ওয়াকআউট বিরোধীদলের
সংসদে মানবাধিকার কমিশন ও গুম প্রতিকার বিল পাস
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:১২
ছবি: সংগৃহীত
বহুল আলোচিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বিল ও গুম প্রতিকার বিল রোববার (৬ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। তবে বিল দুটি পাস হওয়ার আগে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে বিরোধীদল।
বিল দুটি উত্থাপন থেকে পাস হওয়া পর্যন্ত সবগুলো ধাপেই বাধা দিয়েছিলেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। পাশাপাশি সংসদের বাইরে বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনসহ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এ বিলের খসড়া নিয়ে নানা উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা প্রকাশ করে আসছে।
২৭ সেপ্টেম্বর বিল উত্থাপনের দিনেও বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। তারা অধিবেশন কক্ষ থেকে বের হয়ে সংসদের টানেলে মুখে কালো কাপড় বেঁধে প্রতিবাদ জানান। অন্যদিকে স্বতন্ত্র সদস্যরা আজ বিল পাসের প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে বিভিন্ন ধারার কঠোর সমালোচনা করেন।
আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ রোববার জাতীয় সংসদে বিল দুটি উত্থাপন করেন।
শুরুতে মানবাধিকার বিল উত্থাপনে আপত্তি জানিয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এমন দুর্বল আইন পাসের অংশীদার আমরা হব না। তাই এই আইনের আলোচনায় অংশগ্রহণ করছি না, ওয়াকআউট করছি।
এ সময় বৈঠকের সভাপতির আসনে থাকা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ওয়াকআউটের জন্য পাল্টা ধন্যবাদ জানান বিরোধী দলীয় নেতাকেও।
পরে বিল দুটি কণ্ঠভোটে পাস হয়। সংসদের স্থায়ী কমিটিতেও এ বিলের আলোচনা বর্জন করে আগেই বিরোধীরা জানিয়েছিলেন, বিল দুটি পাসের কোনো প্রক্রিয়ায় তারা থাকবে না।
এর আগে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বিল দুটো অধ্যাদেশ আকারে জারি করা হয়েছিল। বিএনপি নেতৃত্বাধীন নবনির্বাচিত সরকার প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের শতাধিক অধ্যাদেশ পাস করলেও এই অধ্যাদেশ দুটি পাস না করায় তা (ল্যাপস) হয়ে যায়। তখন সরকারের তরফে বলা হয়, এই আইন দুটি অধিকতর যাচাই-বাছাই করে সংসদের বিবেচনার জন্য আনা হবে।
বিল পাসের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই বিল পাসের মাধ্যমে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকার পূরণ হয়েছে।
অর্ন্তবর্তী সরকারের জারি করা অধ্যাদেশের প্রসঙ্গে বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, সরকারি দলের পক্ষ থেকে যখন বিলগুলো বাতিল করা হয়, তখন বলা হয়েছিল যে অত্যন্ত শক্তিশালী এবং আরও ভালো আকারে তারা নিয়ে আসবে। মানবাধিকার সংক্রান্ত যে বিল এসেছে, সেখানে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। মানবাধিকার কমিশনকে একটি ইউনিফর্ম অথরিটি দেওয়া হয়নি।
বিরোধী দলীয় নেতা বলেন, মানবাধিকার সংক্রান্ত বিলে আইনের স্পষ্ট দ্বৈত প্রয়োগ দেখা যাচ্ছে। সাধারণ মানুষ যদি কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন করে, তাহলে মানবাধিকার কমিশন সরাসরি তার তদন্ত করতে পারবে।
আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর জন্য বিশেষ বিধানের কথা উল্লেখ করে ডা. শফিকুর বলেন, আইনের দ্বৈত প্রয়োগ হতে পারে না। রাষ্ট্রীয় বাহিনী রাষ্ট্রের কর্মচারী, কিন্তু তারা এ দেশের নাগরিক। একই অপরাধে একজনের জন্য সরাসরি তদন্ত করা যাবে, আরেক জায়গায় আটকা পড়ে যাবে— এটি হতে পারে না।
মানবাধিকার কমিশন বিল: ২০০৯ সালের জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন রহিত করে নতুন বিলে বলা হয়েছে, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯-এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত জাতীয় মানবাধিকার কমিশন এমনভাবে বহাল থাকবে যেন এটি এই আইনের অধীনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কমিশন স্বাধীন এবং সম্পূর্ণ নিরপেক্ষভাবে মানবাধিকার সুরক্ষা ও এর উন্নয়ন সাধন করবে।
একজন চেয়ারপারসন ও চারজন কমিশনারের সমন্বয়ে কমিশন গঠিত হবে। এর মধ্যে ন্যূনতম একজন নারী এবং একজন ক্ষুদ্র নৃ–গোষ্ঠীর বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সদস্য হবেন।
কমিশনের চেয়ারপারসন ও কমিশনারদের নিয়োগের লক্ষ্যে সুপারিশ দেওয়ার জন্য একটি বাছাই কমিটি থাকবে। কমিটিতে থাকবেন স্পিকার (সভাপতি), আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, সরকারি দল ও বিরোধী দল মনোনীত দুজন সংসদ সদস্য, মন্ত্রিপরিষদ সচিব, ইউজিসি মনোনীত একজন অধ্যাপক, রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন নাগরিক প্রতিনিধি, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি বা তার মনোনীত সাংবাদিক প্রতিনিধি ও নৃগোষ্ঠী বা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকে রাজনৈতিক দলের প্রভাবমুক্ত একজন প্রতিনিধি।
বিলে শৃঙ্খলা বাহিনীর ক্ষেত্রে অনুসরণীয় পদ্ধতি শিরোনামে আলাদা একটি ধারা আছে। এ ধরনের ধারা ২০০৯ সালের আইনেও আছে। বিলে বলা হয়েছে, শৃঙ্খলা বাহিনী বা বাহিনীর সদস্যের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের ক্ষেত্রে কমিশন নিজ উদ্যোগে বা কোনো আবেদনের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রতিবেদন চাইতে পারবে। এ প্রতিবেদনে সন্তুষ্ট হলে কমিশন আর কোনো উদ্যোগ নেবে না। আর সন্তুষ্ট না হলে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে করণীয় সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুপারিশ পেশ করবে। এ রকম সুপারিশ পাওয়ার ৪৫ দিনের মধ্যে সংশ্লিষ্ট সংস্থা বা প্রতিষ্ঠান তার গৃহীত কার্যক্রম সম্পর্কে লিখিতভাবে কমিশনকে অবহিত করবে।
বিলে বলা হয়েছে, প্রয়োজনীয়সংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী সমন্বয়ে কমিশন এক বা একাধিক তদন্ত দল গঠন করতে পারবে।
গুম প্রতিরোধ বিল পাস: মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার বিল পাস হয়েছে। এতে গুম করার অপরাধের জন্য যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধানও রাখা হয়েছে। বিলে বলা হয়েছে, গুমের জন্য দায়ী ব্যক্তি অন্যূন তিন বছর বা সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং অতিরিক্ত ৫০ লাখ টাকা অর্থদেণ্ড দণ্ডিত হবেন।
বিলে বলা হয়, মানবাধিকার, মানবিক মর্যাদা, ব্যক্তি-স্বাধীনতা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গুম একটি স্বতন্ত্র, আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস-অযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এ বিল পাস হলে গুম প্রতিরোধ, দায়ী ব্যক্তিদের বিচার, গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অধিকার, ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করার একটি সমন্বিত আইনগত কাঠামো প্রতিষ্ঠা করবে।
গুমের সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী কিংবা কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী নিজ পরিচয়ে বা সরকারের সমর্থনে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার, আটক বা অপহরণ করে এবং স্বাধীনতা হরণ করার বিষয়টি অস্বীকার করে কিংবা তার অবস্থান গোপন রাখে, তবে তা গুম বলে গণ্য হবে।
গুমের ফলে মৃত্যু ঘটলে, মরদেহ পাওয়া গেলে অথবা পাঁচ বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পরেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জীবিত বা মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা সম্ভব না হলে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং সর্বোচ্চ এক কোটি টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান বিলে যুক্ত করা হয়েছে।
বিলে গুম হওয়া ব্যক্তিকে উদ্ধারের জন্য আদালতের মাধ্যমে তল্লাশি পরোয়ানা জারি, অভিযুক্ত ব্যক্তির অনুপস্থিতিতে বিচার, ডিজিটাল সাক্ষ্যের গ্রহণযোগ্যতা এবং সাক্ষী, অভিযোগকারী, তথ্য প্রকাশকারী ও ভুক্তভোগীর গোপনীয়তা ও নিরাপত্তার বিধান অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ভুক্তভোগীদের তদন্তের অগ্রগতি, ঘটনার প্রকৃত তথ্য এবং গুম হওয়া ব্যক্তির অবস্থান বা পরিণতি জানার অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। তাদের জন্য সরকারি আইনগত সহায়তা, চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণ তহবিল গঠন এবং দণ্ডিত ব্যক্তির সম্পত্তি থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। তা সম্ভব না হলে রাষ্ট্রের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
খসড়া অনুযায়ী গুম হওয়া ব্যক্তির স্ত্রী ও নির্ভরশীল পরিবারের সদস্যদের ভরণপোষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সম্পত্তি ব্যবহারের অনুমতি, পাঁচ বছর পর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের জন্য গুম সনদ দেওয়া, কেন্দ্রীয় তথ্যভাণ্ডার সংরক্ষণ এবং গুমসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
গুমের অভিযোগ তদন্ত সাপেক্ষে এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের বরাবরে পাঠানোর কথা বলা হয়েছে।
এতে সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্ন করা এবং সর্বোচ্চ ১২০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ সম্পন্ন করার বিধান রাখা হয়েছে। গুমের মিথ্যা অভিযোগের শাস্তি পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকার গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ করেছিল। সেখানে গুমের অভিযোগ তদন্তের ভার দেওয়া হয়েছিল জাতীয় মানবাধিকার কমিশনকে।
সংসদে পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা তার কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলে সংশ্লিষ্ট বাহিনী ওই অভিযোগের তদন্ত করতে পারবে না। এক্ষেত্রে কোনো পক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বা স্বপ্রণোদিত হয়ে সরকার ওই অভিযোগের তদন্তভার অভিযুক্ত শৃঙ্খলা বাহিনী ব্যতিরেখে অন্য কোনো শৃঙ্খলা বাহিনী বা আন্তঃবাহিনী তদন্ত দলের কাছে অর্পণ করবে।
বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ার সম্পন্ন দায়রা জজ আদালত গুমের অপরাধের বিচার করবে। অভিযোগ গঠনের ৯০ কার্যদিবসের মধ্যে বিচার সম্পন্ন করতে হবে। এ সময়ে সম্ভব না হলে উপযুক্ত কারণ দেখিয়ে পরবর্তী ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সম্পন্ন করতে হবে।
বিলে বলা হয়েছে, এখতিয়ার সম্পন্ন ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে যদি প্রতীয়মান হয় দাখিলকৃত অভিযোগটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের অধীনে বিচার্য তাহলে তদন্ত প্রতিবেদন এবং সংগৃহীত সাক্ষ্যপ্রমাণ চিফ প্রসিকিউটরের কাছে পাঠাতে হবে। এক্ষেত্রে চিফ প্রসিকিউটর যদি মনে করেন অতিরিক্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দলীলপত্র সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন সেক্ষেত্রে অধিকতর তদন্ত পরিচালনা করা যাবে।
বিলে মিথ্যা মামলার বিরুদ্ধে ব্যবস্থার বিধান রাখা হয়েছে। বলা হয়েছে, যদি আদালতের কাছে প্রতীয়মান হয় যে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ মিথ্যা ও হয়রানিমূলক তাহলে আদালত অভিযোগকারীকে কারণ দর্শানোর সুযোগ দিয়ে অভিযুক্ত ব্যক্তি বরাবর যথাযথ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আদেশ দিতে পারবেন। পাশাপাশি অভিযোগকারীকে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডিত করতে পারবেন।
বিল পাসের আলোচনায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ ত্রুটিপূর্ণ ছিল। অংশীজনদের সঙ্গে কথা কথা বলে আমূল পরিবর্তনের মাধ্যমে আগের অধ্যাদেশকে শক্তিমালী করে এই বিল নিয়ে আসা হয়েছে।
গুম প্রতিরোধ আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটিও শক্তিশালী করে আনা হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

