Logo

মতামত

ধূলিমলিন নগরে বৈশাখী পূর্ণতা: শেকড়মুখী প্রাণের মহোৎসব

Icon

নাহিদ হাসান রবিন

প্রকাশ: ১০ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:০৫

ধূলিমলিন নগরে বৈশাখী পূর্ণতা: শেকড়মুখী প্রাণের মহোৎসব

নাহিদ হাসান রবিন, ছবি: সংগৃহীত

আধুনিক নগরজীবন এক অদ্ভুত গোলকধাঁধা। এখানে আমরা ঘড়ি ধরে দৌড়াই, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সখ্য পাতি এবং বিশ্বায়নের জোয়ারে গা ভাসিয়ে দিয়ে নিজেদের এক একজন ‘বিশ্ব নাগরিক’ হিসেবে জাহির করি। আমাদের চলনে-বলনে ভিনদেশি সংস্কৃতির প্রলেপ। কিন্তু এই যে নাগরিক আভিজাত্যের সুউচ্চ দেয়াল আমরা সযত্নে গেঁথেছি, বৈশাখ এলে দেখা যায় সেই দেয়ালের প্রতিটি ইট যেন মাটির গন্ধে আকুল হয়ে ওঠে। পহেলা বৈশাখ আমাদের সামনে সেই আয়নাটি ধরে, যেখানে আমরা দেখি, আমাদের রক্তে আজও প্রবাহিত হচ্ছে হাজার বছরের সেই গ্রামীণ লোকজ সংস্কৃতি। আমরা নগরের ধুলোবালিতে যতই নিজেদের বদলে ফেলি না কেন, আমাদের প্রাণের আরামটুকু আজও সেই শীতল পাটির বুননেই জমা রাখা আছে।

নব্য-নাগরিক রুচির বিবর্তন লক্ষ্য করলে এক চমকপ্রদ সত্য দৃশ্যমান হয়। আমরা আধুনিকতার চরম শিখরে বসেও অবচেতনভাবে সেই গ্রামকেই খুঁজি। খেয়াল করলে দেখা যায়, আজকের ব্যস্ততম বাণিজ্যিক এলাকা কিংবা অভিজাত পাড়ার শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রেস্টুরেন্টগুলোর অন্দরসজ্জায় বিদেশি দামী ঝাড়লণ্ঠনের চেয়েও আজ আমাদের বেশি পছন্দের হয়ে উঠেছে মাটির সরায় আঁকা লোকজ চিত্রপট। যে ফাস্টফুড চেইন বা চাইনিজ রেস্টুরেন্টে আমরা বিজাতীয় খাবারের স্বাদ নিতে যাই, সেখানেও ডেকোরেশনে ব্যবহৃত হচ্ছে পাটের চট, বাঁশের নানাবিধ কারুকাজ আর শীতল পাটি। এটি কেবল সাজসজ্জা নয়, এটি আসলে আমাদের অবদমিত দেশপ্রেমের বহিঃপ্রকাশ। একটি নামী ইলেকট্রনিক্স শোরুম, যেখানে কি না পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আধুনিক প্রযুক্তির কেনাবেচা হয়, সেখানেও প্রবেশদ্বারের পাশে শো-পিস হিসেবে দেখা যায় মাটির সরা কিংবা বেতের ঝুড়ি। ড্রয়িংরুমের এক কোণে কাঁচের আসবাবের ভিড়ে যখন একটি মৃৎশিল্পের পাত্র কিংবা খড়ের তৈরি বাবুই পাখির বাসা ঠাঁই পায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না যে আমাদের নান্দনিকতার আদিম উৎসটি আসলে গ্রামীণ কারুশিল্প।

আমরা বিদেশি সংস্কৃতিকে অনুকরণ করতে গিয়ে ঘরের কোণে সাজিয়ে রাখি কৃত্রিম মাকড়সার জাল, বাঁশের তৈরি কলমদানি কিংবা সবুজ ঘাসের কার্পেট। যান্ত্রিক নগরীর বুকে এক টুকরো ছায়াঘন গ্রামকে ধরে রাখার এই যে ব্যাকুলতা, তা প্রমাণ করে যে আমরা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি থেকে এক বিন্দুও দূরে সরতে পারিনি। মৃৎশিল্প আর হস্তশিল্পের এই যে নিঃশব্দ উপস্থিতি আমাদের শোবার ঘরে কিংবা অফিসের টেবিলে, তা আসলে আমাদের শেকড়কে ছুঁয়ে থাকার শেষ চেষ্টা। আমরা যতই বিদেশি সংস্কৃতির আলোকে আলোকিত হতে চাই না কেন, মনের অজান্তেই আমাদের রুচিবোধে চলে আসে সেই চিরচেনা দেশীয় পণ্যের আভিজাত্য। এই সংস্কৃতিকে অস্বীকার করার উপায় নেই, কারণ এটি আমাদের অস্তিত্বের বুনন। আমরা কি পেরেছি আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসতে? উত্তরটি দিবালোকের মতো স্পষ্ট, না, পারিনি। আর কোনোদিন পারবোও না, কারণ এটি আমাদের আত্মার পরিচয়। বরং এই সংস্কৃতিকে লালন করেই আমাদের আগামীর স্বপ্ন বোনা উচিত।

পহেলা বৈশাখ আমাদের সামনে এই অম্লান সত্যটিকে আরও প্রকট করে তোলে। এই একটি দিনে নগরের রাজপথ হয়ে ওঠে এক টুকরো গ্রাম। রমনার বটমূল থেকে শুরু করে প্রতিটি অলিতে-গলিতে যখন বৈশাখী মেলার আসর বসে, তখন মনে হয় যেন পুরো দেশটাই এক বিশাল গ্রামীণ প্রান্তরে পরিণত হয়েছে। অথচ এই মানুষগুলোই সারা বছর বিদেশি ফ্যাশন আর জীবনধারার পেছনে ছুটেছে। কিন্তু বৈশাখের তপ্ত দুপুরে লাল-সাদার মিশেলে যখন হাজারো মানুষ রাস্তায় নামে, তখন তাদের পোশাকে এক অপূর্ব বাঙালিয়ানা ফুটে ওঠে। নারীরা লাল পাড়ের সাদা সুতি শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ, চোখে কাজল আর হাত ভর্তি রেশমি চুড়িতে যেন সাক্ষাৎ গ্রাম্য বধূর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন। পুরুষদের গায়ে শোভা পায় কারুকাজ করা খাদি বা সুতি পাঞ্জাবি, অনেক সময় কাঁধে থাকে গামছা। এই পোশাক কেবল তুলা বা সুতোর বুনন নয়, এটি আমাদের সাংস্কৃতিক অহংকারের রক্ষাকবচ। বৈশাখের এই সাজে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে মাটির সাথে একাত্ম হওয়ার পবিত্র শুদ্ধতা।

আমাদের লোকজ সংস্কৃতির প্রাণ হলো জারি, সারি, পালাগান আর ভাটিয়ালির সুর। ইলেকট্রিক গিটারের ঝংকারের ভেতরেও যখন দোতারার সুর বেজে ওঠে, তখন শ্রোতার হৃদয়ে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, তা বৈশ্বিক হয়েও একান্তই নিজস্ব। নদীর বুকে নৌকাবাইচের সেই সমবেত ‘হেইও-রে-হেইও’ ধ্বনি কিংবা গ্রামের ধুলোমাখা মাঠে হাডুডু, গোল্লাছুট ও কানামাছি খেলার সেই আদিম উত্তেজনা, এসবই আমাদের জাতিসত্তার মূল ভিত্তি। আজ আমরা ক্রিকেটের বিশ্ব উন্মাদনায় ভাসলেও, বৈশাখের রোদে গ্রামীণ খেলাধুলার কথা শুনলে কেন জানি আমাদের বুকের ভেতর এক অজানা হাহাকার জেগে ওঠে। এই হাহাকারই হলো শেকড়ের টান। জারি-সারির সেই মরমী সুর আজও আমাদের যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ দূর করার মহৌষধ হিসেবে কাজ করে। পহেলা বৈশাখের মেলা কেবল কেনাবেচার জায়গা নয়, এটি হলো এক বিশাল মিলনমেলা যেখানে গ্রাম আর শহর এক বিন্দুতে এসে মিলিত হয়। মেলা থেকে কিনে আনা মাটির ব্যাংক, কাঠের ঘোড়া, বাঁশের বাঁশি কিংবা হাতে আঁকা মাটির হাঁড়ি-পাতিল কিনে পরম মমতায় সাজিয়ে রাখা, এসবই প্রমাণ করে আমাদের হৃদয়ের প্রকৃত ভালোলাগা কোথায় নিহিত।

বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে দেখা যায়, পহেলা বৈশাখ আজ আর কেবল ভৌগোলিক সীমানায় সীমাবদ্ধ নেই। লন্ডন থেকে নিউ ইয়র্ক, সিডনি থেকে টরন্টো, বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা বাঙালিরা আজ এই উৎসবকে বিশ্বজনীন রূপ দিয়েছে। পরবাসের যান্ত্রিক জীবনেও তারা ভোলেননি নিজেদের শেকড়। প্রবাসীরা লাল-সাদা পোশাক পরে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করেন, বিদেশের পিচঢালা রাজপথে আল্পনা আঁকেন। সিডনির অপেরা হাউসের সামনে কিংবা লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে যখন ‘এসো হে বৈশাখ’ ধ্বনিত হয়, তখন প্রমাণিত হয় যে বাঙালিকে তার শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন করা অসম্ভব। বিদেশের মাটিতে পান্তা-ইলিশের সেই আয়োজন কিংবা দেশীয় মেলা বসানো, এসবই হলো নিজ অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখার এক নীরব সংগ্রাম। আমাদের এই যে বিশ্বব্যাপী সাংস্কৃতিক পদচিহ্ন, তা আমাদের গৌরবের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। এটি কেবল একটি জাতির উৎসব নয়, এটি বাঙালির এক বিশাল ‘সফট পাওয়ার’ যা পৃথিবীকে সম্প্রীতি ও উদারতার বার্তা দেয়।

আসলে গ্রাম বাংলার এই রূপকল্প আমাদের জীবনের প্রতিটি ভাঁজে মিশে আছে। শৈল্পিকতার নিরিখে বিচার করলে দেখা যায়, প্রতিটি উৎসবের পেছনে রয়েছে এক একটি গভীর জীবনদর্শন। নবান্ন, পৌষ মেলা কিংবা বৈশাখী হালখাতা, এসব কেবল উদযাপনের উপলক্ষ নয়, বরং প্রকৃতির সাথে মানুষের নিবিড় মৈত্রীর দলিল। আমরা যখন প্লাস্টিকের বদলে মাটির হাঁড়িতে দই খুঁজি কিংবা মেলামাইন ছেড়ে মাটির সরায় ভাত খাই, তখন আমরা আসলে প্রকৃতির সেই আদিম পবিত্রতাকে ফিরে পাই। যান্ত্রিক সভ্যতা আমাদের দিয়েছে গতি, কিন্তু কেড়ে নিয়েছে স্বস্তি। সেই স্বস্তিটুকু ফিরে পেতে আমাদের বারবার ফিরতে হয় সেই বাবুই পাখির বাসার কারুকাজে কিংবা শীতল পাটির শীতল স্পর্শে। আমাদের অন্দরসজ্জায় যে হস্তশিল্পের ছোঁয়া আজ আভিজাত্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা আদতে গ্রামীণ শ্রমজীবী মানুষের ঘাম ও মেধার ফসল। এই মেলবন্ধনই প্রমাণ করে যে দেশীয় সংস্কৃতিকে ছাড়া আমাদের আধুনিকতা অসম্পূর্ণ।

আমরা আধুনিক হতে পারি, প্রযুক্তির শিখরে আরোহণ করতে পারি, কিন্তু আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করবে আমাদের ঐতিহ্য। জার্মানি বা জাপানের দিকে তাকালে দেখা যায়, তারা প্রযুক্তিতে বিশ্বসেরা হয়েও নিজেদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক ও উৎসবকে ছাড়েনি। আমাদেরও তেমনি আধুনিকতার সঙ্গে ঐতিহ্যের এক ভারসাম্যপূর্ণ মিথস্ক্রিয়া ঘটাতে হবে। পহেলা বৈশাখ আমাদের সেই সুযোগ করে দেয়। এই দিনটি আমাদের নাগরিক অহমিকা ধুয়ে মুছে দিয়ে এক কাতারে দাঁড় করায়। মঙ্গল শোভাযাত্রার সেই বিশাল মুখোশ আর লোকজ মোটিফগুলো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অন্ধকারের বিরুদ্ধে লড়াই করার শক্তি আমাদের নিজেদের মাটির ভেতরেই আছে।

বৈশাখ আমাদের জন্য এক মহা-আহ্বান। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নগর জীবন নিয়ে আমরা যতই গলাবাজি করি না কেন, দিনশেষে আমরা সেই মেঠো পথের রাখালের বাঁশির সুরেই শান্তি পাই। বিদেশি সংস্কৃতির চাকচিক্য আমাদের ক্ষণিকের জন্য মোহগ্রস্ত করলেও, আমাদের চিরস্থায়ী আশ্রয় হলো আমাদের দেশীয় সংস্কৃতি। পহেলা বৈশাখের এই মেলা, এই উৎসব আর এই মহামিলনই আমাদের অস্তিত্বের রক্ষাকবচ। আমরা কোনোদিন আমাদের শেকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হতে পারবো না, কারণ আমাদের প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে আছে এই বাংলার মাটি আর জল। বৈশাখী এই রোদ্দুর আমাদের মনে গেঁথে দিক, আমরা আধুনিক হতে পারি, কিন্তু আমাদের প্রাণভোমরাটি আজও সেই শান্ত-শ্যামল গ্রামবাংলার কোলেই সুরক্ষিত। নববর্ষের এই আলোকশিখা আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির প্রতি অনুরাগকে আরও প্রগাঢ় করুক এবং আমাদের আগামীর পথচলাকে ঐতিহ্যের শক্তিতে বলীয়ান করুক। আমাদের ঐতিহ্যই হোক আমাদের আগামীর শ্রেষ্ঠ অহংকার।

লেখক: কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন