বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই
পরমাণু শক্তিতে বাংলাদেশের পাশে যুক্তরাষ্ট্র
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৩:৪১
ছবি: সংগৃহীত
বেসামরিক পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের লক্ষ্যে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র কৌশলগত বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি সই করেছে। বাংলাদেশের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসাদ এবং যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে দেশটির অর্থনীতিবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জ্যাকব হেলবার্গ চুক্তিতে সই করেন।
২৫ সেপ্টেম্বর যুক্তরাষ্ট্রে আনুষ্ঠানিকভাবে এই চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির মিডিয়া সেল তাদের ভেরিফায়েড ফেসবুকে শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) এ তথ্য জানিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ এই চুক্তির মাধ্যমে পারমাণবিক শক্তির শান্তিপূর্ণ ব্যবহার, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অন্যান্য খাতে দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে।
নতুন এই সমঝোতার মূল লক্ষ্য হলো শান্তিপূর্ণ কাজে পারমাণবিক প্রযুক্তির ব্যবহার, পারমাণবিক নিরাপত্তা, সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক সেফগার্ড ও পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধে সহযোগিতা জোরদার করা। দুই দেশই বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা মান অনুসরণের বিষয়ে একমত হয়েছে।
সমঝোতা অনুযায়ী, পারমাণবিক শক্তি দুই দেশের জ্বালানি চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে। একই সঙ্গে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের কৌশলগত গুরুত্ব এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তার সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণের চেষ্টা করছে। এরই অংশ হিসেবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুরে দুটি এক হাজার ২০০ মেগাওয়াটের ইউনিট নির্মাণ করা হচ্ছে। পারমাণবিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়াতে চাইছে ঢাকা।
নতুন সমঝোতায় পারমাণবিক নিরাপত্তা ও সুরক্ষার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) সেফগার্ড ব্যবস্থার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে। দুই দেশই পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধসংক্রান্ত চুক্তি বা এনপিটির সদস্য এবং উভয়েরই আইএইএ’র সেফগার্ডস এগ্রিমেন্ট ও এডিশনাল প্রটোকল কার্যকর রয়েছে বলে সমঝোতায় উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এটিকে সরাসরি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ বা পারমাণবিক জ্বালানি সরবরাহের চুক্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত দুই দেশের মধ্যে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার একটি কাঠামো তৈরির সমঝোতা। যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ম অনুযায়ী, আনুষ্ঠানিক ‘১২৩ এগ্রিমেন্ট’ হলে সেটি পারমাণবিক উপকরণ, জ্বালানি, রিঅ্যাক্টর ও সরঞ্জাম স্থানান্তরের জন্য আইনি কাঠামো তৈরি করতে পারে; কিন্তু এমওইউ নিজে সেই ধরনের স্থানান্তরের অনুমতি দেয় না।
বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে এর আগে বৃহত্তর জ্বালানি সহযোগিতা নিয়েও সমঝোতা হয়েছিল। চলতি বছরের মে মাসে দুই দেশ দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা ও উৎস বহুমুখীকরণ নিয়ে একটি কৌশলগত জ্বালানি সহযোগিতা সমঝোতা সই করে। নতুন চুক্তিটি বিশেষভাবে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতাকে কেন্দ্র করে।
নতুন এই সমঝোতা এমন সময়ে হলো, যখন বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদা বাড়ছে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ উৎপাদনে পারমাণবিক শক্তির গুরুত্বও বাড়ছে। ফলে পারমাণবিক নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, দক্ষতা উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক আরও বিস্তৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে রূপপুর প্রকল্পের বিদ্যমান প্রযুক্তি ও সরবরাহ কাঠামো এবং নতুন মার্কিন সহযোগিতার মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। রূপপুর প্রকল্পে রুশ প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। চলতি বছরের বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তিতেও ভবিষ্যৎ পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংক্রান্ত একটি বিধান রাখা হয়েছে।
নতুন সমঝোতাটি বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সহযোগিতার একটি নতুন ভিত্তি তৈরি করেছে। এর বাস্তব প্রভাব নির্ভর করবে ভবিষ্যতে দুই দেশ কী ধরনের প্রযুক্তিগত, নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ ও বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করে তার ওপর।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, চুক্তিটি ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনামলে শুরু হওয়া পারমাণবিক সহযোগিতা উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে জানা যায়। চুক্তিটি ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে প্রযুক্তিগত বিনিময়, পারমাণবিক নিরাপত্তা এবং বেসামরিক জ্বালানি খাতে বৈজ্ঞানিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিশেষ দূত সার্জিও গোর গত ১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার এমওইউ নবায়নের প্রস্তাব দেওয়া হয়। যুক্তরাষ্ট্রের এ প্রস্তাবকে তখন ‘ইতিবাচকভাবে’ নেওয়ার কথা বলেছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
যুক্তরাষ্ট্রের ওই প্রস্তাবের বিষয়ে সরকারের ভাবনা জানতে চাইলে ৩ আগস্ট তিনি বলেন, পজিটিভ। সরকারের ভাবনা পজিটিভ। আমাদের আবার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি, সম্পর্ক, যদি বাংলাদেশের মানুষের স্বার্থে হয়, তাহলে আমরা সামনে আগাব।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্র প্রথম বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তি করে ১৯৮১ সালে। চুক্তিটি ১৯৯১ সালের পরে আর নবায়ন হয়নি।
ঢাকা ও ওয়াশিংটনের নতুন করে এমন সময় চুক্তি হওয়ার খবর এলো, যখন রাশিয়ার সহযোগিতায় রূপপুরে বাংলাদেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে।
পারমাণবিক জ্বালানি আইনের অধীনে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক সহযোগিতার চুক্তি করে থাকে থাকে যুক্তরাষ্ট্র।
যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ২৬টি দেশ ও সংস্থার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের এমন চুক্তি রয়েছে, যার অধীনে অন্তত ৫০ দেশের সঙ্গে বেসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি করেছে দেশটি।
শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত সিদ্ধান্ত নেবে, আশা করে যুক্তরাষ্ট্র: মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে বাংলাদেশ ও ভারত একসঙ্গে সিদ্ধান্ত নেবে বলে আশা করে যুক্তরাষ্ট্র। শেখ হাসিনার সঙ্গে কী হওয়া উচিত, সে বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট কোনো মতামত নেই।
বুধবার নিউইয়র্কে ‘অন-ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা ট্রাম্প প্রশাসনের এ অবস্থান তুলে ধরেন। ‘অন ব্যাকগ্রাউন্ড’ ব্রিফিং এমন একটি বৈঠক, যেখানে সাংবাদিকরা তথ্য ব্যবহার করতে পারেন। তবে তথ্যের নির্দিষ্ট উৎসের নাম প্রকাশ করা যায় না।
নিউইয়র্ক ফরেন প্রেস সেন্টারে ‘একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও সার্বভৌম দক্ষিণ এশিয়ার সমর্থনে মার্কিন নীতি’ শিরোনামে এ ব্রিফিং হয়। এতে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও শ্রীলঙ্কার সাংবাদিকরা ছিলেন।
২০২৪ সালের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। গত নভেম্বরে শেখ হাসিনাকে মৃত্যুদণ্ড দেয় বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
বুধবারের ব্রিফিংয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার কাছে শেখ হাসিনার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান জানতে চাওয়া হয়। জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক অবস্থান নেয়নি। আমরা বুঝতে পারছি যে বিষয়টি ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বৈরিতার একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।’
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘তাই আমরা আশা করছি, তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে একটি সমাধানে পৌঁছাবে। আর হাসিনার সঙ্গে কী হওয়া উচিত, তা আমরা এখনো নির্দিষ্ট করে জানাইনি।’
আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপরে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্নের জবাবে ওই কর্মকর্তা বলেন, ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কিছু বলতে চাই না। তবে এটা বলতে চাই, বাংলাদেশের সঙ্গে, বিএনপির সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভালো।’ তিনি বলেন, ‘আমরা নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যেতে চাই। বাংলাদেশকে আরও শক্তিশালী ও নিরাপদ করার যে কাজ চলছে, আমরা তার পাশে রয়েছি। বাংলাদেশকে আরও সমৃদ্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো কার্পণ্য নেই। তাই বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নিয়ে কিছু বলাটা সমীচীন মনে করছি না।’
এই ব্রিফিংয়ের আগে নিউইয়র্কে ফরেন প্রেস সেন্টারে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া সম্পর্কিত উপসহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী বিথানি মরিসন দক্ষিণ এশিয়ায় বিরাজমান পরিস্থিতি এবং ট্রাম্প প্রশাসনের নীতির আলোকে বক্তব্য দেন। এরপর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে ফটোসেশনে অংশ নেন।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

