শপিংমল-মার্কেট-দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ
গ্যাস-জ্বালানি সংকটে বাড়ছে লোডশেডিং
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ‘কিছুটা উন্নতি’র আশা প্রতিমন্ত্রীর
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১২ আগস্ট ২০২৬, ২৩:১৯
ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে দুর্যোগ ও যান্ত্রিক ত্রুটি এবং তীব্র জ্বালানি সংকটের কারণে দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে রেকর্ড লোডশেডিং ও গ্যাসের ভয়াবহ আকাল। সাড়ে ১২ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের বিপরীতে চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে না পারায় রাজধানী থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত জনজীবন অচল হয়ে পড়েছে। তীব্র গরমে সিলেটের ব্যবসায়িক কার্যক্রম ও চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হওয়া থেকে শুরু করে নরসিংদীতে মহাসড়ক অবরোধ, এমনকি ঈশ্বরদীতে বিদ্যুৎকর্মীকে অবরুদ্ধ করার ঘটনা ঘটেছে। বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার আশঙ্কায় গোপালগঞ্জে পুলিশি নিরাপত্তা পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে বুধবার (১২ আগস্ট) বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানিয়েছেন, মঙ্গলবার নেওয়া একটি বিশেষ ‘কৌশলে’ বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হওয়ার কথা। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের অংশ হিসেবে মালয়েশিয়া থেকে সরাসরি আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আমদানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ‘কিছুটা উন্নতির’ আশা প্রতিমন্ত্রীর: জনজীবনে তীব্র দুর্ভোগের মধ্যে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী আশার বাণী শুনিয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যা থেকে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হবে বলে জানিয়েছিলেন তিনি। তিনি বলেন, আমরা একটা কৌশল নিয়েছি। সেই কৌশলটা মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে নিয়েছি। আমরা আশা করছি বুধবার সন্ধ্যা থেকে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির কিছুটা হলেও উন্নতি হবে, ইনশাল্লাহ।
এদিন সচিবালয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন তিনি; বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সামাল দিতে কী ধরনের কৌশল নেওয়া হয়েছে তা জানতে চাইলে বিস্তারিত বলেননি প্রতিমন্ত্রী।
তার কথায়, দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও ‘পর্যাপ্ত গ্যাস দিতে না পারায়’ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। তিনি বলেন, গ্যাস যদি আপনি পর্যাপ্ত সাপ্লাই না করতে পারেন, তাহলে বিদ্যুতের সংকট হবে। পাওয়ার প্লান্টকে গ্যাস দিতে না পারলে বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে না।
গরমের মধ্যে তীব্র লোডশেডিংয়ে দুর্ভোগে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। এ ছাড়া জরুরি সেবা ব্যাহত হচ্ছে, প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ও।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশের তথ্য অনুযায়ী, ১০ আগস্ট দেশের সর্বোচ্চ লোডশেডিং তিন হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াটে উঠেছিল।
১১ আগস্ট বিকাল ৩টায় সর্বোচ্চ লোডশেডিং ছিল ৩ হাজার ৪৬৫ মেগাওয়াট। গ্যাসের সংকটের সঙ্গে কয়লাভিত্তিক কয়েকটি কেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়াও বিদ্যুৎ ঘাটতি বাড়িয়েছে।
গ্যাসের সংকট সামাল দিতে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা এগিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রতিমন্ত্রী।
এর আগে ২৮ জুলাই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমকে চিঠি দেন এবং তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। গ্যাস সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পাশে থাকার আশ্বাস দেয় মালয়েশিয়া।
মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংক, অর্থাৎ বিশেষ শীতল ট্যাংক-কনটেইনারে এলএনজি আনার বিষয়েও কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন অমিত।
তবে এটি তাৎক্ষণিক সমাধান নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিনি বলেন, আইএসও ট্যাংকের মাধ্যমে যদি এলএনজি আনতে হয়, এটি একটি প্রক্রিয়ার ব্যাপার আছে। কারণ আপনারা জানেন, আইএসও ট্যাংক এটা অ্যাভেইলেবেল না। মার্কেট থেকে এটা একটা মধ্যমেয়াদি সমাধানের ব্যাপার। সেটা নিয়ে আমরা কাজ করছি।
মালয়েশিয়া থেকে আইএসও ট্যাংকে এলএনজি আনার সম্ভাবনা নিয়ে বাংলাদেশ কাজ করছে বলে এর আগে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমেও খবর আসে। বর্তমান সংকটে সরকার ‘হাতে থাকা সব বিকল্প’ নিয়ে কাজ করছে বলে দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
মঙ্গলবার ঢাকা ক্লাবে জ্বালানি খাত নিয়ে সেমিনারে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, আমাদের হাতে যতগুলো বিকল্প ছিল, আমরা সব বিকল্প নিয়ে কাজ করছি।
ব্যবসায়ীদের কাছ থেকেও সরকার পরামর্শ নিচ্ছে জানিয়ে অমিত বলেন, তাদের কোনো বুদ্ধি আছে কি না, তাদের কোনো পরামর্শ আছে কি না, আমরা জানতে চাচ্ছি। ইভেন আপনাদের কাছেও যদি কোনো বুদ্ধি-পরামর্শ থাকে, আমরা ওয়েলকাম করছি।
গত ২১ জুলাই আগুনে এক্সেলারেট এনার্জির মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যায়। পরে একটি ইউনিট চালু হলেও টার্মিনালটি এখনো পুরো সক্ষমতায় ফিরতে পারেনি। অন্যদিকে সোমবার নতুন এলএনজি কার্গো এলেও উত্তাল সাগরের কারণে সামিটের টার্মিনালে তা খালাস করা যায়নি। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ নেমে আসে প্রায় ২১৩ কোটি ঘনফুটে।
দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন দ্রুত বাড়ানোর সুযোগও নেই বলে মন্তব্য করেন প্রতিমন্ত্রী।
ভুল নীতির মাসুল দিতে হয়: বর্তমান পরিস্থিতির জন্য আগের সরকারগুলোর জ্বালানি নীতিকে দায়ী করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, যখন ভুল নীতি আপনি গ্রহণ করবেন, একটি সময় তার মাসুল দিতে হবে। বিগত সরকারগুলো কোনো মধ্যমেয়াদি, কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান সূত্র খোঁজেননি। তাৎক্ষণিক পথে গেছেন বলে আজকে হঠাৎ করে একটি সংকট হয়েছে।
সিলেটে ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং, বিপাকে ব্যবসায়ী-চাকরিজীবীরা: সিলেটে লোডশেডিং অসহনীয় আকার ধারণ করেছে। প্রায় ঘণ্টায় ঘণ্টায় লোডশেডিং হচ্ছে নগর এলাকায়। গ্রামাঞ্চলের অবস্থা আরও বেশি শোচনীয়; সেখানে দিনের অর্ধেক সময়ও বিদ্যুৎ মিলছে না। একদিকে অসহনীয় লোডশেডিং, অন্যদিকে তীব্র গরমে জনজীবন একেবারে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসের স্বাভাবিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ী ও চাকরিজীবীরা। সিলেট আবহাওয়া অফিস বুধবার শহরের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ৩৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করেছে। এ অবস্থায় দিন-রাত সমানতালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটে হাঁসফাঁস অবস্থা বিরাজ করছে নগরবাসীর মধ্যে।
বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, জ্বালানি সংকটের কারণে জাতীয়ভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন কম হচ্ছে। সিলেটে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে, তা যথাযথভাবে বণ্টন করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সরবরাহ বাড়লে লোডশেডিংয়ের মাত্রা কমে আসবে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার শঙ্কায় নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশকে চিঠি: গোপালগঞ্জে ঘন ঘন লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য অপ্রীতিকর ঘটনা ও নাশকতা এড়াতে বিদ্যুৎ স্থাপনা ও উপকেন্দ্রগুলোর নিরাপত্তা জোরদারে পুলিশের সহযোগিতা চেয়েছে ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড-ওজোপাডিকো।
মঙ্গলবার ওজোপাডিকো গোপালগঞ্জ বিদ্যুৎ সরবরাহ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাঈন উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে পুলিশ সুপারের কাছে এ অনুরোধ জানানো হয়।
লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্যুতের কর্মীকে আটকে রাখলো জনতা: পাবনার ঈশ্বরদীতে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে বিদ্যুৎ সমিতির এক মিটার রিডারকে আটকে রাখেন ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। এসময় তারা পল্লীবিদ্যুতের কর্মচারী-কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন স্লোগান দেন।
