প্রধানমন্ত্রী পদে ব্যক্তির ২ মেয়াদের পক্ষে সরকার
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:১৫
ছবি: সংগৃহীত
স্বৈরতান্ত্রিকতা রোধে যে কোনো ব্যক্তির দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকার যে প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল সরকার সেই সিদ্ধান্তের পক্ষে। সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা জানিযেছেন।
একই সঙ্গে বিরোধী দল আলোচনার টেবিলে এলে সমঝোতার ভিত্তিতে প্রস্তাবিত সংবিধানে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমতের ইস্যুতে ছাড় দেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া জাতীয় স্বার্থে কমিটিতে সদস্য পাঠানোর জন্য বিরোধী দলের প্রতি নতুন করে আহ্বান জানান তিনি।
মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ কথা জানান।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, রোববার ও মঙ্গলবার দুদিনব্যাপী গণমাধ্যমের সম্পাদক, টিভি চ্যানেল ও অনলাইন পোর্টালের সম্পাদক, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব এবং সাংবাদিক নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে কমিটি। সেখান থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও বিস্তর প্রস্তাব পাওয়া গেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সর্বোচ্চ ১০ বছর করার বিষয়ে অনেকে মত দিয়েছেন, এটি অগণতান্ত্রিক এবং জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকারের পরিপন্থী। কিন্তু আমাদের দলের পক্ষ থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী প্রস্তাব করেছিলেন যেন কোনো ব্যক্তি ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী পদে না থাকেন। স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হওয়া ঠেকাতেই এই প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। আমরা আমাদের সেই অবস্থান থেকে এখনো সরিনি। তবে সংসদে বিরোধী দল বা অন্য কারো পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব এলে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
সংবিধানের অন্যান্য সংশোধনীর প্রস্তাব সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বৈঠকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, বিচার বিভাগের বিকেন্দ্রীকরণ ও স্বাধীনতা এবং সংবিধানের প্রস্তাবনা (প্রিয়াম্বল) ও রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতিতে পরিবর্তনের প্রস্তাব এসেছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কাঠামো ও রূপরেখা কী হবে সে বিষয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। এ নিয়ে আরো উন্মুক্ত আলোচনা ও প্রস্তাব প্রয়োজন যা পরবর্তীতে পার্লামেন্ট বিবেচনা করবে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধানে বলা আছে বাংলাদেশ একক রাষ্ট্র (ইউনিটারি গভর্মেন্ট)। এখানে অঙ্গরাজ্যের কোনো সিস্টেম নেই। তাই দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্টের আদৌ প্রয়োজন আছে কিনা, সে বিষয়ে কেউ কেউ মতামত দিয়েছেন। তবে ‘জুলাই জাতীয় সনদে’ দ্বিকক্ষ পার্লামেন্টের বিষয়ে ঐকমত্য থাকায় আমরা সেভাবেই এগোতে চাই। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পার্লামেন্টই নেবে।
সংবিধান সংশোধনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ও ‘জুলাই সনদে’ তাদের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ প্রসঙ্গে বিশেষ কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আমাদের আলোচনার দ্বার উন্মুক্ত। আমরা আপনাদের (গণমাধ্যম) মাধ্যমে বিরোধী দলকে আহ্বান জানাই, তারা যেন সংবিধান সংশোধন কমিটিতে নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং আলোচনায় আসেন। জুলাই সনদের কোনো বিষয়ে তাদের ভিন্নমত থাকলে সমঝোতার ভিত্তিতে তা আলোচনা করা যেতে পারে, তবে তার জন্য তো তাদের আলোচনায় আসতে হবে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ, সংবিধান বিশেষজ্ঞ, আইনজীবী, বিচারক, শিক্ষাবিদ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সঙ্গে সম্পর্কিত সামাজিক শক্তি, জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদদের পরিবার এবং গত ১৭ বছরে গুমের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করবে কমিটি। এ ছাড়া, ড. আলী রীয়াজের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গেও শেষের দিকে বৈঠক করা হবে।
সবার মতামতের ভিত্তিতে একটি রিপোর্ট প্রণয়ন করে তা পার্লামেন্টে উপস্থাপন করা হবে এবং তার ভিত্তিতেই সংসদে বিল পাসের মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী আনা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী।
সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি, গঠন প্রক্রিয়া ও রূপরেখা নিয়ে একটি উন্মুক্ত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে। সুশীল সমাজসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত লিখিত প্রস্তাব ও গঠনমূলক পরামর্শ আহ্বান করে তিনি জানান, উত্থাপিত প্রস্তাবগুলোর মধ্যে যা জাতির জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত বিবেচিত হবে, জাতীয় সংসদেই পর্যালোচনার পর সেটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা হবে।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে কমিটির সভাপতি বিশদ বিবরণ দিয়ে জানান, এযাবৎকাল পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রক্রিয়া ও ধাপগুলো নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসা সম্ভব হয়নি।
সংস্কার কমিশনগুলোর কাজের ব্যাপ্তি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, মূল ছয়টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশের ওপর ভিত্তি করে গঠিত জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে আমরা শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। যদিও পূর্ববর্তী ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় অন্য কয়েকটি কমিশনের সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত ছিল না, তথাপি সরকার চাইলে যেকোনো সময়ে মিডিয়া বা অপরাপর খাতে নতুন সংস্কার কমিশন গঠন করে দেশের জনদাবির পরিপ্রেক্ষিতে তা বাস্তবায়ন করার পূর্ণ এখতিয়ার রাখে। বিশেষ কমিটির চূড়ান্ত রিপোর্ট প্রস্তুতের পর তা সংসদে বিল আকারে উত্থাপন করা হবে এবং সংসদীয় কাঠামোর ভিতর ও বাইরে ব্যাপক জনমত যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি সার্বজনীনভাবে গ্রহণযোগ্য সংবিধান সংশোধনী রূপ নেবে বলে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
জুলাই চেতনায় সংবিধান সংশোধনের তাগিদ গণমাধ্যম প্রতিনিধিদের: বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে ‘জুলাইয়ের চেতনা’ ধারণ করে সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের তাগিদ দিয়েছেন দেশের শীর্ষ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনসহ (ইসি) রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে স্বাধীন করা এবং নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী করার প্রস্তাব দিয়েছেন তারা।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধন বিষয়ক বিশেষ কমিটির চতুর্থ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে টেলিভিশন ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমের প্রধান নির্বাহী, সম্পাদক, হেড অব নিউজ এবং টকশো ব্যক্তিত্বরা অংশ নেন।
বৈঠক শেষে সংসদের মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান আমন্ত্রিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা।
বৈঠকে অংশ নেওয়া সাংবাদিক এ কে এম মঞ্জুরুল হক নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন পদ্ধতি নিয়ে কমিটিকে কিছু সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়েছেন।
তিনি বলেন, নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে যে নির্বাচন হবে পরবর্তীতে ওই নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে যেন কোনো প্রশ্ন না ওঠে—তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধানটা এমন করার প্রস্তাব দিয়েছি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধান উপদেষ্টা বাছাই পদ্ধতি এবং গঠন প্রণালী নিয়ে আমার কিছু সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে ব্রডকাস্ট জার্নালিস্ট সেন্টারের (বিজেসি) চেয়ারম্যান ফাহিম আহমেদ বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে বহুবার সংবিধান কাটাছেঁড়া হয়েছে। কিন্তু এবার জুলাইয়ের চেতনা ধারণ করে আমরা যেন একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে পারি, সেই লক্ষ্যে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান সংশোধনের অনুরোধ করেছি।
তিনি আরও বলেন, সংবিধান সংশোধনের ক্ষেত্রে অবশ্যই বিরোধী দলগুলোকে রাখার চেষ্টা করতে হবে। তাদের কনভিন্স করে আলোচনায় আনতে হবে, তবেই এটি সারা দেশের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে।
এ ছাড়া নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও গণমাধ্যমকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে বলে জানান ফাহিম আহমেদ।
ড. আবদুল হাই সিদ্দিক বলেন, আমাদের সাংবিধানিক সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করা। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো, বিশেষ করে নির্বাচন কমিশন যেন সত্যিকার অর্থে স্বাধীন থাকে এবং তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার মাধ্যমে গণতন্ত্রের ভিত্তি যেন মজবুত হয়, সেই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
সংবিধান সংশোধন যেন টেকসই ও দীর্ঘমেয়াদি হয় সে বিষয়ে জোর দিয়ে টকশো ব্যক্তিত্ব ডা. সাখাওয়াত হোসেন সায়ন্থ বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রক্রিয়া নিয়ে সবার কাছে সুচিন্তিত লিখিত মতামত চেয়েছে কমিটি। সংবিধানের এই সংশোধনটা যেন টেকসই হয়, বারবার যেন পরিবর্তন করতে না হয়, সে বিষয়ে সবাই ঐকমত্য হয়েছেন। বিরোধী দলসহ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল একসঙ্গে থেকে এই সংশোধন করলে তা কম বিতর্কিত হবে।
দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট পার্লামেন্ট প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডা. সায়ন্থ বলেন, উচ্চকক্ষের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এটি দেশের আর্থিক ব্যয় বাড়াবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এছাড়া উচ্চকক্ষ হলে সেখানে সিভিল সোসাইটির (সুশীল সমাজ) নামে দলীয় লোকজন ঢুকে যাবে কি না, ফলে নন-পার্টিজান সিভিল সোসাইটি অস্তিত্ব হারাবে কি না সেসব উদ্বেগও তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

