
নেতিবাচক শব্দ হওয়ায় ক্যাডার শব্দের পরিবর্তন, জেলা প্রশাসক, পুলিশ ভেরিফিকেশন না থাকা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা ক্যাডার আলাদা করা, ফরিদপুর ও কুমিল্লাকে নতুন বিভাগ ঘোষণাসহ শতাধিক সুপারিশ নিয়ে তৈরি করা হয়েছে জনপ্রশাসন সংস্কারবিষয়ক প্রতিবেদন। আজ (বুধবার) দুপুরে প্রধান উপদেষ্টার কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে এ প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে।
এ বিষয়ে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রধান আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী গতকাল সাংবাদিকদের বলেন, বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টায় প্রধান উপদেষ্টার কাছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদন জমা দেওয়া হবে। প্রতিবেদনে শতাধিক সুপারিশ থাকছে এবং সেগুলো বাস্তবায়ন সম্ভব।
কমিশন প্রধান আরও বলেন, আমাদের রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা ছিল গত মাসে, কিন্তু আমরা আমাদের কাজের কারণে পারিনি। কারণ, আমরা মাঠে গিয়েছি, লোকজনের সঙ্গে কথা বলেছি। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় গিয়ে কথা বলেছি, অনলাইনে আমরা মতামত নিয়েছি। এগুলোর ভিত্তিতে প্রতিবেদন চূড়ান্ত করা হয়েছে। তবে তিনি সুপারিশ সম্পর্কে প্রতিবেদনে ১০০টির বেশি সুপারিশ থাকছে বলে উল্লেখ করলেও সুপারিশ সম্পর্কে কিছু জানাতে রাজি হননি।
সম্প্রতি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান জানিয়েছিলেন, কমিশনের মেজর সুপারিশগুলোর মধ্যে একটি হচ্ছে, ফরিদপুর ও কুমিল্লাকে বিভাগ করা হোক। ওই এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আমরা দুটি বিভাগ করার পরামর্শ দিচ্ছি। জনগণের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরও অনেক এমন সুপারিশ করেছি। আমরা গুগলে ক্লাস্টার করেছি, একই বিষয় কত হাজার মানুষ সাপোর্ট করেছে, কত হাজার লোক চাহিদা দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ‘ক্যাডার’ শব্দের সঙ্গে অনেকের মনে একটা নেগেটিভিটি (নেতিবাচকতা) থাকে। জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের অনেকগুলো সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে একটা থাকবে এই ক্যাডার শব্দটি বাদ দেওয়া। এর পরিবর্তে যার যে সার্ভিস যেমন, সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন), সিভিল সার্ভিস (হেলথ), সিভিল সার্ভিস (এগ্রিকালচার) বিবিধ লেখা হবে।
‘জেলা প্রশাসক’ নাম পরিবর্তন করে জনসেবা বলা যায় কি না, সে বিষয়েও সুপারিশ রয়েছে। জেলা প্রশাসক ব্রিটিশ আমলের সৃষ্টি এবং এই শব্দের অনেকগুলো প্রতিশব্দ আছে। কালেক্টর, ডিস্ট্রিক্ট অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেট। নামেও থাকবে কিছু সাজেশন। জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের মতো স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে ক্যাডার সার্ভিস থেকে আলাদা করার জন্য সরকারকে সুপারিশ করেছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। একই সঙ্গে অন্য ক্যাডারগুলোকে নিয়ে পাঁচটি গুচ্ছ করারও সুপারিশ করা হচ্ছে। এ দুই ক্যাডারকে আলাদা করে বিশেষায়িত বিভাগ করা হবে। এই দুই ডিপার্টমেন্ট ছাড়া বাকি সবাই ক্যাডার থাকতে পারবে।
পদোন্নতির ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে, পরীক্ষা ছাড়া উপসচিব ও যুগ্ম-সচিব পদে পদোন্নতি নয়। পরীক্ষা ছাড়া সিভিল সার্ভিসের উপসচিব এবং যুগ্ম-সচিব পর্যায়ে কেউ পদোন্নতি পাবেন না বলে সরকারকে সুপারিশ করতে যাচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। পাবলিক সার্ভিস কমিশন পরীক্ষা নেবে এবং ৭০ মার্ক না পেলে পদোন্নতি পাবেন না। প্রতিটি ক্ষেত্রে (উপসচিব থেকে সচিব পর্যন্ত প্রতিটি পর্যায়ে) এটি নাও হতে পারে, উপসচিব এবং যুগ্মসচিব এই দুই পর্যায়ে (পরীক্ষার মাধ্যমে পদোন্নতি) হবে।
এরপরের পর্যায়ে সরকার পদোন্নতি দিতে পারবে। আর যে পরীক্ষা হবে, সেখানে যদি একজন কাস্টমস ক্যাডারের কর্মকর্তা সবচেয়ে বেশি নম্বর পান, সে তালিকায় এক নম্বরে চলে আসবে। উপসচিবের তালিকায় সে এক নম্বরে আসবে। উপসচিব পদে পদোন্নতির ক্ষেত্রে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের জন্য ৫০ এবং অন্য ক্যাডার থেকে ৫০ শতাংশ কর্মকর্তাদের নেওয়ার সুপারিশ থাকছে।
সূত্র আরও জানায়, সরকারি চাকরিতে নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন বাতিলের জন্য সরকারকে সুপারিশ করতে যাচ্ছে জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন। চাকরিতে রিক্রুটমেন্ট (নিয়োগ), বিভিন্ন ব্যাপারে পুলিশের ভেরিফিকেশন একটা ম্যান্ডেটরি (বাধ্যতামূলক) জিনিস।
এ ব্যবস্থা থাকবে না। কোথাও থাকবে না। রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে সেবা পাওয়ার অধিকারীদের অধিকার নিশ্চিত করতে ভেরিফিকেশনের প্রয়োজন দেখছেন না সংস্কার কমিশন।
গতকাল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পর সেটি হবে পাবলিক ডকুমেন্ট। ওয়েবসাইটে দেওয়া হবে, সবাই জানবেন। জমা দেওয়ার পরে সবাই জানুক, এতে ভুল বোঝাবুঝির অসুবিধা থাকে না।
উল্লেখ্য, গত ৩ অক্টোবর ৮ সদস্যের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়। এ কমিশনের প্রধান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের চেয়ারম্যান ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী। পরে কমিশনের সদস্য সংখ্যা আরও তিনজন বাড়ানো হয়। জনমুখী, জবাবদিহিমূলক, দক্ষ ও নিরপেক্ষ জনপ্রশাসন ব্যবস্থা করে তুলতে এ কমিশন গঠন করা হয়।
৯০ দিনের (তিন মাস) মধ্যে প্রস্তুত করা প্রতিবেদন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কাজে হস্তান্তর করতে বলা হয়। এরপর তিন দফা বাড়িয়ে কমিশনের মেয়াদ ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হয়ে যাওয়ায় আগেই প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে কমিশন।
বিকেপি/এটিআর