মঙ্গলবার বিকালে উপজেলার সাহাপুর ইউনিয়নের চরগড়গড়ি আলহাজ মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। অবরুদ্ধ মিটার রিডারের নাম আইনুল হোসেন। তিনি পাবনা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি-১ দাশুড়িয়া জোনাল অফিসে কর্মরত।
রংপুরে লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ জনজীবন: তীব্র গরমের মধ্যে রংপুরে বেড়েছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। দিনে-রাতে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন নগর ও গ্রামের মানুষ। ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রা।
ভ্যাপসা গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ মানুষ। শিক্ষার্থীদের পড়াশোনাতেও তৈরি হচ্ছে ভোগান্তি। বিদ্যুৎনির্ভর যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকায় ক্ষুদ্র ব্যবসা ও দোকানপাট, কারখানার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
মহেশখালীতে এলএনজি সরবরাহ কমেছে ৬৩ শতাংশ: কক্সবাজারের মহেশখালীতে ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালগুলোতে কারিগরি ত্রুটি ও সমুদ্রের প্রতিকূল আবহাওয়ার যৌথ ধাক্কায় জাতীয় গ্রিডে এলএনজি সরবরাহ আশঙ্কাজনকভাবে ধসে পড়েছে। মহেশখালীর দুটি টার্মিনালের মোট রিগ্যাসিফিকেশন সক্ষমতা এক হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) হলেও বুধবার সকাল ১০টা পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৪১০ এমএমসিএফডি। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গেছে প্রায় ৬৩ শতাংশ।
পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, এক্সিলারেট এনার্জির দুটি বয়লারের মধ্যে একটি মেরামতের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে। অন্যদিকে, সামিট এলএনজি টার্মিনালে একটি এলএনজিবাহী জাহাজ অবস্থান করলেও সাগরে তীব্র বাতাসের কারণে জাহাজটি নিরাপদে বার্থিং করতে পারছে না। ফলে শিপ-টু-শিপ এলএনজি স্থানান্তর ও আনলোডিং পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে গেছে। আবহাওয়া ও যান্ত্রিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত এই সংকট কাটার কোনো নির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।
শপিংমল-মার্কেট-দোকান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধের নির্দেশ: বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে শপিংমল, মার্কেট ও দোকানপাট রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ এবং সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত নির্দেশনা জারি করা হয়।
এতে বলা হয়েছে, এদিন থেকেই দেশের বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা যাবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের উপসচিব মো. মামুন ভূঁইয়া স্বাক্ষরিত স্মারকে বলা হয়, এর আগে ১১ জুন থেকে বিভিন্ন শপিংমল, মার্কেট ও দোকান রাত ৯টা পর্যন্ত খোলা রাখার সরকারি সিদ্ধান্ত বলবৎ ছিল। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১২ আগস্ট থেকে এসব প্রতিষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, সব ধরনের আলোকিত বিলবোর্ড সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ করতে হবে। পাশাপাশি সব ধরনের আলোকসজ্জা বন্ধ রাখতে হবে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলমান এবং অনুষ্ঠিতব্য মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেও একই সময়সীমা প্রযোজ্য হবে। এসব অনুষ্ঠানও রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে খাবারের দোকান, হাসপাতাল ও ওষুধের দোকানসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ নির্দেশনার আওতামুক্ত থাকবে।
শপিংমল, মার্কেট ও দোকান সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা রাখা, সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে আলোকিত বিলবোর্ড বন্ধ, আলোকসজ্জা বন্ধ এবং মেলা, বাণিজ্য মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রাত ৮টার মধ্যে বন্ধ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সিটি করপোরেশনের মেয়র বা প্রশাসক, বিভাগীয় কমিশনার এবং জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কী কারণ: বিদ্যুৎ খাতসংশ্লিষ্ট বলছেন, বর্তমান সংকটের মূলে রয়েছে জ্বালানি এবং টাকা ও ডলারের ঘাটতি। উৎপাদনকেন্দ্র আছে, কিন্তু সেগুলো চালানোর মতো পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা ও তেল নেই। আবার ব্যয়বহুল তেলচালিত কেন্দ্র বেশি সময় চালালে পিডিবির লোকসান ও সরকারের ভর্তুকি আরো বাড়বে। দীর্ঘদিনের পুরোনো বকেয়ার কারণে বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জ্বালানি কেনার সক্ষমতাও চাপে পড়েছে। এর মধ্যেই গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। তারপরও বিদ্যুৎকন্দ্রগুলোর বিপুল বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।
ঘাটতির কারণ : বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। বর্তমান চাহিদা সাধারণত ১৬ থেকে ১৭ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে ওঠানামা করছে। এর মধ্যেই চলছে লোডশেড। দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি এখনো গ্যাস। গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। কিন্তু পর্যাপ্ত গ্যাস না থাকায় এর সামান্য অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে। কিছুদিন আগেও গ্যাস থেকে সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কাছাকাছি বিদ্যুৎ পাওয়া যেত। এখন তা কমে প্রায় ৩ হাজার ৮০০ থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াটে নেমেছে।
গ্যাসভিত্তিক উৎপাদন কমে যাওয়ায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ধরে রাখার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো। দেশে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার ৯৪৫ মেগাওয়াট। কিন্তু উৎপাদন হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেগাওয়াট। এর মধ্যেও পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট ২ আগস্ট থেকে রক্ষণাবেক্ষণে যাওয়ায় উৎপাদন অর্ধেকে নেমেছিল। পরে ইউনিটটি চালু করে ধীরে ধীরে উৎপাদন বাড়ানো হয়েছে। তবে কেন্দ্রটির বিপুল বকেয়া রয়েছে। সময়মতো বিল পরিশোধ না হলে ভবিষ্যতে কয়লা সরবরাহেও ঝুঁকি তৈরির আশঙ্কা আছে। পটুয়াখালীর আরেকটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়লা খালাস ও পরিবহনে সমস্যা হচ্ছে। সমুদ্রে বড় জাহাজ থেকে ছোট জাহাজে কয়লা স্থানান্তরে বিলম্ব হওয়ায় উৎপাদন কমেছে।
ভারতের ঝাড়খণ্ডে আদানি পাওয়ারের কেন্দ্র থেকে কয়েক দিন ধরে সরবরাহ কমেছে। সাধারণত কেন্দ্রটি বাংলাদেশকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে পারে। কিন্তু ঝাড়খণ্ডে প্রতিকূল আবহাওয়া ও কয়লা সরবরাহের সমস্যায় তা ৮০০ থেকে ১ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে নেমে আসে। আদানি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কয়লা সরবরাহ স্বাভাবিক হলে উৎপাদন আবার বাড়ানো সম্ভব হবে। রামপালেও উৎপাদন কমেছে। বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রের তিনটি ইউনিটের মধ্যে দুটি কারিগরি সমস্যায় বন্ধ। ফলে গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে যে কয়লার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর কথা, সেখানেও প্রত্যাশিত বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
গ্যাস ও কয়লার উৎপাদন কমে গেলে দ্রুত ঘাটতি পূরণের উপায় হচ্ছে তেলচালিত বিদ্যুৎকন্দ্র। দেশে এ ধরনের কেন্দ্রেরও বড় উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে। কিন্তু গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় কয়েক গুণ বেশি। তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে ইউনিট প্রতি গড় ব্যয় প্রায় ২০ টাকার কাছাকাছি যেতে পারে, যেখানে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় অনেক কম।
এ কারণে সন্ধ্যায় সর্বোচ্চ চাহিদার সময় লোডশেডিং কমাতে তেলভিত্তিক কেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানো হলেও রাত গভীর হলে অনেক কেন্দ্রের উৎপাদন কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এতে মধ্যরাতের পর কোনো কোনো সময়ে লোডশেডিং উল্টো বেড়ে যাচ্ছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

