Logo

মতামত

বাংলা বর্ষবরণ শঙ্কাহীন হোক!

Icon

মো. মাহমুদ হাসান

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৫, ১৫:১১

বাংলা বর্ষবরণ শঙ্কাহীন হোক!

মির্জা আব্দুল ফতেহ জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবর! সম্রাট আকবর বা মহামতি আকবর হিসেবে তিনি ইতিহাসে সমধিক পরিচিত। সম্রাট হুমায়ুনের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার হিসেবে কিশোর বয়সে রাজ্যের শাসনভার গ্রহণ করেছিলেন। ১৩ বছর বয়সে যে কিশোর সিংহাসনে আরোহন করেছিলেন, মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তারে তিনি ছিলেন সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও সফল শাসকদের একজন। 

১৫৫৬ সাল থেকে ১৬০৫, ভারত বর্ষ ও আফগানিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী শাসক ছিলেন সম্রাট আকবর। শুধু সাম্রাজ্যবাদী শাসক হিসেবে নয়, শিক্ষা বিস্তার ও সামাজিক কল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্যও তৃতীয় মুঘল সম্রাট আকবর ইতিহাসের একটি স্মরণীয় নাম। তার আমলেই কৃষি বর্ষপঞ্জিকা চালু হয়েছিল। তৎপরবর্তীতে যা বাংলা বর্ষপঞ্জি হিসেবে আবির্ভূত হয়। 

বৈশাখের নবান্ন উৎসব আর চৈত্রের সংক্রান্তির শুরুটাও সম্রাট আকবরের উৎসবমুখর হিতৈষী কর্মকাণ্ড থেকেই সূচিত। বৈশাখী উৎসবের চেতনা আর বিশ্বাসে ঐতিহাসিকভাবে কোন ধর্মীয় বিভাজন ছিল না। কালের পরিবর্তনে শব্দ বিন্যাস বিবর্তিত হয়েছে মাত্র। কেউ বলেন বৈশাখী উৎসব, কেউ বলেন নবান্ন উৎসব, কেউ বা করেন মঙ্গল শোভাযাত্রা। বাংলা বর্ষ গণনার সঙ্গে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান বা কোন ধর্মীয় সংশ্লেষের কোনো ঐতিহাসিক তাৎপর্য নেই। অধিকন্তু এর সঙ্গে অর্থনীতির ক্রম বিকাশ আর উৎসব উদযাপনের এক সুগভীর যোগসূত্র রয়েছে। 

শতাধিক বছর আগে বিপণন, উৎসব, আনন্দ ও সংস্কৃতির গতি প্রকৃতি আজকের মত ছিল না। এখন থেকে কয়েক দশক আগেও বৈশাখী উদযাপন গ্রামীণ অর্থনীতির বিপণন ব্যবস্থার অন্যতম উৎস ছিল। চৈত্র মাসে কৃষকের ধান কাটা শুরু হলেই বৈশাখী বিপণনে অংশ নিতে কৃষকদের তোড়জোড় শুরু হয়ে যেতো। গ্রামে গ্রামে মানুষ ‘বান্নি’ নামে আয়োজিত বৈশাখী মেলায় অংশ নিতে বছর জুড়ে প্রস্তুতি নিতেন। কামার, কুমার, জেলে, তাঁতিসহ কুটির শিল্পীরা তাদের উৎপাদিত পণ্যের পসরা সাজিয়ে মেলায় বিপণন করতেন।

আমাদের শিশুকালে বান্নিতে অংশগ্রহণ ছিল সেরা বিনোদনের অংশ। পুতুল নাচ, সার্কাস, লুডু সাপসহ শিশুদের বিনোদন আর মজার মজার খাবার দাবারের অন্যতম উৎস ছিল এসব বৈশাখী আয়োজন। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের জন্য অর্থ করিতে সময়টাও ছিল অনুকূল। তাই কৃষকরা যেমন তাদের প্রয়োজনীয় কৃষি সরঞ্জামাদি ক্রয়-বিক্রয়ের জন্য মেলার অপেক্ষায় থাকতেন, উৎপাদনকারীরাও তাদের পণ্য বিপণনের জন্য মেলাকে বেছে নিতেন।

বৈশাখী আয়োজনের এই সংস্কৃতি নানাভাবে বিবর্তিত হয়েছে। শিক্ষা প্রযুক্তি, জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিকাশ এই বিবর্তনকে বিকশিত করেছে। কিন্তু ধর্ম কখনো প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়ায়নি। ২০০১ সালের ১৪ই এপ্রিল রমনার বটমূলে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বাঙালির গৌরবোজ্জ্বল বৈশাখী সংস্কৃতির উপর ভয়াবহ আঘাত আসে। ধর্ম বিরোধী আখ্যায়িত করে একদল উগ্রবাদী, পুরো সমাজ ব্যবস্থায় অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা চালায়। যার সঙ্গে যোগ হয় অশুভ রাজনৈতিক যোগসাজসের নীল নকশা। তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর ছত্রছায়া এই উগ্রবাদী ধর্মান্ধ শক্তিকে সংগঠিত করতে প্রেরণা যোগায়। আজ যারা মঙ্গল শোভাযাত্রা বা বৈশাখী মেলাকে ধর্মীয় ব্যাখ্যা দিয়ে থামিয়ে দিতে চায়, এর পিছনেও অশুভ রাজনৈতিক হীন প্রচেষ্টার যোগসূত্রের সন্ধান মেলে। 

রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘প্রগতিশীল’ ও ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ শব্দ দুটির ব্যাপক প্রচলন আছে। এ দুটি শব্দ নিয়ে জ্ঞানী, গুণী আর তাত্ত্বিকদের নানারকম বিশ্লেষণ আছে। পরিবর্তন ও বিবর্তনের সাথে সাথে যারা নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেন সাধারণ দৃষ্টিতে এরাই প্রগতিশীল। আর যারা যে কোনো পরিস্থিতিতে পরিবর্তনের বিরোধিতা করেন, এরা প্রতিক্রিয়াশীল বলেই দৃশ্যমান। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাঙালি মুসলিম সমাজের একটি বৃহত্তম অংশ প্রতিক্রিয়াশীলতার দোষে দুষ্ট। ১৮৩৫ সালে ব্রিটিশ শাসক লর্ড বেন্টিং-এর আমলে ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার জন্য ইংরেজি শিক্ষা আইন করেছিলেন। এই আইন প্রণয়ণের অন্তরালে ব্রিটিশ স্বার্থ সিদ্ধির বিষয়টি সন্দেহাতীত হলেও ইংরেজি শিক্ষার গ্রহণ-বর্জন নিয়ে মুসলিম সমাজের ভূমিকাটি ছিল নানাভাবে বিতর্কিত। 

ইংরেজি খ্রিস্টানদের ভাষা! ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা অর্জন কোন ভাবেই মুসলমানদের জন্য সঠিক নয়। প্রতিক্রিয়াশীলদের এমন মতামতে মুসলিম জনগোষ্ঠীর বৃহত্তম অংশ ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি শিক্ষাকে বর্জন করে। পাশাপাশি সনাতন তথা হিন্দু ধর্মাবলম্বী জনগোষ্ঠী ইংরেজি শিক্ষাকে সহজে গ্রহণ করে নেয়। ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রযন্ত্র পরিচালনায় মুসলিম ধর্মাবলম্বীরা ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ে। যদিও কিছু সম্ভ্রান্ত মুসলিম জমিদার ও চৌধুরীরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়ে নিজেদের কর্তৃত্বকে বহাল রাখতে সক্ষম হয়েছিল, কিন্তু সাধারণ মুসলমানদের সবচেয়ে বড় অংশটি ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়ে। 

স্বাধীনতা যুদ্ধ পূর্ববর্তী এবং যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও বিভিন্ন ধর্মীয় ফতোয়া দিয়ে এ অঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টা হয়েছে। ধর্মাশ্রযয়ের নামে বিভ্রান্ত মোল্লাতন্ত্র স্বাধীনতাকামী পরিবারের যুবতী মেয়েদের ‘গনিমতের মাল’ আখ্যায়িত করে পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে তুলে দিতেও কার্পণ্য করেনি। রাজনৈতিক থেকে সামাজিক, যে কোন কর্মকাণ্ডে স্বার্থসিদ্ধির উছিলায় এই অপগোষ্ঠী বারবার ধর্মকে অপব্যবহার করেছে। 

১৯৯১ সালে ভয়াবহ ঘূর্ণিঝড়ে উপকূলীয় অঞ্চলে যখন হাজার হাজার মানুষ মারা যায়, সে সময়েও ধর্মীয় উগ্রবাদের অনুসারীরা চট্টগ্রামের রেলওয়ে ময়দানের জনসভায় বলেছিলেন, ‘এটি নারী নেতৃত্বের উপর আল্লাহর গজব’। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানের নির্দেশে নারী নেতৃত্ব হারাম, এ কথা বলে ধর্মপ্রিয় মুসলমানদের অনুভূতিকে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ এর অব্যবহিত পরেই, খালেদা জিয়ার নারী নেতৃত্ব মেনে নিয়ে এই ধর্মান্ধগোষ্ঠী সরকারের অংশ হয়। 

২০১২ সালে একজন ধর্মীয় নেতাকে চাঁদে দেখা যাওয়ার কথা বলে দেশময় এক অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। ২০১৩ সালের মে মাসে শাপলা চত্বরের ঘটনা নিয়েও ইসলামকে ব্যবহারের নামে অপরাজনীতি কম হয়নি। ‘শত শত তৌহিদী জনতাকে মেরে ফেলা হয়েছে’ এমন তথ্য ছড়িয়ে দেশময় অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টির চেষ্টা হয়েছে। আজারবাইজানে ভূমিকম্পে নিহত সারি সারি লাশের ছবি পত্রিকায় ছাপিয়ে ধর্মীয় অনুভূতিকে উস্কে ধর্ম বিশ্বাসী সাধারণ মানুষকে বেসামাল করে ফায়দা হাসিলের চেষ্টা হয়েছে। 

আজ যারা বৈশাখ উদযাপন নিয়ে হৈচৈ করেন, ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এরা একই শ্রেণিভুক্ত মানুষ। অধুনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নবাব সলিমুল্লাহর জমিদান আর রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা নিয়ে তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হতে দেখা যায়। এসব আলোচনাও প্রতিক্রিয়াশীলতার দূষণ থেকে মুক্ত নয়। এসব শুধুমাত্রই ধর্মকে ব্যবহার করে ঘোলা পানিতে স্বার্থসিদ্ধির অভিলাষ। যাদের কুড়িগ্রামের রৌমারী, চিলমারীর অভিজ্ঞতা আছে, তারা নিশ্চিত করেই বলতে পারেন, পঁচাত্তর সালে একটি ক্যামেরা এ অঞ্চলের জন্য কতটা অবাস্তব বস্তু ছিল। তবুও বাংলার মানুষ বাসন্তীকে জাল পরে লজ্জা নিবারণ করতে দেখেছে। 

আজ বৈশাখ নিয়ে যে সব আলোচনা, সমালোচনা আর ধর্মকে টেনে আনার অব্যাহত প্রচেষ্টা, এর মূলেও রয়েছে সেই প্রতিক্রিয়াশীলগোষ্ঠী আর তাদের স্বার্থসিদ্ধির নীল নকশা। 

বাংলাদেশের সমাজ ব্যবস্থায় কথামালার ব্যবহারেও বৈষম্যের অস্তিত্ব মেলে। মুসলিম জনগোষ্ঠী ‘পানি’ বললেও হিন্দু জনগোষ্ঠীর কাছে তা ‘জল’! বস্তুত পানি আর জলের মধ্যে কোন তফাৎ না থাকলেও, এমন শব্দ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে হিন্দু মুসলিম বিভাজনের রেওয়াজ চালু আছে। ‘মঙ্গল’ শব্দটি কল্যাণ, শুভ বা সুন্দরের প্রত্যাশায় ব্যবহৃত হলেও তথাকথিত তৌহিদী মানুষ সেখানে হিন্দুত্ববাদকে আবিষ্কার করেন। তাই ধর্মীয় ব্যাখ্যা হাজিরের মাধ্যমে মঙ্গল শোভাযাত্রাকে কেন্দ্র করে হিন্দু মুসলিম বিভাজনের উত্তেজনা তৈরির অপচেষ্টায় লিপ্ত হন। এই উত্তেজনা সমাজকে বিবাজিত করে। হাজার বছর চলমান সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করার মধ্য দিয়ে প্রতিহিংসার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দেয়। শান্তি আর শুভকামনা পরিবর্তে অতি সুকৌশলে উগ্রবাদকে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। 

বৈশাখী সন্নিকটে! পাশ্চাত্যের শহর কেলগেরীতে নানা সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রস্তুতির পালা দেখা যাচ্ছে। বাংলাদেশের বৈশাখ আরও মাধুর্যময় হবে সেটিই প্রত্যাশিত। জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী পরিস্থিতিতে এবারের বৈশাখের প্রেক্ষাপট নিয়ে নানা মহলে শঙ্কা আছে। বৈশাখ কোনো ধর্মের নয়, এটি বাঙালির সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শাশ্বত ঐতিহ্যের প্রতীক। ধর্ম বর্ণের ঊর্ধ্বে উঠে একে আনন্দময় করতে সর্বমহলের সহযোগিতা অনস্বীকার্য। মর্যাদার বর্ষবরণে ফ্যাসিবাদকে না খুঁজে, বৈশাখ হোক সমৃদ্ধি আর সম্ভাবনার। নব উদ্যমে জেগে ওঠা সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানবিক প্রতিশ্রুতির! শঙ্কাহীন মোড়কে উৎসব আয়োজনের। 

মো. মাহমুদ হাসান : কলামিস্ট উন্নয়ন গবেষক ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষক 

  • বাংলাদেশের খবরের মতামত বিভাগে লেখা পাঠান এই মেইলে- bkeditorial247@gmail.com

এমএইচএস

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর