Logo

জাতীয়

কড়া হুঁশিয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর

ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে অস্থির শিক্ষাঙ্গন

Icon

নিজস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৫ আগস্ট ২০২৬, ০০:৪৩

ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষে অস্থির শিক্ষাঙ্গন

ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতা–কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ। মঙ্গলবার বিকালে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সামনে, ছবি: সংগৃহীত

গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী নিরাপদ ও সহিংসতামুক্ত ক্যাম্পাসের প্রত্যাশাকে ধূলিসাৎ করে দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে আবারও আধিপত্য বিস্তার ও আবাসিক হলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে সংঘাতময় রাজনীতি। কিছুদিন ধরে ক্যাম্পাসগুলোর একক নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, রাজনৈতিক মতপার্থক্য এবং পরস্পরকে বিভিন্ন বিতর্কিত ট্যাগিংকে কেন্দ্র করে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনÑ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির মুখোমুখি অবস্থানে।

মঙ্গলবার (৪ আগস্ট) ঢাকা কলেজ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, পুরান ঢাকার সরকারি আলিয়া মাদরাসা এবং রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) মতো দেশের প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দুই সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ, রড, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মহড়া এবং ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসব সংঘাতের জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ ছাত্রনেতা, মাদরাসার অধ্যক্ষসহ উভয় পক্ষের বহু নেতাকর্মী গুরুতর আহত হয়েছেন। এতে ক্যাম্পাসে ছাত্রলীগের সংঘাতময় অতীতের স্মৃতি ফিরে আসার আতঙ্কে সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে তীব্র ভীতি ছড়িয়ে পড়েছে, যা গোটা শিক্ষাঙ্গনের স্বাভাবিক পরিবেশকে মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছে।

সংঘাতময় এই পরিস্থিতির বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের সন্ত্রাস বরদাশত করা হবে না এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। 

অন্যদিকে, সংকট নিরসনে শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা পেশিশক্তির ব্যবহার বন্ধ করে উভয় সংগঠনকে দায়িত্বশীল ও গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন।

জবিতে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষ: জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষে জড়িয়েছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার দুপুরের এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফ, শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য ইয়াসিন সাইফসহ অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন।

তারা ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। হাসপাতালেও দুই ছাত্র সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ধাওয়া-ধায়ী ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, দুপুর পৌনে ১২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মিলনায়তনে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পৌঁছলে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। সংঘর্ষের পর শিবির নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাস থেকে তাড়িয়ে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।

এরপর বেলা ২টায় ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ছাত্রশিবিরের বিভিন্ন ইউনিটের নেতাকর্মীরা জড়ো হন। আর হাসপাতালের মূল ফটকের বাইরে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়ো হয়ে সেøাগান দিতে থাকেন।

একপর্যায়ে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীরা ধাওয়া করতে গেলে পাল্টা ধাওয়ায় শিবিরের নেতাকর্মীরা হাসপাতালের ভিতরে ছুটে যান। এ সময় দুই পক্ষ একে অপরের দিকে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে। অনেকের হাতে দেশীয় অস্ত্রও দেখা যায়।

জকসুর সহসভাপতি (ভিপি) রিয়াজুল ইসলাম ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে ধাক্কাধাক্কি ও অবস্থান কর্মসূচি পালনের বিষয়টি জানান।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে, জাতীয় ছাত্রশক্তির জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি শাহিন মিয়া ছাত্রদলের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ করেন। তিনি জানান, মিলনায়তনে সেমিনার শেষে শহীদ মিনারের সামনে আসার পর ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা তাদের ওপর হামলা করে।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদী হাসান হিমেল বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ইউজিসির চেয়ারম্যান মামুন আহমেদকে অপমানিত করার জন্য ছাত্রশিবির ও তাদের সহযোগী সংগঠন প্রস্তুতি নিয়েছিল। তাদের বিনয়ের সঙ্গে সরে যেতে বলা হয়েছিল। তারা সরেননি। এক পর্যায়ে এগিয়ে এলে মারামারি হয়। ছাত্রদলের অনেক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন বলে জানান তিনি।

সূত্রাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মতিউর রহমান বলেন, দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘর্ষ হয়েছে। এরপর ন্যাশনাল হাসপাতালে আহতরা ভর্তি হয়েছেন। সেখানেও আরেকবার ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ঘটনা ঘটেছে। আমাদের পুলিশ পরিস্থিতি শান্ত করছে।

জবির ঘটনার রেশ ছড়িয়ে পড়ে আশপাশের কলেজগুলোতেও। সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজ, কবি নজরুল কলেজসহ কয়েকটি কলেজের ছাত্রদল নেতাকর্মীরা জড়ো হন। 

আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষ, অধ্যক্ষসহ বেশ কয়েকজন আহত: রাজধানীর বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসায় ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে মারামারি হয়েছে। মঙ্গলবার বিকাল ৫টার দিকে মাদ্রাসার সামনে এ সংঘর্ষে আহত হয়েছে বেশ কয়েকজন।

আহতদের মধ্যে মাদ্রাসা অধ্যক্ষ মাহমুদ ওবায়দুল হক (৫২), আলিয়া শাখা ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক সানাউল্লাহ (৩০) এবং লালবাগ থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব ও ঢাকা মহানগর দক্ষিণ ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নিছার উদ্দিন রাব্বিকে (২৭) ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. ফারুক বলেন, আলিয়া মাদ্রাসা ক্যাম্পাস থেকে আহত অবস্থায় দুজনকে হাসপাতালে আনা হয়েছে। জরুরি বিভাগে তাদের চিকিৎসা চলছে।

আহতদের হাসপাতালে নেওয়া শিক্ষার্থী সাব্বির রহমান বলেন, বিকালে সানাউল্লাহ ও রাব্বি ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় ৩০ থেকে ৪০ জনের একটি দল রড, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায়।

হামলায় সানাউল্লাহর দুই পা, পিঠসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত লাগে। রাব্বির বাম পায়েও গুরুতর জখম হয়।

ডিএমপির লালবাগ বিভাগের উপ-কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান বলেন, সন্ধ্যা ৬টার দিকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে কী কারণে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন আহত হওয়ার খবর পেয়েছি, তবে সঠিক সংখ্যা এখনো জানা যায়নি।

ঢাকা কলেজে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ: ঢাকা কলেজে সংঘর্ষে জড়ালেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। মঙ্গলবার বেলা ৩টার দিকে কলেজ অডিটোরিয়ামের সামনে এ ঘটনা ঘটে। এতে দুই পক্ষেরই কয়েকজন আহত হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল-ছাত্রশিবির সংঘর্ষে জড়িয়েছে- এমন খবর আসার পরপরই দুপক্ষ মারামারি শুরু করেন। তাতে ২০ জনের মতো আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।

এর মধ্যে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের ১১ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করেছেন কলেজ শাখা ছাত্রদলের সদস্য সচিব মিলাদ হোসেন।

তিনি বলেন, আমাদের ঢাকা কলেজের অডিটোরিয়ামে একটা কর্মী সভা ছিল। আমরা সেখানে যাওয়ার সময় আমাদেরকে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা বহিরাগত নিয়ে হামলা করে। পরে আমরা অধ্যক্ষের কাছে গেলে তারা ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করে। আমরা তার প্রতিবাদে মিছিল করি। আর এখন ক্যাম্পাসে অবস্থান নিয়েছি। আমরা কাউকে ঢাকা কলেজ দখল করতে দেব না।

মিলাদ হোসেনের ভাষ্য, ঢাকা কলেজের সামনে ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা ককটেল বিস্ফোরণ করেন।

তবে ছাত্রদলকে হামলার ঘটনা অস্বীকার করে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এস এম ফরহাদ বলেন, আমাদের আজকে পূর্বঘোষিত শহীদদের জন্য দোয়া মাহফিল ছিল। সেখানে ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদেরকে ছাত্রদল হামলা করে। এতে আমাদের অনেকে আহত হয়েছেন।

পুলিশের রমনা বিভাগের উপ কমিশনার শেখ জাহিদুল ইসলাম বলেন, দুইপক্ষ দুদিকে ছিল। আমরা মাঝে। এখন শান্ত থাকলেও আমরা চলে গেলে কী হবে বলা যাচ্ছে না। আমরা আছি।

বেরোবিতে মুখোমুখি ছাত্রদল-শিবির, উত্তপ্ত পরিস্থিতি: বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (বেরোবি) প্রধান ফটকে ছাত্রদল-শিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় দেশীয় অস্ত্র ও লাঠিসোঁটাসহ অবস্থান নেয় ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির নেতাকর্মীরা। এর আগে সংঘর্ষের ঘটনায় উভয় দল ঘটনাস্থলে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছিল। 

মঙ্গলবার বিকাল ৪টার পর থেকে রংপুর মহানগরসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে বেরোবির প্রধান ফটকে নেতাকর্মীরা উপস্থিত হতে শুরু করেন। এ সময় তাদের হাতে ছুরি, চাপাতি, লাঠিসোঁটাসহ বিভিন্ন দেশীয় অস্ত্র দেখা যায়। 

কর্মসূচিতে আশা এক যুবদল কর্মী বলেন, আমরা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সঙ্গে সহমত ও সহমর্মিতা জানিয়ে এখানে অবস্থান নিয়েছি। এখান থেকে ওই রাজাকার, আল-বদরদের জানিয়ে দিতে চাই, ওদের জায়গা একাত্তরে যেমন বাংলাদেশে হয়নি, ৫ আগস্টের পরেও বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং রংপুরবাসী তাদের বয়কট করেছে। 

তবে একই স্থানে কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও ঘটনাস্থলে আসেনি ছাত্রশিবির কিংবা তাদের অঙ্গসংগঠনের কোনো নেতাকর্মী। 

বেরোবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মো. ফেরদৌস রহমান বলেন, আমাদের বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়ন রয়েছে। আমরা তাদের ক্যাম্পাসে ঢুকতে নিষেধ করেছি। পুরা রংপুর মহানগরের যেসব নেতাকর্মীরা ছিলেন, আমরা তাদের বুঝিয়েছি। ক্যাম্পাসে ছাত্র ব্যতীত কেউ প্রবেশ করতে পারবেন না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। 

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহিংসতা নিয়ে কড়া হুঁশিয়ারি শিক্ষামন্ত্রীর: দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাম্প্রতিক সংঘর্ষ ও সহিংসতার ঘটনায় কড়া বার্তা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন। তিনি বলেন, শিক্ষাঙ্গনে কোনো ধরনের সন্ত্রাস বা সহিংসতা বরদাশত করা হবে না। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

মঙ্গলবার বিকালে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো সরকার নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘ঘটনাগুলো সম্পর্কে আমরা অবগত। পড়ালেখা বাদ দিয়ে যারা এসব ঘটনায় জড়াচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আমরা শিক্ষাঙ্গনে কোনো সন্ত্রাস বরদাশত করব না। কেউ উসকানি দিলে তাদেরও শাস্তির আওতায় আনা হবে।’

সংঘাতের শুরু: গত ২ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ হলে প্রাধ্যক্ষের কক্ষে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন ছাত্রদল ও শিবিরের নেতাকর্মীরা। শিবির-সমর্থিত হল সংসদের এজিএসের কক্ষে বহিরাগত দুই তরুণের সমকামিতার অভিযোগ ঘিরে এ সংঘর্ষের সূত্রপাত। এতে দুই পক্ষের বেশ কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর ক্যাম্পাসে পরস্পরবিরোধী স্লোগান দিয়ে দুই পক্ষই বিক্ষোভ মিছিল করে। এতে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়।

পরদিন ৩ আগস্ট রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে (বেরোবি) ছাত্রদল ও শিবিরের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া এবং সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে ছাত্রশিবির আয়োজিত প্রদর্শনীতে আওয়ামী লীগের আমলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্র্যাইব্যুনালে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের ছবি প্রদর্শন ঘিরে এ ঘটনার সূত্রপাত।

জানা যায়, শিবিরের প্রদর্শনীতে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াত নেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, আলী আহসান মুজাহিদ, আব্দুল কাদের মোল্লা, মীর কাসেম আলী এবং বিএনপি নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছবি টাঙানো হয়। সেখানে লেখা হয়, ‘ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের রোষানলে বিচারিক হত্যাকাণ্ডের শিকার শহীদরা’।

তবে নিজামী, মুজাহিদ, সাঈদীর ছবি টাঙানোর আপত্তি জানান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা। তারা ছবিগুলো ছিঁড়ে ফেলার চেষ্টা করেন। এতে শিবির নেতাকর্মীরা বাধা দিলে মারামারি শুরু হয়। একপর্যায়ে ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের ধাওয়ায় পিছু হটেন ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। পরে তারা সংগঠিত হয়ে শিবির নেতাকর্মীদের ধাওয়া দেন। পরে শিবির আবারও পাল্টা ধাওয়া দিয়ে ছাত্রদলকে ক্যাম্পাস ছাড়া করে।

ট্যাগিংয়ে বিষিয়ে উঠছে ছাত্ররাজনীতি: ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে মুখোমুখি হয়ে পড়ে একসময়ের বন্ধুভাবাপন্ন দুটি ছাত্রসংগঠন ছাত্রদল ও ছাত্রশিবির। তখন থেকেই একে অপরেরর বিরুদ্ধে নানা ট্যাগিং করছেন সংগঠন দুটির নেতাকর্মীরা। 

সম্প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দুটি সমকামিতার ঘটনা সামনে আসে, যা নিয়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। দুটি ঘটনায় ছাত্রশিবির জড়িত বলে অভিযোগ তোলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা। 

পরস্পরবিরোধী তোপ ছাত্রদল-শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতাদের: ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব বলেন, ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে প্রোপাগান্ডা ছড়াচ্ছে শিবির। ৫ আগস্টের পর তারা আত্মপ্রকাশ করে। আত্মপ্রকাশ করেই ছাত্রদলের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে প্রোপাগান্ডা তৈরি করছে। এর মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সঙ্গে তারা আমাদের একটা বিভেদ তৈরি করতে চায়।

তিনি বলেন, ‘রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শিবির ক্যাডাররা দেশীয় অস্ত্র নিয়ে ছাত্রদলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে। একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটলে ছাত্রদল নেতাকর্মীরা ধৈর্য হারাবে এটিই স্বাভাবিক। কেউ যদি বারবার আপনাকে মারতে আসেন, তাহলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা কি অন্যায়? জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল আজ প্রতিরোধটুকুই গড়ে তুলেছে।’

তবে ছাত্রদল সভাপতির এমন অভিযোগ উড়িয়ে দিয়েছেন ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। তিনি বলেন, ‘বেরোবি, জবি, ঢাকা কলেজ; সবগুলো ক্যাম্পাসের ঘটনাগুলো দেখবেন ছাত্রদল আগ বাড়িয়ে শিবির নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করেছে। প্রকাশ্যে সেটা সবাই দেখেছেন। তারপরও শিবিরের ওপর দোষ চাপানোর রাজনীতি চলছে।’

এস এম ফরহাদ বলেন, ‘বেরোবিতে ছাত্রদল দাবি করেছে ম্যাডাম খালেদা জিয়ার পাশে নিজামী-মুজাহিদের ছবি টাঙানোয় তারা ক্ষুব্ধ। অথচ বেগম খালেদা জিয়া এক মঞ্চে নিজামী-মুজাহিদ-সাঈদীর সঙ্গে বসে সভা-সমাবেশ করেছেন। তারা আজকে খালেদা জিয়ার চেয়েও বড় বিএনপি সাজতে আসছেন। এটা ছাত্রদলের চরম হিপোক্রেট মানসিকতা।’

গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণের তাগিদ: দুই পক্ষই একেবারে ধৈর্যহারা হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন শিক্ষাবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের (জাবি) সরকার ও রাজনীতি বিভাগের প্রাক্তন এ অধ্যাপক বলেন, ‘বিএনপি ক্ষমতায়, অথচ ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের তেমন রাজনীতি নেই। সাধারণ শিক্ষার্থীরাও তাদের ভয় পাচ্ছে না। বরং প্রতিপক্ষ শিবিরের ছেলেরা আস্ফালন করছে। এটা ছাত্রদল হয়তো কোনোভাবেই মানতে পারছে না। আবার ছাত্রশিবির ভাবছে, সব বড় ক্যাম্পাসে তাদের নেতারা ছাত্র সংসদ নির্বাচনে জিতেছে। ক্যাম্পাসের বাইরে বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও ভেতরে তো তাদেরই একক আধিপত্য। এখানে ছাত্রদল কে, কোথা থেকে আসছে?’

দুটি ছাত্র সংগঠনকেই গণতান্ত্রিক রীতি অনুসরণের তাগিদ দিয়ে অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী বলেন, পেশিশক্তির প্রভাব ছাত্র-ছাত্রীরা অপছন্দ করে। তা তো নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে প্রমাণিত। তারপরও কেন তারা পেশিশক্তির প্রভাব খাটাচ্ছে, তা আমার কাছে বোধগম্য নেই। আমি মনে করি, শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে সব পক্ষকেই দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। সবাইকে গণতান্ত্রিক রীতিনীতি অনুসরণ করতে হবে। এক্ষেত্রে সাধারণ শিক্ষার্থীদেরও সোচ্চার হতে হবে। শিক্ষাঙ্গনে যে কোনো অস্থিরতা সামগ্রিক পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন