ করছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনার প্রস্তাবও মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।

সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খোন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বন্যার পানি দ্রুত নেমে যাচ্ছে। আশা করছি, কালকের মধ্যে পুরোপুরি নেমে যাবে। এরপর ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে।’

বাঁশখালী: বাঁশখালীতে বন্যায় ১১০ মিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট এবং ২টি সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উপজেলা প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে, অবকাঠামো খাতে সম্ভাব্য ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ১৫ কোটি ৮ লাখ টাকা। পানি কমতে শুরু করলেও অনেক এলাকায় এখনো মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফেরেনি। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ ঘরবাড়ি পরিষ্কার করছেন।

উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, দুর্গত মানুষের মধ্যে ইতিমধ্যে ১২৬ টন চাল, ১ হাজার প্যাকেট শুকনা খাবার এবং সাড়ে ৬ হাজার প্যাকেট রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।

উপজেলা প্রকৌশলী ইফরাত বিন মনির বলেন, উপজেলায় ১১০ কিলোমিটার সড়ক, ২৫টি কালভার্ট, ২টি সেতুসহ ১৫ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র সরকার বলেন, ‘এখনো কয়েকটি ইউনিয়ন জলমগ্ন। এ কারণে পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাইনি। আমরা পুরো এলাকায় হিসাব প্রস্তুতির কাজ করছি।’

সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান মির্জা ফখরুলের: দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাম্প্রতিক ভারী বৃষ্টিপাত ও পাহাড়ি ঢলের কারণে সৃষ্ট বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা, জরুরি সাড়াদান এবং সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমে সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থাকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

সচিবালয়ে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সভাকক্ষে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় সভাপতিত্বকালে তিনি এ আহ্বান জানান। 

সভা শুরুর বক্তব্যে বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলা বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে জনগণের দুর্ভোগ লাঘবে সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। প্রত্যেক মন্ত্রণালয় ও সংস্থাকে নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে দ্রুত সেবা ও সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।

তিনি আরও বলেন, বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানকে সমন্বয়ের ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনরুদ্ধারে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দায়িত্ব পালন করতে হবে।

সভায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় সর্বাত্মকভাবে কাজ করছে। 

তিনি বন্যাকবলিত এলাকায় ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, কোনো ধরনের দুর্নীতি ছাড়াই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দিতে হবে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্তদের একটি নির্ভুল ডাটাবেজ তৈরি করতে হবে, যাতে ত্রাণ বিতরণ কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর করা যায়। একই সঙ্গে তিনি সরবরাহ ব্যবস্থা (সাপ্লাই চেইন) এবং যোগাযোগ অবকাঠামো সচল রাখার ওপরও গুরুত্ব দেন।

সভায় বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিভাগ নিজ নিজ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করবে। পানি নেমে যাওয়ার পর প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র মূল্যায়ন করে খাদ্য সহায়তা কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে।

এছাড়া কৃষি খাতের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সক্রিয়ভাবে কাজ করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে নতুন বীজ সরবরাহের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন্যাকবলিত এলাকায় বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং রোগব্যাধি প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সভায় আরও সিদ্ধান্ত হয়, এলজিইডি’র আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত মহাসড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ দ্রুত পুনরুদ্ধারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সরকারি সূত্র জানায়, বন্যা পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসেবা এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে।

জলাবদ্ধতা, বন্যা ও স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে কোন রোগের আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি?

টানা কয়েক দিন ধরেই রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হচ্ছে আর এতে দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে করে ঘরের পরিবেশ স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছে।

অন্যদিকে বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পাশাপাশি নদীগুলোয় উজানের পানির ঢলে দেশের অনেক এলাকায় বন্যা দেখা দিয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বহু মানুষ। এই পরিস্থিতিতে বাড়ছে নানা সংক্রামক রোগের ঝুঁকিও। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে বিশেষজ্ঞরা এ বিষয়ে কথা বলেছেন।

তারা ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েড, চর্মরোগ, ইউরিনারি ট্র্যাক্ট ইনফেকশন (ইউটিআই) এবং কিছু ক্ষেত্রে হেপাটাইটিস এ ও ই-এর মতো পানিবাহিত রোগ নিয়ে সচেতন করেছেন।

জলাবদ্ধতা বা বন্যার সময় মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকিকে মূলত দুই ভাগে ভাগ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) সাবেক উপদেষ্টা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি বলেন প্রথমত ঝুঁকি তৈরি হয় বিশুদ্ধ পানি, নিরাপদ খাবার এবং স্যানিটেশনের সংকট থেকে। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, চারদিকে অনেক পানি আছে, কিন্তু খাবার মতো পানি নেই।

এটাই বন্যার সময় সবচেয়ে বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যাগুলোর একটি। ফলে নিরাপদ পানি ও খাবার নিশ্চিত করা না গেলে ডায়রিয়া, কলেরাসহ বিভিন্ন খাবার ও পানিবাহিত রোগ দ্রুততম সময়ের মাঝেই ছড়িয়ে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন