পায়রা বন্দরে কার আমদানি; বাণিজ্য সম্প্রসারণে নতুন সম্ভাবনা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:১৯
ছবি: সংগৃহীত
দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর হিসেবে পায়রা বন্দর শুধু পণ্য পরিবহনের সক্ষমতাই বাড়াচ্ছে না, বরং দেশের আমদানি-বাণিজ্যেও তৈরি করছে নতুন সম্ভাবনা।
আমদানিকৃত গাড়ি বা কার হ্যান্ডলিংয়ের ক্ষেত্রে আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপদ সংরক্ষণ ব্যবস্থা, দ্রুত খালাস এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা পায়রা বন্দরকে একটি সম্ভাবনাময় বিকল্প বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার রাবনাবাদ চ্যানেলের মোহনায় অবস্থিত পায়রা বন্দরের ভৌগোলিক অবস্থান দক্ষিণাঞ্চল ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্যিক যোগাযোগ সম্প্রসারণের অন্যতম হাব। আধুনিক জেটি, প্রশস্ত চ্যানেল, উন্নত কার্গো হ্যান্ডলিং সুবিধা এবং প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার কারণে আমদানিকারকদের জন্য পায়রা বন্দরে পণ্য আমদানি,খালাস ও ব্যবস্থাপনার সুযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
আমদানিকৃত গাড়ি ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা: পায়রা বন্দরের অন্যতম উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো আমদানিকৃত গাড়ি নিরাপদে বার্থিং, সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার জন্য ১৪৮ মি. কার ডেডিকেটেড রো রো জেটি, ৭৭ হাজার ১৪৬ বর্গ মি কার পার্কিং ইয়ার্ড, প্রায় দুই হাজার ৭০০ বর্গ মি. কার-শেড, যেখানে একসঙ্গে তিন হাজার ৫০০ গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। গাড়ি আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজ থেকে দ্রুত খালাসের পাশাপাশি নিরাপদ সংরক্ষণ, অগ্নি নির্বাপনী ব্যবস্থা, সুদূড় নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা এবং পরবর্তী পরিবহনের জন্য পর্যাপ্ত পার্কিং শেড থাকা অত্যন্ত জরুরি। পায়রা বন্দরের বিদ্যমান সুবিধা এ ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছে।
কার পার্কিং শেড ও ইয়ার্ড
দ্রুত খালাস, কম সময় ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যয়: পায়রা বন্দরের আধুনিক টার্মিনাল ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্য দ্রুত খালাস করা সম্ভব। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ৫৬৪ বিদেশগামী জাহাজসহ সর্বমোট সাত হাজার ৫৮৩টি বাণিজ্যিক জাহাজ সফলভাবে পরিচালনা করেছে,যার মাধ্যমে কাস্টম্সসহ সরকারের প্রায় এক হাজার ৯০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। একই সঙ্গে একক জাহাজ থেকে সরাসরি ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন পর্যন্ত কার্গো খালাসের সক্ষমতা অর্জন করেছে পায়রা বন্দর। পায়রা বন্দরের অন্যান্য বন্দরের তুলনায় (২০-৮০) শতাংশ ট্যারিফ সুবিধাও ব্যবসায়ীদের জন্য বাড়তি ইতিবাচক দিক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
২৪/৭ সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনা: পায়রা বন্দরের ২৪/৭ ওয়ান-স্টপ সার্ভিস এবং প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট গ্রাহক সেবা আমদানিকারকদের জন্য ব্যাতিক্রম সুবিধা তৈরি করবে। আধুনিক বিলিং সফটওয়্যার ও অটোমেশন ব্যবহারের মাধ্যমে তথ্যপ্রবাহ, পণ্য ব্যবস্থাপনা ও দাপ্তরিক কার্যক্রম আরও স্বচ্ছ ও গতিশীল হচ্ছে। গাড়ির মতো উচ্চমূল্যের আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। পায়রা বন্দর ইতোমধ্যে ISPS সহ আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পরিচালনের সক্ষমতা আমদানিকারকদের আস্থা বৃদ্ধি করবে।
গাড়ি আমদানিতে দক্ষিণাঞ্চলের নতুন বাণিজ্যিক কেন্দ্র হওয়ার সম্ভাবনা: বাংলাদেশে ব্যক্তিগত, বাণিজ্যিক ও বিভিন্ন ধরনের মোটরযানের বাজার ক্রমবর্ধমান হারে বাড়ছে। যেগুলো বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর ও মোংলা বন্দরের মাধ্যমে আমদানি হচ্ছে। চট্রগ্রাম বন্দর ব্যস্ততম বন্দর হওয়ায় ইতোমধ্যে আমদানিকারকদের নিরুৎসাহিত করছে। তাই এই বিপুল পরিমাণ বাজারের একটি অংশ পায়রা বন্দরের মাধ্যমে পরিচালিত হলে দক্ষিণাঞ্চলে গাড়ি আমদানি কেন্দ্রিক নতুন ব্যবসায়িক হাব তৈরি হবে। বন্দরকে ঘিরে গড়ে উঠবে গাড়ির স্টোরেজ, ডেলিভারি সেন্টার, পরিবহন সেবা, লজিস্টিকস, কাস্টমস সংশ্লিষ্ট সেবা এবং অন্যান্য সহায়ক শিল্প। ফলে কার আমদানিকে কেন্দ্র করে শুধু বন্দরের রাজস্ব নয়, স্থানীয় পর্যায়েও নতুন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অপার সম্ভাবনার পথে পায়রা বন্দর: পায়রা বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। বন্দরের প্রথম টার্মিনালের আওতায় ৬৫০ মিটার মূল জেটি, তিন লাখ ২৫ হাজার বর্গমিটার ব্যাকআপ ইয়ার্ড, ১০ হাজার বর্গ মিটার CFS, দুই হাজার ৫৬০ বর্গমিটার কার পার্কিং শেড, ৭৭ হাজার ১৪৭ বর্গ মিটার ইয়ার্ড, এক লাখ বর্গ ফুট ওয়্যারহাউজ, সার্ভিস জেটি ১৪৮ মিটার, ছয় দশমিক ৩৫ কি.মি. ৬-লেন বিশিষ্ট সংযোগ সড়ক, এক হাজার ১৮০ মিটার চার লেন বিশিষ্ট সংযোগ সেতু, প্রশাসনিক অবকাঠামো এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। বন্দর কর্তৃপক্ষের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় ১৯টি কম্পোনেন্টে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। তম্মধ্যে ১২টি কম্পোনেন্ট পায়রা বন্দরের মাধ্যমে নৌপম কর্তৃক এবং সাতটি কম্পোনেন্ট অন্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হবে। এর মধ্যে ভূমি অধিগ্রহণ, ৪-লেনের পাঁচ দশমিক ২২৩ কিলোমিটার বন্দর সংযোগ সড়ক, অভ্যন্তরীণ নৌরুটে ড্রেজিং, প্রথম টার্মিনাল আন্ধারমানিক নদীর উপর এক দশমিক ১৮ কি.মি. ব্রিজ, ছয় দশমিক ৩৫ কি.মি. ৬-লেন বিশিষ্ট জেটি সংযোগ সড়কসহ বেশ কিছু কাজ সম্পন্ন হয়েছে। অন্যান্য বন্দরের তুলনায় ২০-৮০ শতাংশ কম ট্যারিফ রেট সুবিধা, দ্রুত কার্গো হ্যান্ডলিং, ২৪/৭ সেবা এবং ভবিষ্যৎ অবকাঠামোগত সম্প্রসারণ সব মিলিয়ে কার আমদানির ক্ষেত্রে পায়রা বন্দরের সামনে রয়েছে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা।
প্রথম টার্মিনাল: পরিশেষে, চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পায়রা বন্দর সম্পূর্ণ প্রযুক্তি-নির্ভর ও স্মার্ট পোর্ট অপারেশন নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করছে। পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো এবং আধুনিক অটোমেশন এই বন্দরকে একটি আন্তর্জাতিক মানের 'গ্রিন পোর্ট' হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

