জুলাই স্মৃতি জাদুঘর
স্থাবর নিদর্শন নষ্ট করলে ১০ বছর কারাদণ্ড
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৩
# অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার ও নষ্ট করলে ৫ বছর কারাদণ্ড
# নিদর্শনে লেখা বা স্বাক্ষর করলে এক বছর কারাদণ্ড
চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন ধরে রাখার জন্য গড়ে তোলা হয় জুলাই গণ–অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর। গত ৫ আগস্ট বুধবার সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এ জাদুঘরের স্মৃতিফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর পরই এই স্মৃতি জাদুঘরের দুয়ার সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত এ জাদুঘরের কোনো স্থাবর নিদর্শন কোনো ব্যক্তি ক্ষতিসাধন করলে অনধিক ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। আর জাদুঘরের কোনো অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার ও নষ্ট করলে অনধিক পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ডে দণ্ডিত হবেন।
এমন বিধান রেখে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর আইন, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। আইনটি ১০ এপ্রিল ২০২৬ প্রণীত হয় এবং এটি ২০২৬ সালের ৯০ নম্বর আইন হিসেবে সরকারি নথিতে তালিকাভুক্ত রয়েছে।
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের ইতিহাস, নিদর্শন ও দলিল সংরক্ষণ, গবেষণা ও প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে গত ১০ এপ্রিল আইনটি প্রণয়ন করা হয়। এই আইনের আওতায় প্রতিষ্ঠিত জাদুঘরটি গত ৫ আগস্ট উদ্বোধন করা হয়। পরদিন থেকে এটি সাধারণ দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেওয়া হয়।
আইনের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের প্রধান কার্যালয় থাকবে ঢাকার গণভবনে। এ ছাড়া ২০০৯ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট সরকারের শাসনামলে যেসব গোপন কারাগারে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, সেগুলো জাদুঘর হিসেবে ঘোষণা, সংরক্ষণ ও রক্ষণাবেক্ষণের অধিকার থাকবে জাদুঘরের।
কোনো গোপন কারাগার কোনো সংস্থার অধীনে থাকলে সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে সেটি যে অবস্থায় রয়েছে, সেই অবস্থাতেই জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। এসব কারাগার জাদুঘরের শাখা জাদুঘর হিসেবে পরিচালিত হবে।
আইনের ৫ ধারায় জাদুঘরের কার্যাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ও পলায়ন সংশ্লিষ্ট ঐতিহাসিক নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্ন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ। পাশাপাশি পূর্ববঙ্গের ইতিহাস, ভাষা আন্দোলন, স্বাধীনতা সংগ্রাম ও ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের নিদর্শন এবং গণতন্ত্র ও মানবাধিকারবিরোধী কার্যক্রম ও ফ্যাসিবাদের উত্থানসংক্রান্ত স্মৃতিচিহ্ন, দলিল ও বস্তু সংগ্রহ, গবেষণা ও প্রদর্শনের কথাও বলা হয়েছে।
আইনের ১৫ ধারায় বলা হয়েছে, পর্ষদের সুপারিশ ও সরকারের পূর্বানুমোদন নিয়ে জাদুঘর জুলাই অভ্যুত্থানের নিদর্শন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর, অন্য কোনো জাদুঘর বা ব্যক্তির সঙ্গে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে বিনিময় করতে পারবে। একইভাবে নিদর্শন উপহার দেওয়া বা নেওয়া যাবে। তবে এসব ক্ষেত্রে চুক্তি করতে হবে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কোনো নিদর্শন কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রয়েছে—এমন যুক্তিসংগত কারণ থাকলে মহাপরিচালক বা তার ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওই স্থান পরিদর্শন করতে পারবেন। আইনের ১৬ ধারায় এ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
জাদুঘরে প্রবেশের বিষয়ে ১৭ ধারায় বলা হয়েছে, পর্ষদ নির্ধারিত প্রবেশমূল্য দিয়ে জনগণ জাদুঘরে প্রবেশ করতে পারবেন।
আইনের ২২ ধারায় স্থাবর নিদর্শনের ক্ষতির শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি জাদুঘরের স্থাবর নিদর্শন বা এর কোনো অংশ ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধন করলে তা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড বা ১০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
২৩ ধারায় অস্থাবর নিদর্শন চুরি, পাচার, ধ্বংস, বিনষ্ট, পরিবর্তন বা ক্ষতিসাধনের শাস্তির কথা বলা হয়েছে। এ অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড বা পাঁচ লাখ টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড হতে পারে।
এ ছাড়া জাদুঘরের সংগৃহীত বা নিবন্ধিত কোনো নিদর্শনের ওপর খোদাই, লেখা, লিপি উৎকীর্ণ বা স্বাক্ষর করলে সর্বোচ্চ এক বছরের কারাদণ্ড বা ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।
আইনের ২৫ ধারায় বলা হয়েছে, জাদুঘরের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারী এসব অপরাধে অভিযুক্ত হলে প্রচলিত দণ্ডের পাশাপাশি শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া যাবে। তবে আদালতে মামলা চলমান থাকলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা এই জাদুঘর এত দিন নানা জটিলতার কারণে চালু করা যায়নি। অবশেষে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তা উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এরপর ৮ আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নেয়। পরে এই সরকারের অধীনই জুলাইয়ের নানা স্মৃতিচিহ্ন নিয়ে গণভবনে তৈরি করা হয় জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর।
বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণ-অভ্যুত্থান। এর গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এই জাদুঘর।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

