ছবি: সংগৃহীত
রাজধানীর কর্মজীবী নারী ও নারী যাত্রীদের নিরাপদ এবং স্বাচ্ছন্দ্যময় যাতায়াত নিশ্চিত করতে আবারও পৃথক ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ সার্ভিস চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি)। গোলাপি রঙের এসব বাসে চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন নারীরা।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে বিআরটিসির ঢাকা ট্রাক ডিপো প্রাঙ্গণে নতুন এ বাস সার্ভিসের উদ্বোধন করা হয়।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, এই সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল নারীদের পরিচালনায় বিশেষ বাস চালু। উদ্দেশ্য ছিল, নারী বাসে ওঠার আগে ও পরে নারীবান্ধব পরিবেশ পাবে। বাসের জন্য অপেক্ষার সময় নারীদের জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি হয়, বাসের মধ্যে অস্বস্তির পরিবেশ হয়, বাস থেকে নামার পর নিরাপদ ঝুঁকিতে পড়ে নারীরা। এ কারণে নিরাপদ যাতায়াতের প্রয়োজনে নারীবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থা করার অঙ্গীকার ছিল। ঢাকার ১০টি রুটে একটি একতলা ও ৯টি দ্বিতল বাস চলবে। বগুড়ায় দুটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। চট্টগ্রামে একটি রুটে দুটি দ্বিতল বাস চলবে। বাসের সংখ্যা আরও বাড়বে, রুট সম্প্রাসারণ করা হবে। ২০০ ইভি (ইলেকট্রনিক বাহন) বাস আসবে। এর মধ্যে ১০০ বাস থাকবে নারীদের জন্য। অন্য বিভাগেও নারী বাস সার্ভিস চালু হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন রেলপথ মন্ত্রণালয় এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইয়াসমিন। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিআরটিসির চেয়ারম্যান (অতিরিক্ত সচিব) আব্দুল লতিফ মোল্লা।
বিআরটিসি সূত্রে জানা গেছে, কর্মজীবী নারী ও নারী যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াতের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে পিংক বাস সার্ভিস পরিচালনা করা হবে। বাসগুলোর চালক ও কন্ডাক্টর হিসেবে নারীদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
বিআরটিসির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আগামী তিন মাসের মধ্যে ৫০টি বাস চালুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সেবাটি দ্রুত চালুর লক্ষ্যে বিদ্যমান সম্পদ ব্যবহার করে সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার মধ্যেই সড়কপথে নারী যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বচ্ছন্দ যাত্রার লক্ষ্যে নারী চালক ও কন্ডাক্টর দ্বারা পরিচালিত পিংক কালারের এই বিশেষ বাস সার্ভিস সীমিত পরিসরে চালু করেছে বিআরটিসি। প্রাথমিক পর্যায়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বগুড়া শহরের ১৩টি পথে মোট ১৪টি বাস চলাচল করবে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায় ১০টি, বগুড়া ও চট্টগ্রাম শহরে দুটি করে বাস সার্ভিস পরিচালনা করবে বিআরটিসি। ঢাকা নগরের ১০৬টি, চট্টগ্রামে ১২টি ও বগুড়ার ১৬টি মিলিয়ে মোট ১৩৪টি জায়গা থেকে যাত্রীসেবা দেওয়া হবে। নির্ধারিত ভাড়ার তালিকা ডিপো, বাস ও কাউন্টারের দৃশ্যমান স্থানে সাঁটানোর পাশাপাশি এ সার্ভিসে ই-টিকিট চালু করা হয়েছে। তিনটি বাসে ক্লোজড-সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা এবং প্রতিটি বাসে ভেহিকেল ট্র্যাকিং সিস্টেম (ভিটিএস) সংযোজন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি বাসে এই সুবিধা সম্প্রসারণ করা হবে।
এর আগেও ‘মহিলা বাস সার্ভিস’ চালু হলেও তা সফল হয়নি। বিআরটিসির মহিলা বাস সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে প্রথম চালু হয় ১৯৯৮ সালে। নারী আন্দোলনের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০১ সালের ২৫ অক্টোবর এই বাসসেবা উদ্বোধন করা হয়। রুট ছিল ঢাকা ও এর আশপাশের এলাকা। মোট ১২টি বাস থাকলেও চার-পাঁচটির বেশি রাস্তায় চলাচল করতে দেখা যেত না। নারী যাত্রীদের অভিযোগ ছিল, দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থেকেও তারা বাসের দেখা পেতেন না। কিছু বাস নারীদের লিজ দেওয়া হয়। বাসের চালক থাকতেন পুরুষ। এক নারী উদ্যোক্তা ক্ষতির মুখে লিজ প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন এমন ঘটনাও ঘটেছিল। ২০০৯ সালে আবার এই সেবাকে পুনরুজ্জীবিত করার উদ্যোগ নেয় সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়। তবে তা তেমনভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
এবার বাস সার্ভিস চালুর পর সে রকম ঘটনার যেন পুনারাবৃত্তি না হয়, সেদিকে নজর রাখতে বলেছেন নারী যাত্রীরা। তারা বলেন, বিভিন্ন কারণে আগের বাস সার্ভিস সফল হয়নি। ব্যবস্থাপনা ভালো হওয়া দরকার। সেই সঙ্গে নারী বাস সার্ভিসের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিও ইতিবাচক হওয়া দরকার।
মহিলা বাস সার্ভিসের পথ ও থামার স্থান: ঢাকার নতুন বাজার (কোকাকোলা)— মতিঝিল পথের বাস থামবে: কোকাকোলা, নতুন বাজার, উত্তর বাড্ডা, মধ্য বাড্ডা, মেরুল বাড্ডা, রামপুরা, আবুল হোটেল, মালিবাগ, কাকরাইল, পল্টন, গুলিস্তান, মতিঝিল।
তালতলা— মতিঝিল পথে বাস থামবে: তালতলা, খিলগাঁও রেলগেট, বাসাবো, বৌদ্ধ মন্দির, মুগদা, কমলাপুর রেলস্টেশন, আরামবাগ, শাপলা চত্বর, সচিবালয়।
ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার— জিপিও পথের বাস থামবে: ডেমরা স্টাফ কোয়ার্টার, বাঁশের পুল, কাজলা, যাত্রাবাড়ী, জনপথ মোড় (সায়েদাবাদ), ওয়ারী (বলধা গার্ডেন), গুলিস্তান, পল্টন, সচিবালয়, মৎস্য ভবন।
মিরপুর ১০— মতিঝিল পথের বাস থামবে: মিরপুর-১০, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, আসাদগেট, কলাবাগান, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল।
মিরপুর— মতিঝিল পথের বাস থামবে: মিরপুর-১২, মিরপুর-১০, মিরপুর-১, টেকনিক্যাল, শ্যামলী, ফার্মগেট, শাহাবাগ, গুলিস্তান, মতিঝিল।
মিরপুর ১২— মতিঝিল পথে বাস থামবে: মিরপুর-১২, মিরপুর-১১, মিরপুর-১০, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, ফার্মগেট, শাহবাগ, প্রেসক্লাব, গুলিস্তান, মতিঝিল।
নারায়ণগঞ্জ— ঢাকা পথে থামবে: চাষাঢ়া, শিবুমার্কেট, স্টেডিয়াম, কালকুড়ি, ভূঁইগড়, সাইনবোর্ড, রায়েরবাগ, শনির আখড়া, টিকাটুলি, গুলিস্তান, মতিঝিল।মোহাম্মদপুর—মতিঝিল পথে থামবে: মোহাম্মদপুর, শংকর, ঝিগাতলা, ধানমন্ডি-১৫, সিটি কলেজ, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড, শাহবাগ, পল্টন, মতিঝিল, কমলাপুর।
আবদুল্লাহপুর— মতিঝিল পথে থামবে: আবদুল্লাহপুর, আজমপুর, এয়ারপোর্ট, খিলক্ষেত, বিশ্বরোড, কুর্মিটোলা, বনানী, মহাখালী, ফার্মগেট, শাহবাগ, মৎস্যভবন, প্রেসক্লাব, গুলিস্থান, মতিঝিল।
গাজীপুর— বিমানবন্দর পথে বাস থামবে: গাজীপুর শিববাড়ী, গাজীপুর চৌরাস্তা, মালেকের বাড়ি, বোর্ডবাজার, গাজীপুরা, কলেজগেট, স্টেশন রোড, আবদুল্লাহপুর, আজমপুর, বিমানবন্দর।
বগুড়ার শেরপুর— মাটিডালি পথের বাস থামবে: আরডিএ স্কুল, নয়মাইল মোড়, শাজানপুর উপশহর গেট, বি-ব্লক-মাঝিরা, বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি।
বগুড়ার বনানী— মোকামতলা পথে থামবে: বনানী, সাতমাথা, মহিলা কলেজ, মাটিডালি মোড়, টিএমএসএস হাসপাতাল, মহাস্থান বাজার, মোকামতলা স্ট্যান্ড।
চট্টগ্রামের কালুরঘাট— পতেঙ্গা পথে বাস থামবে: কালুরঘাট, কাপ্তাই রাস্তার মাথা, বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, ২নং গেট, জিইসি মোড়, লালখান বাজার, টাইগারপাস, দেওয়ানহাট, চৌমুহনী, আগ্রাবাদ, বারেকবিল্ডিং, ফ্রি পোর্ট, কাঠগড়, পতেঙ্গা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

