কাজী খাদিজা আক্তার, ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান সময়ে ‘শো- অফ’ শব্দটি মনে, মগজে কিংবা চোখের সামনে ভেসে উঠলে সাথে সাথে আরও একটি শব্দ অজান্তেই আমাদের মনে চলে আসে তা হলো ‘সোশ্যাল মিডিয়া’। শো-অফ এবং সোশ্যাল মিডিয়া যেন নেতিবাচকভাবে একে অপরের সাথে সংযুক্ত হচ্ছে।
মনোবিজ্ঞানীদের মতে, শো-অফের মূল কারণ হলো সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও নিজের আত্মমর্যাদা বৃদ্ধির মানসিকতা। যদিও এই কারণ বা ইচ্ছেগুলো কেবলমাত্র অসুস্থ মানসিকতার এক মহামারী। শো-অফ শব্দটির অর্থ জাহির করা বা লোক দেখানো। মূলত বস্তুগত সম্পদ, সৌন্দর্য্য, ক্ষমতা লোক দেখানোর বিষয়কে বোঝানো হয়েছে। এই ধরনের শো-অফ আমাদের সমাজে, পরিবারে, ব্যক্তিজীবনে ভীষণ রকম নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অথচ চীন কতো আগেই এই মহামারীর সম্পর্কে সচেতন হয়েছিলো। চীনে ধনসম্পদ থাকলেই তা লোকজনকে দেখানোর জন্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেওয়া যাবে না। নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের কোনো পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় দিলে ডিলিট করে দেবে কর্তৃপক্ষ। এমনকি একাউন্ট বন্ধ করা হতে পারে।
চীনের জনপ্রিয় সোশ্যাল মিডিয়া ‘উইবো’ দেশটিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ, সুস্থ এবং ঐক্যবদ্ধ সামাজিক পরিবেশে সৃষ্টির লক্ষ্যে একটি শুদ্ধি অভিযান চালায়। বিলাসবহুল মূল্যভিত্তিক সামগ্রীর প্রদর্শন বন্ধ রাখতে, যেমন এর মধ্যে রয়েছে অর্থসম্পদ দেখানোর উদ্দেশ্যে বা অর্থের বড়াই করে দেওয়া কনটেন্ট বা পোস্ট সরানোর মতো পদক্ষেপ। এইসব শো অফ-এর মতো চিন্তা-ভাবনা থেকে বেড়িয়ে সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকারীদের আরও মানসম্মত, সত্যনিষ্ঠ ও ইতিবাচক মূল্যবোধসম্পন্ন কনটেন্ট পোস্ট করতে উৎসাহ দেওয়াই হলো এই শুদ্ধি অভিযানের মূল উদ্দেশ্য। ২০১৬ সালে ইন্টারনেট সংস্কৃতির পরিবেশ সুন্দর করতে এ উদ্যোগ গ্রহণ করে কর্তৃপক্ষ।
এই যে শো-অফ নামের এই ব্যাধী বহুকাল আগেও ছিলো এই মানবকূলে। তবে তা মহামারী আকারে পৌঁছেছে বর্তমান সোশ্যাল মিডিয়ার সহজলভ্যতার কারণে। এর নেতিবাচক প্রভাব হীনমন্যতা, হতাশার জন্ম দেয়। মানসিক চাপ অনুভব করে, আর অপ্রয়োজনীয় অর্থ অপচয়ের দ্বার উন্মোচন করে। অহংকার আর কৃত্রিমতা শো-অফ কারীকে এক ধরনের মেকি সুখ অনুভব করতে সাহায্য করে যা চরম ব্যক্তিত্বহীনতার পরিচয় বহন করে।
গী দ্য মোপাসাঁ-এর ‘নেকলেস’ গল্পে, মাথিল্ডের নিজ সম্পদের উপর অতৃপ্তি আর অসন্তুষ্টির কারণে বান্ধবীর কাছ থেকে হার ধার করে এনে পার্টিতে শো-অফ করতে যাওয়া, তারপর সেই হার হারিয়ে গেলে সঠিক না জানার কারণে নকল হারের পরিবর্তে আসল হীরের দাম চোকাতে সারা জীবন দীনতার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত করার গল্প আমাদের হয়তো অনেকেরই জানা।
George Kelly-এর লিখা The Show off একটি হাস্যরসাত্মক নাটক। কেন্দ্রীয় চরিত্র অব্রি পাইপার একজন বড়াইপ্রিয় ও আত্ম প্রচারকারী মানুষ, যে সবসময় নিজের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেখাতে চায়। এবং নিজেকে সবসময় অত্যন্ত বুদ্ধিমান ও সাহসী হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু বাস্তবে সে অনেকসময় হাস্যকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করে। আমাদের মধ্যেও এমন অনেকেই আছেন যারা সোশ্যাল মিডিয়ায় শো-অফ করতে করতে নিজেকে হাসির পাত্র করেন যা বোঝার ক্ষমতাও হয়তো তিনি হারিয়ে ফেলেন। আর এই ট্রেন্ডে আরও গতি দেন মিডিয়া কর্মীরা, যখন তারা টক শো গুলোতে অতিথিদের প্রশ্ন করেন, কোন ব্র্যান্ডের পোশাক পড়েছে? কত দাম? কোন দেশের? ঈদের শপিং মল গুলোতে গিয়ে ক্রেতাদের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেন,"কত বাজেট? বিনোদন জগতে, কার বিয়েতে কত খরচ হলো? ইত্যাদি ইত্যাদি। এইসব প্রশ্নগুলো থেকে কখনও কারো উপকার হবে বলে আমার জানা নেই।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বর্তমানে এই ট্রেন্ডে গা ভাসাতে গিয়ে অসুস্থ প্রতিযোগিতা যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি বৃদ্ধি পাচ্ছে সম্পর্কের দূরত্ব। এইসবের কারণে সাময়িক মিথ্যে আনন্দ হয়তো পাওয়া যায় কিন্তু ভূয়া ব্যক্তিত্বে নিজের স্বকীয়তা আর অবশিষ্ট থাকে না। অন্যের চোখে নিজেকে দেখতে গেলে অস্তিত্বের সংকট তৈরি হবে। আর তাই মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি অবধারিত।
লেখক : শিক্ষক, সংস্কৃতিকর্মী ও কলাম লেখক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

