Logo

জাতীয়

বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে অনিয়ম হয়নি: বেবিচক

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১৯:২৫

বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে অনিয়ম হয়নি: বেবিচক

ছবি: সংগৃহীত

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ব্যয়, ভেরিয়েশন কাজ, চুক্তি বাস্তবায়ন ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনকে ‘আংশিক, প্রেক্ষাপটবিহীন ও বিভ্রান্তিকর’ দাবি করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। সংস্থাটি বলেছে, প্রকল্পের সব ব্যয় সরকার অনুমোদিত ডিপিপি, আন্তর্জাতিক চুক্তি এবং নির্ধারিত বিধি অনুসারেই করা হয়েছে। প্রকল্পে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি।

রোববার (২৬ জুলাই) এক বিস্তারিত ব্যাখ্যায় বেবিচক জানায়, থার্ড টার্মিনালের নির্মাণকাজ প্রায় দুই বছর আগেই শেষ হয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা, অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের কারণে বাণিজ্যিক কার্যক্রম শুরু হতে সময় লেগেছে। বর্তমানে এসব প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে এবং আগামী ডিসেম্বর ২০২৬ থেকে টার্মিনালটি চালুর লক্ষ্যে কাজ চলছে।

বেবিচকের ভাষ্য, এ সময়ে প্রকল্প সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য প্রকাশ জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করার পাশাপাশি দেশের অন্যতম বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পের ভাবমূর্তি, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের আস্থা এবং রাষ্ট্রীয় রাজস্ব আহরণেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অনুমোদন ছাড়াই ৩,২০০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগ অস্বীকার: গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘অনুমোদন ছাড়াই ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয়’ সংক্রান্ত অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বেবিচক জানায়, প্রকল্পের প্রতিটি ব্যয় প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি, প্রকল্প স্টিয়ারিং কমিটি, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এবং পরিকল্পনা কমিশনের অনুমোদনের ভিত্তিতেই হয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, ২০১৭ সালে প্রকল্পের প্রথম ডিপিপি অনুমোদিত হয় ১৩ হাজার ৬১০ কোটি টাকা ব্যয়ে। আন্তর্জাতিক দরপত্রের পর সংশোধিত ডিপিপির মূল্য দাঁড়ায় ২১ হাজার ৩৯৯ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সালে অনুমোদিত হয়। পরে ভেরিয়েশন কাজসহ দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপি ২১ হাজার ৩৬৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০২৫ সালের ৭ ডিসেম্বর অনুমোদন পায়। এখন পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ২০ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা, যা অনুমোদিত ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে।

গাছ, পুকুর ও অন্যান্য ব্যয় নিয়ে ব্যাখ্যা: থার্ড টার্মিনালের সৌন্দর্যবর্ধনে গাছ লাগানোর ক্ষেত্রে প্রতিটি গাছের মূল্য ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা দেখানো হয়েছে- এমন অভিযোগও নাকচ করেছে বেবিচক।

তাদের দাবি, আন্তর্জাতিক দরপত্রে মোট ১৪ হাজার ৮২৪টি আইটেমের সমন্বয়ে চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে। কোনো একটি আইটেমের মূল্য আলাদাভাবে তুলে ধরে পুরো চুক্তিকে মূল্যায়ন করা সঠিক নয়। চুক্তিতে নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ীই সব বিল পরিশোধ করা হয়েছে।

একইভাবে পুকুর নির্মাণে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ের অভিযোগের জবাবে বেবিচক জানায়, বিদ্যমান জলাশয়ের কাদা অপসারণ, ঢাল তৈরি, কংক্রিট ব্লক দিয়ে পাড় বাঁধাই, রাস্তা নির্মাণসহ বিভিন্ন কাজের ব্যয় এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং সব ব্যয় অনুমোদিত চুক্তি অনুযায়ী হয়েছে।

ভেরিয়েশন কাজ ও অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ: মাটি অপসারণ, ডিজেল পাম্প, ইউপিএস, জ্বালানি তেল, সফট ওপেনিং ও দ্রুত কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে বেবিচক।

তাদের ভাষ্য, এসব ব্যয়ের বেশিরভাগই ভেরিয়েশন কাজ, যা প্রকল্পের আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এনওসিডি জেবি’র নির্দেশনা ও অনুমোদনের ভিত্তিতে এবং এফআইডিআইসি কন্ডিশনস অফ কন্ট্রাক্ট অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি এসব ব্যয়ে সরকারেরও প্রয়োজনীয় অনুমোদন রয়েছে।

বেবিচক আরও জানায়, কোভিড-১৯ মহামারির কারণে কাজের অগ্রগতি ব্যাহত হওয়ায় নির্ধারিত সময়ে প্রকল্প শেষ করতে অতিরিক্ত জনবল, যন্ত্রপাতি ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে যে অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে, তা চুক্তির বিধান অনুসারেই পরিশোধ করা হয়েছে। অন্যথায় ঠিকাদার বিলম্বজনিত ক্ষতিপূরণ দাবি করতে পারতেন।

৬,৩০০ কোটি টাকার অডিট আপত্তি নিয়ে অবস্থান: বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখিত ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম বা অতিরিক্ত পরিশোধের অভিযোগ প্রসঙ্গে বেবিচক বলেছে, এটি মূলত ফরেইন এইডেট প্রজেক্টস অডিট ডিপার্টমেন্ট (এফএপিএডি)-এর একটি অডিট আপত্তি, যা এখনো নিষ্পত্তির পর্যায়ে রয়েছে।

সংস্থাটি জানায়, ডিসপিউট বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী অডিট আপত্তির ভিত্তিতে ঠিকাদারের বিল আটকে রাখা বা অর্থ পুনরুদ্ধারের সুযোগ ছিল না। পরে এমিকেবল সেলেটমেন্ট কমিটি গঠন করে বিষয়টি পর্যালোচনা করা হয়। ওই কমিটি এক হাজার ৭৭ কোটি টাকা প্রকল্প ব্যয় থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেছে এবং অবশিষ্ট অর্থ চুক্তি অনুযায়ী ঠিকাদারের প্রাপ্য বলে মত দিয়েছে। এ বিষয়ে অডিট আপত্তির জবাব প্রস্তুতের কাজ চলছে।

১ শতাংশ ব্যয়সীমা লঙ্ঘনের অভিযোগও প্রত্যাখ্যান: অতিরিক্ত কাজের ক্ষেত্রে ১ শতাংশ ব্যয়সীমা অতিক্রম করে ২৩ শতাংশ ব্যয় করা হয়েছেÑ এমন অভিযোগ প্রসঙ্গে বেবিচক জানায়, চুক্তিতে উল্লেখিত ১ শতাংশ সীমা কাজের পরিমাণের হ্রাস-বৃদ্ধির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, অতিরিক্ত ভেরিয়েশন কাজের ক্ষেত্রে নয়। ফলে এ বিধানকে সর্বোচ্চ ব্যয়সীমা হিসেবে ব্যাখ্যা করা সঠিক নয়।

ডিসপিউট বোর্ডও পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করেছে যে, প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ারের অনুমোদনই কর্তৃপক্ষের অনুমোদন হিসেবে গণ্য হবে।

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য বিকৃতভাবে উপস্থাপনের অভিযোগ: প্রকল্পের কারিগরি উপদেষ্টা অধ্যাপক শামসুল হক এবং কনট্রাক্ট স্পেশালিস্ট হারুন-অর-রশিদের বক্তব্যও গণমাধ্যমে খণ্ডিত ও বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে বলে দাবি করেছে বেবিচক।

সংস্থাটি জানায়, অধ্যাপক শামসুল হক প্রকিউরমেন্ট বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। অন্যদিকে হারুন-অর-রশিদ ডিসপিউট বোর্ডে সিএএবির পক্ষে কারিগরি সহায়তা দিলেও ডিসপিউট বোর্ড শেষ পর্যন্ত প্রকল্পের ইঞ্জিনিয়ার কর্তৃক অনুমোদিত সব ভেরিয়েশন কাজকে চুক্তি অনুযায়ী বৈধ বলে সিদ্ধান্ত দেয়।

অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি নিয়ে ব্যাখ্যা: অনিয়মকে বৈধতা দিতে অ্যামিকেবল সেটেলমেন্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে—এমন অভিযোগও অস্বীকার করেছে বেবিচক।

তাদের দাবি, এই কমিটি গঠনের উদ্দেশ্য ছিল ডিসপিউট বোর্ডের সিদ্ধান্তের পর ঠিকাদারের বিভিন্ন দাবির বিষয়ে আলোচনার মাধ্যমে সরকারের আর্থিক দায় কমানো। ঠিকাদারের প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত দাবির বিপরীতে আলোচনার মাধ্যমে তা কমিয়ে ৬৬২ কোটি টাকায় নামিয়ে আনার সুপারিশ করা হয়েছে। এতে সরকারের প্রায় ২ হাজার ৩৩৮ কোটি টাকা সাশ্রয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

‘পোস্ট-ফ্যাক্টো অনুমোদন’ প্রয়োজন নেই: বেবিচক বলেছে, প্রকল্পে কোনো অর্থ অনুমোদন ছাড়া ব্যয় করা হয়নি। ফলে ব্যয়কে বৈধতা দিতে পরবর্তীতে একনেকের অনুমোদন বা ‘পোস্ট-ফ্যাক্টো’ অনুমোদনের প্রয়োজন নেই। সব ব্যয়ই সরকার অনুমোদিত দ্বিতীয় সংশোধিত ডিপিপির আওতায় হয়েছে।

সবশেষে সংস্থাটি দাবি করেছে, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ৬ হাজার ৩০০ কোটি টাকার অনিয়ম, অনুমোদনহীন ব্যয় কিংবা বিধিবহির্ভূত অর্থ পরিশোধের অভিযোগ বাস্তবসম্মত নয়। এসব অভিযোগ প্রকল্পের প্রকৃত তথ্য, অনুমোদিত নথি ও চুক্তিগত বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন