জাতিসংঘে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের বার্তা দেবেন তারেক রহমান
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৩৮
ছবি: সংগৃহীত
এবারে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ একেবারেই সাদামাটা। এজন্যই এবারের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশ গ্রহণ বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
অতীতে বিশাল বহর নিয়ে যাওয়া হতো। তাই এটাকে অনেকেই রাষ্ট্রীয় খরচে পিকনিক বলে সমালোচনা করতে দ্বিধা করতেন না।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বিগত অধিবেশনে বাংলাদেশের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন ড. মুহাম্মদ ইউনূস। বিশাল বহর নিয়ে তিনি নিউইয়র্কে যান। নিজের প্রতিষ্ঠানের জন্য কিছু বৈঠক করেন সরকারি টাকায়। কয়েকজনের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন।
ওই সফরে বাংলাদেশের অর্জন ছিল ইউনূসের শূন্য-তত্ত্বের মতোই শূন্য। সেদিক থেকে এবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের জাতিসংঘ সফর সম্পূর্ণ ভিন্ন। তিনি ছোট্ট একটি দল নিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাচ্ছেন। যাঁদের সবারই সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব আছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত কিন্তু তাৎপর্যপূর্ণ। বাংলাদেশের ১৭ বছরের ইতিহাসে এটাই কোনো সরকারপ্রধানের সংক্ষিপ্ততম নিউইয়র্ক সফর। এই সফরে সবচেয়ে কমসংখ্যক সঙ্গী থাকছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে। কিন্তু এটাই হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে কার্যকর কূটনীতিক উদ্যোগ।
এই অধিবেশনে ২৪ সেপ্টেম্বর বক্তৃতা দেওয়ার পরদিন, অর্থাৎ ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে তিনি নিউইয়র্ক থেকে ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেবেন।
শুরুতে প্রধানমন্ত্রীর ২১ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্র সফর আয়োজনের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। নিউইয়র্ক থেকে সান ফ্রান্সিসকো যাওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। কিন্তু দেশের বাস্তবতা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী নিজেই এই সফর কাটছাঁট করেছেন। এটাই তারেক রহমানের নেতৃত্বে বদলে যাওয়া বাংলাদেশের বৈশিষ্ট্য। যে বদলে যাওয়ার দর্শন হলো, সবার আগে বাংলাদেশ।
শুধু জাতিসংঘ সফরে নয়, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই অপচয় ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন তারেক রহমান। তিনি প্রটোকলের বাড়াবাড়ি কমিয়েছেন, মাত্র দেড় শ টাকায় দুপুরের খাবার খেয়ে তিনি দেশবাসীর কাছে সম্মান পেয়েছেন, অনুকরণীয় হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজে যখন কৃচ্ছ্র সাধন করেন, দুর্নীতিমুক্ত থাকেন তখন সরকারের অন্য কারও পক্ষে দুর্নীতি এবং অপচয় করা সম্ভব নয়। এতে গোটা দেশের দুর্নীতি এবং অপচয় কমে যায়। বাংলাদেশে গত সাত মাসে এটাই প্রমাণিত হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তারেক রহমান দায়িত্ব নিয়েছেন কঠিন এক সময়ে। ইউনূস সরকার দেড় বছরে বাংলাদেশকে একটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছিল। বেকারত্ব, দারিদ্র্যের হার বৃদ্ধি, বেসরকারি খাতে অচলাবস্থা-সবকিছু মিলিয়ে দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ছিল শোচনীয়। এর মধ্যে বিএনপি সরকার গঠনের পরপরই শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। সারা বিশ্বে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দেয়। প্রধানমন্ত্রীর নিরলস প্রচেষ্টা ও বুদ্ধিমত্তার কারণে বাংলাদেশ এই সংকট মোকাবিলায় সক্ষম হয়। উন্নত দেশগুলো পর্যন্ত জ্বালানি তেলের সংকট অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করেছে। এর ফলে সেসব দেশে মুদ্রাস্ফীতি বেড়েছে ব্যাপকভাবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানির মতো দেশগুলো এখন পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। সেখানে সাত মাস বয়সি বিএনপি সরকার কেবল জ্বালানি তেলের সমস্যার সমাধান করেনি, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। কয়েক মাসের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পর দেশে মূল্যচাপ কমার প্রবণতা অব্যাহত রয়েছে। টানা তৃতীয় মাসে কমে আগস্টে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে।
এটি গত ১০ মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন মূল্যস্ফীতির হার। একই সময়ে খাদ্য মূল্যস্ফীতিও ৭ শতাংশের ঘরে নেমে আসায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে মূল্যচাপ কমার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ডলারের বিপরীতে সেই দেশের মুদ্রার মান কমেছে। কিন্তু তারেক রহমানের বিচক্ষণতা, কৃচ্ছ্র সাধন এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কারণে টাকার মান কমেনি বরং শক্তিশালী অবস্থান ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বিন্দু থেকে সিন্ধু হয়-প্রধানমন্ত্রী হাতেকলমে তা প্রমাণ করেছেন। তিনি প্রথমে প্রধানমন্ত্রী পদে বা প্রধান উপদেষ্টারা যে অপচয়গুলো করতেন তা নিজের জন্য বন্ধ করেছেন, এরপর সরকার ও মন্ত্রীদের অপচয় বন্ধ করেছেন। সরকারের নীতিনির্ধারকরা যখন অপচয় করেন না, দুর্নীতিমুক্ত থাকেন তখন গোটা দেশ সেই পথেই হাঁটে। ফলে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি নিয়েও তারেক রহমান দেশকে ঘুরে দাঁড়াতে অনেকটাই সক্ষম হয়েছেন।
বিগত ১৭ বছর ধরে বিদ্যুৎ খাতে সীমাহীন লুটপাট হয়েছে। যার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হয়ছে। তীব্র লোডশেডিং জনজীবন বিপর্যস্ত করে দিয়েছে। বিগত দুটি সরকারের ভুল জ্বালানিনীতির কারণে দেশজুড়ে দেখা দেয় তীব্র গ্যাসসংকট। গ্যাসের অভাবে বহু কলকারখানা বন্ধ হয়ে যায়। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করে গ্যাসসংকটের স্থায়ী সমাধানের উপায় বের করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী দেশে ১৫০টি নতুন গ্যাসকূপ খননের নির্দেশে দিয়েছেন। প্রথম ধাপ শেষ হলে আরও ১৫০টি কূপ খননের কাজ শুরু হবে।
বর্তমানে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) রয়েছে। ২০২৮ সালের আগে সম্ভব হলে তৃতীয় এফএসআরইউ চালু এবং দীর্ঘ মেয়াদে মোট পাঁচটি এফএসআরইউ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। ১৮ কার্গো এলএনজি আমদানির নীতিগত অনুমোদন এবং চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারি সম্প্রসারণে ১ বিলিয়ন ডলারের আন্তর্জাতিক অর্থায়নের চুক্তি করেছে সরকার। বিদ্যুৎ খাতে কারিগরি ত্রুটি সারিয়ে জাতীয় গ্রিডে ১ হাজার ৪৬ দশমিক ৭৩ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়ানো, ভোলায় ৫০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎকেন্দ্র ও একটি সার কারখানা স্থাপনের ঘোষণা, জাতীয় গ্রিডে নতুন ২০০ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের সব ডিজেলচালিত সেচপাম্প সৌরশক্তিতে রূপান্তরের পরিকল্পনা, বাসাবাড়ির ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুতে নতুন প্রণোদনা, সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক ও কর ছাড় এবং আমিনবাজারে বর্জ্য থেকে ৪২ দশমিক ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ দেশের বিদ্যুৎ সমস্যার টেকসই সমাধান নিশ্চিত করবে।
ইউনূস বেসরকারি খাত ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করেছিলেন। যার ফলে দেড় বছরে বাংলাদেশে বেসরকারি খাত মুখথুবডে পড়েছিল। বেসরকারি উদ্যোক্তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা, শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ এবং ভাঙচুরের ঘটনায় শিল্পোদ্যোক্তারা ক্ষুব্ধ এবং হতাশ হয়ে ব্যবসাবাণিজ্য বন্ধ করে রেখেছিলেন। হাজার হাজার কলকারখানা বন্ধ, লাখ লাখ শ্রমিক বেকার হয়ে গেছেন ইউনূস সরকারের আমলে। তারেক রহমানের ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বন্ধ কলকারখানা চালু করার বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী নিজে বিভিন্ন শিল্পোদ্যোক্তার সঙ্গে বৈঠক করেন। বন্ধ কারখানা চালু করার জন্য একাধিক অনুশাসন প্রদান করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেসরকারি খাত সচল করা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। এর ফলে শিল্পোদ্যোক্তা এবং ব্যবসায়ীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে।
দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে প্রথম দিন থেকেই কাজ করছে বিএনপি সরকার। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো উদ্ভাবনী উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে অল্প সময়ের মধ্যেই তারেক রহমান প্রান্তিক মানুষের আপনজন হয়ে উঠেছেন।
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও সরকারি কর্মচারীদের জন্য নতুন পে-স্কেল চালু সরকারের সাহসী উদ্যোগ।
বাংলাদেশকে ধ্বংসস্তূপ থেকে টেনে তুলতে সর্বাত্মক চেষ্টা করছে তারেক রহমানের সরকার । বাংলাদেশের ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প, বদলে যাওয়া বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে তুলে ধরতেই জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দেবেন প্রধানমন্ত্রী।
জাতিসংঘের উচ্চপর্যায়ের কয়েকটি বৈঠকের মধ্যে রয়েছে উন্নয়ন, মহামারি প্রতিরোধ, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ। পাশাপাশি বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সমস্যাসহ একাধিক আলোচনার আয়োজন করছে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে।
নিউইয়র্ক থেকে কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের ফাঁকে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন দেশের শীর্ষ নেতাদের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সম্ভাব্য যেসব দেশের নেতাদের বৈঠক হতে পারে। সে তালিকায় রয়েছেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, কুয়েতের যুবরাজ শেখ সাবাহ আল-খালিদ আল-সাবাহ। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি। থাইল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী অনুতিন চার্নভিরাকুল। ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে। ক্রোয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আন্দ্রেজ প্লেঙ্কোভিচ ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সল বিন ফারহান আল সৌদ।
এ ছাড়া জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ভলকার তুর্ক, জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনার বারহাম সালিহ, ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট অ্যান্তোনিও কস্তা, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা এবং বোয়িং গ্লোবালের প্রেসিডেন্ট ব্রেন্ডান নেলসনের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক হবে।
সফরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দেওয়া নৈশভোজে প্রধানমন্ত্রী যোগ দেবেন বলে জানা গেছে।
বিশ্বসভায় প্রধানমন্ত্রী নতুন বাংলাদেশকে উপস্থাপন করবেন। যে বাংলাদেশ সব বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে যাচ্ছে একজন কর্মঠ, সাধারণের মধ্যে অসাধারণ নেতার দিকনির্দেশনায়। যে নেতা জনগণের আপন মানুষ। প্রধানমন্ত্রীর এই সফর বাংলাদেশকে বিশ্বদরবারে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

