অলোক আচার্য, ছবি: সংগৃহীত
হিন্দু সৌর পঞ্জিকা অনুসারে বাংলা বার মাস অনেককাল আগে থেকেই পালিত হতো। এই সৌর পঞ্জিকার শুরু হতো এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি সময় হতে। সেসময় অবশ্য এখনকার মত নতুন বছরকে বরণ করে নেওয়ার জন্য নববর্ষ পালন করা হয় তেমন ছিল না। তখন বরং কৃষির সাথে সম্পর্ক থাকায় ফসল ওঠার সাথে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ছিল। অর্থাৎ কৃষি ও কৃষক সংশ্লিষ্ট ছিল বাংলা নববর্ষ।
সম্রাট আকবরের সময়কাল থেকেই মূলত পহেলা বৈশাখ পালন কর শুরু হয়। মূলত খাজনা আদায় ও শুল্ক পরিশোধে চৈত্র মাসের শেষ দিনে প্রজাদের বাধ্যবাধকতা থাকতো। সম্রাট আকবরের আদেশে সৌর সন ও হিজরি সন এর উপর ভিত্তি করে বাংলা সনের নিয়ম তৈরি করেন। ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ১০ মার্চ বা ১১ মার্চ থেকে বাংলা সন গণনা শুরু হয়। তবে এই গণনা পদ্ধতি কার্যকর হয় আকবরের সিংহাসন আরোহনের সময় (৫ নভেম্বর, ১৫৫৬) সাল থেকে।
বৈশাখের প্রথম দিনে মিষ্টি মুখ করানোর মাধ্যমে নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টি মুখ করাতো। খাজনা আদায়ও চলতো চৈত্র মাসের শেষ দিনে। এ দিনে বিভিন্ন গোষ্ঠি নানা রকম অনুষ্ঠানের আয়োজন করতো। প্রথমে এই সনের নাম ছিল ফসলি সন। পরে বঙ্গাব্দ বা বাংলা বর্ষ নামে পরিচিত হয়। সে সময় থেকে আজ পর্যন্ত বিভিন্ন ভাবে এর গুরুত্ব বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমান সময়ে এসে উপনীত হয়েছে। অর্থাৎ সেদিনকার পহেলা বৈশাখ আজ এক নতুন ধারায় প্রবেশ ঘটেছে।
সম্রাট আকবর মুঘল ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন, যা ছিল ইসলামি ও হিন্দু ক্যালেন্ডারের সমন্বয়। প্রথমে আকবরের পঞ্জিকার নাম ছিল ‘তারিখ-এ-এলাহি’। আকবরের এই ‘তারিখ ইলাহি’র প্রবর্তনকাল ছিল ১৫৮৪ খ্রিষ্টাব্দের ২১ মার্চ। মনে করা হয় বাংলা বারো মাসের নামকরণ করা হয়েছে বিভিন্ন নক্ষত্র থেকে। যেমন বিশাখা নক্ষত্র থেকে বৈশাখ, জ্যেষ্ঠা নক্ষত্র থেকে জ্যৈষ্ঠ, আষাড়া নক্ষত্র থেকে আষাঢ়, শ্রবনা নক্ষত্র থেকে শ্রাবণ, ভাদ্রপদ থেকে ভাদ্র, অশ্বিনী থেকে আশ্বিন, কৃত্তিকা থেকে কার্তিক, মৃগশিরা থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্যা থেকে পৌষ, মঘা থেকে মাঘ, ফাল্গুনী থেকে ফাল্গুন ও চিত্রা থেকে চৈত্র। বিশাখা নক্ষত্র অনুসারে বৈশাখ বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস, সেই হিসেবে বৈশাখের প্রথমদিন নববর্ষ অর্থাৎ পয়লা বৈশাখ ধরা হয়।
পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশেই বছরের প্রথম দিন বরণ করে নেওয়ার রীতি প্রচলিত রয়েছে। নিজস্ব রীতি নীতি মেনে এবং ঐতিহ্য বহাল রেখে এই দিন ব্যাপক আনন্দ উল্লাস করে দেশগুলোর নাগরিক। পুরাতন জরা-জীর্ণতা কাটিয়ে নতুন বছর বরণ করে নিতে উৎসাহের কমতি থাকে না জনগণের। ব্যাপক উৎসাহ আর উদ্দীপনার ভিতর দিয়ে বছরের প্রথম দিন বরণ করে নেয়া হয়। তবে ১৪ এপ্রিলকে এবং বাংলা বছরের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখে বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়াও আরও কয়েকটি দেশ বছরের প্রথম দিন হিসেবে শুরু করে। সেই দেশ ও রীতি নিয়ে আলোচনা করা যাক।
ভারতে নববর্ষ উৎসব-
ভারতে ব্রিটিশ শাসনের সময় গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন শুরু হয়। ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের মতোই বৈশাখ মাসের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করা হয়। হিন্দু সৌর বছরের প্রথম দিন আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, কেরালা, মনিপুর, উড়িষ্যা, পাঞ্জাব, তামিল নাডু এবং ত্রিপুরায় বৈশাখের প্রথম দিন নববর্ষ উদযাপন করা হয়। তবে নববর্ষ পালন করা হলেও একেক জায়গায় নান আলাদা আলাদা। এসব অঞ্চলেও এ দিনকে কেন্দ্র করে চলে ঐতিহ্যবাহী খাওয়ার আয়োজন, খেলাধূলা এবং দিনব্যাপী ঘোরাঘুরি।
মিয়ানমারের নববর্ষ উৎসব-
মিয়ানমারের নববর্ষকে থিংইয়ান বলা। বার্মিজ ভাষায় এর অর্থ ‘পরিবর্তন’ বা ‘এক জায়গা থেকে অন্যত্র স্থানান্তর’। নতুন বছরের প্রথম দিনটি সাধারণত মধ্য-এপ্রিলে হয়ে থাকে, তবে ঠিক কোন নির্দিষ্ট দিনে তা পালন হবে তা হিসাব করা হয় মিয়ানমারের সৌর এবং চন্দ্র পঞ্জিকার গণনা মিলিয়ে। মিয়ানমারে নববর্ষের দিনে মিয়ানমার জুড়ে পানি উৎসব হয়। নববর্ষের চারদিন আগে থেকে পানি উৎসব শুরু হয়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, পানি উৎসবের পানির ছোঁয়া লাগতে হবে সব মানুষের গায়ে, তাতে করে সব পাপ দূর হয়ে যাবে।
থাইল্যান্ডের সংক্রান উৎসব-
থাইল্যান্ডের নতুন বছরের শুরুর দিনটি সংক্রান উৎসব নামে পরিচিত। সংক্রান শব্দটি সংস্কৃত ভাষার শব্দ সংক্রান্তি থেকে এসেছে। থাইল্যান্ডে মূলত এটি এপ্রিলের ১৩ তারিখে শুরু হয়। প্রায় পাঁচ দিন ব্যাপী এ উৎসবের সময়ে দেশটির সাধারণ ছুটি থাকে। মিয়ানমারের মতো নববর্ষে থাইল্যান্ডেও সবচেয়ে বড় পানি উৎসবের আয়োজন করা হয়। হাজার হাজার নারী পুরুষ একে অপরের গায়ে পানি ছিটিয়ে এ উৎসব পালন করে থাকে।
শ্রীলঙ্কার নববর্ষ উৎসব-
শ্রীলঙ্কায় ১৪ এপ্রিয় পালন করা নববর্ষ উৎসবকে বলা হয় সিনহালা। প্রায় সপ্তাহ ধরে এ উৎসব পালন করা হয়ে থাকে। তবে নববর্ষকে স্থানীয়ভাবে আলুথ আবুরুদ্ধাও বলা হয়। মূলত সিনহালিজদের উৎসব হলেও দেশটির সকল মানুষ উদযাপনে সামিল হন। দিনটিতে শ্রীলঙ্কায় সরকারি ছুটি থাকে। উৎসবে নানা রকম পিঠা, মিষ্টি আর পায়েস বানানো হয়। এর সাথে সাথে আয়োজন করা হয় ঐতিহ্যবাহী নানা ধরনের খেলাধূলারও।
কম্বোডিয়ার নববর্ষ উৎসব-
কম্বোডিয়াতে ১৪ এপ্রিল পালন করা নববর্ষ উৎসবকে বলা হয় খেমার। দেশটিতে দিনটিকে বলা হয় ‘চউল সানাম থামাই’ যার অর্থ নতুন বছরে প্রবেশ করা। সকালে ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান পালনের মধ্য দিয়ে এ উৎসবের শুরু হয় এবং এরপর প্যাগোডা বা বৌদ্ধমন্দির চত্বরে ঐতিহ্যবাহী নৃত্যের মাধ্যমে নতুন বছরের স্বাগত জানাতে শুরু করেন অধিবাসীরা। খেমার নববর্ষে কম্বোডিয়াতে নানা ধরণের লোকজ খেলা এবং প্রতিযোগিতা হয়।
নেপালে নববর্ষ উৎসব-
সাধারণত এপ্রিল মাসের ১৪ তারিখেই নেপালে পহেলা বৈশাখ পালন করা হয়। এই দিনটি নেপালের আনুষ্ঠানিক বর্ষ পঞ্জিকা বিক্রম সাম্বাতের প্রথম দিন। অন্য দেশগুলোর মতোই এ দিনে নেপালে নববর্ষ উপলক্ষে সরকারি ছুটি থাকে। নেপালেও পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে দেশজুড়ে নানা ধরনের ঐতিহ্যবাহী খেলাধূলার আয়োজন করা হয়, বাড়িতে বাড়িতে চলে উৎসব মুখর পরিবেশ এবং বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রগুলো পর্যটনে পরিপূর্ণ থাকে। তবে নেপালে চন্দ্রবর্ষের প্রথম দিন, যার নাম সোনাম লহসারও উদযাপন করা হয়।
লাওসে সংক্রান উৎসব-
লাওসেও সৌর পঞ্জিকা অনুযায়ী বৈশাখের প্রথম দিনটি পালন করা হয়। স্থানীয়ভাবে এর নাম সংক্রান বা পি-মেই, যার মানে নতুন সংক্রান্তি বা নতুন বছর। দেশটিতে তিন দিন ধরে চলে উৎসব আনুষ্ঠানিকতা।
লেখক: শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

