Logo

মতামত

বিএনপি’র রবীন্দ্রনাথ

Icon

রফিক সুলায়মান

প্রকাশ: ১২ মে ২০২৬, ১৬:২৭

বিএনপি’র রবীন্দ্রনাথ

রফিক সুলায়মান, ছবি: সংগৃহীত

এবার রবীন্দ্র-জয়ন্তীতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাণী এবং বিএনপি মহাসচিব মির্জা আলমগীর সাহেবের বিবৃতি আমাকে মুগ্ধ করেছে। এর বাইরে বিএনপি-জামাতপন্থী কয়েকজন লেখকের ভিডিও বিবৃতি চোখে পড়েছে, যেখানে রবীন্দ্রনাথকে হেয় করার প্রবণতা স্পষ্ট। 

রবীন্দ্রনাথ ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান, এটা তাঁর দোষ হতে পারে না। তিনি জবরদস্তিমূলক ওই বিশিষ্ট পরিবারে জন্মানোর জেদ করেছিলেন বলে শোনা যায় না। অপিচ, তিনি বাংলাভাষী অঞ্চলে জন্মানোয় সবচে বেশী উপকার হয়েছে বাংলা ভাষার। জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক স্যার বলেছেন, বাংলা ভাষাটা হৃষ্টপুষ্ট হয়েছে তাঁর হাতেই। 

রবীন্দ্রনাথ তাঁর জমিদারি এলাকায় স্কুল, হাসপাতাল, বৃদ্ধাশ্রম, ম্যাটার্নিটি ক্লিনিক এসব কেন করেন নাই- এগুলো নিয়েও নতুন যুগের কোনো কোনো গবেষককে কলম ধরতে দেখা যায়। তাঁর সমবায় ব্যাংকের সুদের হার কেন এত অধিক- এটাও আক্রমণের অনুষঙ্গ! ব্যাংক সেক্টরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের মতো সফল হতে পারেননি, যাকে একালের সেইসব গবেষক তাঁর অদূরদর্শিতা বলে সিদ্ধান্ত দিয়ে দিচ্ছেন। 

বাংলাদেশে এখন আজান দিয়ে রবীন্দ্র বিরোধিতা জমজমাট। বেশকিছু প্রকাশনাও বাজারে এসেছে। শুনেছি কাটতি ভালো। কাঙাল হরিনাথ এই গ্রুপের কাছে বিশাল রেফারেন্স। তিনি নাকি রবীন্দ্রনাথের প্রজাপীড়ন নিয়ে তাঁর পত্রিকায় প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিলেন! 

এই পন্থীদের কেউ কেউ নজরুলকেও টেনে এনে বলে থাকেন, নোবেল পাওয়ার কথা ছিলো নজরুলের। রবীন্দ্রনাথ ষড়যন্ত্র করে নিজে ছিনিয়ে নিয়েছেন। অথচ যে বছর রবীন্দ্রনাথ নোবেল লাভ করেন, অর্থাৎ ১৯১৩ সালে নজরুলের বয়স মাত্র ১৪! নজরুল সেসময় লেখালেখি শুরু করেছিলেন কিনা বলতে পারবো না। করার কথাও নয়।

তবে এর এক দশকের মধ্যে ননরুলকে ‘বসন্ত’ নাটক উৎসর্গ করে যুগের দাবী পূরণ করেছেন এবং নজরুলকে কবি হিসেবে বরণ করে নিয়েছিলেন। বসন্ত নাটকের বিখ্যাত গান: ‘যদি তারে নাই চিনি গো’ আমার অনেক প্রিয়। আরেকটি প্রিয় গান ‘তোমার বাস কোথা যে পথিক।’ নজরুলও তাঁর প্রথম শ্রেষ্ঠ কবিতা সংকলন রবীন্দ্রনাথকে উৎসর্গ করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথের গানের সুর অবলম্বনে নজরুল লিখেছেন অনেক গান: তৃষিত আকাশ কাঁপে রে (দারুণ অগ্নিবাণে রে), শূন্য এ বুকে (অল্প লইয়া থাকি), এল এল রে বৈশাখী ঝড় (এসো এসো হে তৃষ্ণার জল), তোমারি জেলে পালিছ ঠেলে (তোমারি গেহে পালিছ স্নেহে) ইত্যাদি। শেষের গানটি লালিকা।

২৫ খণ্ড রবীন্দ্র রচনাবলির মধ্যে মাত্র দুটো কবিতা ‘হিন্দুমেলার উপহার’ এবং ‘শিবাজী উৎসব’ যথাক্রমে কবির ১৪ এবং ৪৩ বছর বয়সের রচনা। দুটো কবিতাই স্বদেশী জাতীয়তাবাদী ধারার।

মহামান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মহোদয় মুঘল বিরোধী হিন্দু নেতা শিবাজী ছেত্রপতির নামে শিবাজী উৎসব চালু করলে স্বামী বিবেকানন্দ, বিপিন চন্দ্র পাল প্রমুখ স্বদেশি চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ইংরেজ তাড়ানোর মন্ত্রে দীক্ষিত হন। রবীন্দ্রনাথের স্বদেশ পর্যায়ের বাংলা ও ইংরেজি রচনাসমূহ এই আন্দোলনের ফসল বললে অত্যুক্তি হবে না। শিবাজী উৎসব কবিতার ‘এক ধর্মরাজ্য হবে ভারত’- এটা শিবাজীর সংলাপ। 

রবীন্দ্রনাথ নিজে ছিলেন ব্রাহ্ম, একেশ্বরবাদী। বঙ্কিমচন্দ্রের ‘বন্দে মাতরম’ গানে সুর দেয়ার সময় দেবীবন্দনা যুক্ত বাণীগুলোতে তিনি সুরারোপ করতে অনীহা প্রকাশ করেছিলেন। তিনি যেসব আগমনী গান লিখেছেন সেখানেও দেবী দুর্গার উপস্থিতি শূন্য। যেমন ‘আজি বাংলাদেশের হৃদয় হতে কখন আপনি/তুমি এই অপরূপ রূপে বাহির হলে জননী!/ওগো মা, তোমায় দেখে দেখে আঁখি না ফিরে!/তোমার দুয়ার আজি খুলে গেছে সোনার মন্দিরে।’

স্বদেশি জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক আদর্শে উদ্বুদ্ধ ছিলেন নজরুলও। তিনি লিখলেন খালেদ, খেয়াপারের তরণী, বাজলো কি রে ভোরের সানাই, আনন্দময়ীর আগমনী ইত্যাদি। বাজলো কি রে ভোরের সানাই গীতিকবিতায় তিনি ইসলামি বীরদের পূণর্জাগরণ কামনা করেছেন, যারা দিকে দিকে ইসলামের ঝাণ্ডা উড়িয়েছিল- মধ্যপ্রাচ্য থেকে ইউরোপ পর্যন্ত। ঠিক একই কারণে মহামান্য বাল গঙ্গাধর তিলক মারাঠি বীর শিবাজীকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। 

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাহেবের অনুপস্থিতিতে যিনি প্রায় দুই দশক দলের হাল ধরেছিলেন শক্ত হাতে সেই মির্জা আলমগীর সাহেব একজন বিশাল মাপের রবীন্দ্রপ্রেমী মানুষ। তাঁর কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথের কবিতা শোনা গভীর আনন্দের। বর্তমান সরকার সংস্কৃতি ক্ষেত্রে জেনেবুঝেই কাজ করছেন বলেই আমার বিশ্বাস। 

লেখক: কিউরেটর, বুড়িগঙ্গা আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস। এডমিন, প্রসঙ্গ নজরুল-সঙ্গীত। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন