মো. তাহমিদ রহমান, ছবি: সংগৃহীত
খাদ্য মানুষের জীবনের মৌলিক চাহিদার অন্যতম। খাদ্য ছাড়া মানুষের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। তাই জাতিসংঘ বহু আগেই খাদ্য প্রাপ্তির অধিকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ। এ ছাড়া খাদ্য অধিকার বিষয়ক অন্যান্য সনদও বাংলাদেশ গ্রহণ করেছে। তাই বাংলাদেশও রাষ্ট্রীয়ভাবে খাদ্যকে মৌলিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে (ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবন ধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা করা হলো রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। এখন শুধু খাদ্যের জোগান নিশ্চিত করলেই হবে না, সেটিকে নিরাপদও রাখতে হবে। কিন্তু সেই খাদ্যই যেন হয়ে ওঠেছে মৃত্যুর নীরব ফাঁদ।
প্রতি বছর বিশ্বের ২০ লাখের বেশি মানুষ খাদ্যজনিত রোগে প্রাণ হারায়। বাংলাদেশেও অনিরাপদ খাবারের কারণে বছরে মারা যায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষ। আবার অনিরাপদ খাবার গ্রহণের কারণে প্রতিদিন পাঁচ শতাংশ মানুষ ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছে। অনিরাপদ খাবার গ্রহণের ফলে শিশু ও গর্ভবতী মায়েদের মধ্যে তৈরি হয় পুষ্টিহীনতা। এ ছাড়া খাদ্যপণ্যে ভেজালের কারণেই দেশের মানুষের বিভিন্ন রকমের ক্যানসার, লিভার সিরোসিস, কিডনি ফেইলিউর, হৃদযন্ত্রের অসুখ, হাঁপানিসহ অন্যান্য জটিল রোগ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। একে নিয়ন্ত্রণে আনতে ভেজালমুক্ত ও নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে হবে সর্বাগ্রে। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। দেশে খাদ্যে ভেজাল একটি মারাত্মক সামাজিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। লাভের অন্ধ প্রতিযোগিতায় কিছু কৃষক ও অসাধু ব্যবসায়ী খাদ্যের মধ্যে মিশিয়ে দিচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক, ক্ষতিকর রং, সংরক্ষণকারী উপাদান ও নিষিদ্ধ দ্রব্য।
এই ভয়াবহ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো রাষ্ট্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের অনেকাংশে নিরবতা, নিষ্ক্রিয়তা কিংবা সীমিত কার্যকর ভূমিকা। ফলে জনস্বাস্থ্য আজ চরম হুমকির মুখে। খাদ্যে ভেজাল কেবল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক সংকটের প্রতিফলন। একজন মানুষ যখন অন্য মানুষের খাদ্যে বিষ মেশায়, তখন সে কেবল আইন ভাঙে না, সেই সঙ্গে মানবতা, বিবেক ও সামাজিক দায়িত্ববোধকেও হত্যা করে। লাভের লোভে মানুষের জীবনকে তুচ্ছ করে দেখার এই মানসিকতা সমাজকে ধীরে ধীরে নিষ্ঠুর ও আত্মকেন্দ্রিক করে তুলছে। বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দীর্ঘদিন ধরেই ছিল, সাম্প্রতিক গবেষণা, টেস্ট রিপোর্ট ও নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তথ্য সেটিকে আরও স্পষ্ট করেছে। প্রতিদিনের চাল, ডাল, সবজি, ফল, দুধ, মাংস যে খাদ্য আমরা প্রতিনিয়ত খাই, তার উল্লেখযোগ্য অংশেই রয়েছে ক্ষতিকর টক্সিন, ভারী ধাতু এবং নিষিদ্ধ রাসায়নিক উপাদান। বেঁচে থাকার অপরিহার্য উপাদানটি তাই এখন হয়ে উঠেছে নীরব ঘাতক। খাদ্যের মাধ্যমে কৃষি বিষ শরীরে প্রবেশ করে মারাত্মক ক্ষতি করছে পরিপাকতন্ত্রের।
অনেক কীটনাশক স্নায়ু কোষের কার্যকলাপকে ব্যাহত করে। এর ফলে মাথাব্যথা, মাথা ঘোরা, স্মৃতিশক্তি হ্রাস, মনোযোগের অভাব ও মানসিক অস্থিরতা দেখা যায়। দীর্ঘমেয়াদে এই বিষের প্রভাবে খিচুনি, পক্ষাঘাত এমনকি স্নায়ু বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত কৃষি কাজে কীটনাশকের সংস্পর্শে থাকা মানুষের মধ্যে বিষণ্নতা ও স্নায়বিক রোগের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে বেশি। বর্তমান সময়ে খাদ্যে ভেজালের রূপ এতটাই বিস্তৃত ও জটিল যে তা প্রায় একটি শিল্পে পরিণত হয়েছে। জাতীয় নিরাপদ খাদ্য দিবস ২০২৬ উপলক্ষে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে জানানো হয়, গত অর্থবছরে এক হাজার ৭১৩টি খাদ্যের নমুনা পরীক্ষা করা হয়। এর মধ্যে ৫৭১টিতে ভেজাল, দূষণ বা নিম্নমানের উপকরণ পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের উপাত্ত অনুসারে দেশের বাজারে পাওয়া খাদ্যপণ্যের গড়ে ৪০ শতাংশে ভেজাল বা ক্ষতিকর উপাদান পাওয়া গেছে। এর মধ্যে ইউরোপীয় মানের চেয়ে তিন থেকে ২০ গুণ বেশি ডাইক্লোরোডাইফিনাইলট্রাইক্লোরোইথেন (ডিডিটি), টক্সিন এবং কীটনাশক শনাক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, বাজারের ৩৫ শতাংশ ফলে, ৫০ শতাংশ শাকসবজিতে, ১৩টি চালের নমুনায় অতিমাত্রায় আর্সেনিক, পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম, হলুদের ৩০টি নমুনায় সীসা ও ভারী ধাতু, লবণে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সীসা, মাছ ও মুরগিতে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে। এই তথ্যগুলো শুধু উদ্বেগজনক নয় বরং এটিই এখন বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্যের অন্যতম বড় চিত্র।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, বাজারের ৮৫ শতাংশ ফল পাকানো হয় কার্বাইড, ইথোফেন ও ফরমালিন দিয়ে। দেশের বাড়তি খাদ্য উৎপাদনে বড় অর্জন আনতে গিয়ে বেড়েছে রাসায়নিক সারের প্রয়োগ। মাটির ওপর নির্বিচারে রাসায়নিক প্রয়োগের ফলে খাদ্য উৎপাদন বেড়েছে ঠিকই, কিন্তু খাদ্যের গুণগত মান নষ্ট হয়েছে। প্রাণবৈচিত্র্য হারিয়ে যাচ্ছে। খাদ্যের উৎপাদন স্থান থেকে পরিবহন ও গুদামজাতেও রাসায়নিক মেশানো হয়। শস্য ছাড়াও বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মাছ ও আমিষের উৎস ডিম-মুরগিও বিষাক্ত হয়ে উঠেছে। মাছের খামারেও ব্যবহার হচ্ছে নানা বর্জ্য। পোলট্রি মুরগির বর্জ্য জমিতে ও মাছের খামারে ব্যবহৃত হচ্ছে। রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারে খাদ্যের উৎস নিরাপদ থাকছে না। অসাধু ব্যবসায়ী ও উৎপাদনকারীদের কারসাজির কারণে খাদ্য দূষিত হচ্ছে। শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে দেশে প্রতি বছর প্রায় তিন লাখের বেশি মানুষ ক্যানসারে আক্রান্ত হচ্ছে।
ডায়াবেটিসে আক্রান্তের সংখ্যা এক লাখ ৫০ হাজার, কিডনি রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দুই লাখ। এ ছাড়া মাতৃস্বাস্থ্যের দিকে নজর দিলে দেখা যায়, একজন গর্ভবতী ভেজালমুক্ত খাবার পান না। যার ফলে গর্ভের শিশুটিও বেড়ে ওঠার আশানুরূপ পরিবেশ পায় না। এসব কারণে গর্ভপাত, বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন, স্নায়ুবিকাশ জনিত সমস্যা গ্রস্থ এবং বিকলাঙ্গ শিশুর জন্ম এখন অনেকটা নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশে চাষযোগ্য কৃষিজমির তুলনায় জনসংখ্যার চাপ অধিক। বাড়তি এ জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটাতে হাইব্রিড সবজি চাষ, মাংস উৎপাদন অনেকটা বাধ্যতামূলক হয়ে পড়েছে। সারা বিশ্বেও এ প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বহির্বিশ্বে হাইব্রিড সবজি, ফলমূল, মাছ, মাংস উৎপাদনের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রিত মাত্রায় যথাযথ হরমোন ব্যবহার করা হয়। সেখানে নিরাপদ ও বিশুদ্ধ খাবারের বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। কিন্তু আমাদের দেশে এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালা নেই।
আমাদের দেশে যেসকল কীটনাশক কৃষক জমিতে ব্যবহার করে সেগুলো বাইরে থেকে আমদানিকৃত। বেশির ভাগ আমদানিকৃত কীটনাশক নিম্নমানের এবং হেভিমেটাল যুক্ত। যেহেতু আমাদের দেশে কৃষিক্ষেত্রে কেউ পিএইচআই (প্রি হার্ভেস্ট ইন্টারভেল) নিয়ন্ত্রণ করে না তাই এসকল মাত্রাতিরিক্ত হেভিমেটাল যুক্ত কীটনাশক খাদ্যের মাধ্যমে অসহায় নাগরিকের শরীরে প্রবেশ করছে। দ্রুত সময়ে মাছ, মুরগি ও গরুকে বড় করে উৎপাদন বাড়াতে ভেজাল ফিশ ও পোল্ট্রি ফিড ব্যবহারের ঘটনা দেশে নতুন নয়। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীরা পরিত্যক্ত, বিষাক্ত উপাদান দিয়ে খাদ্য তৈরি করে আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারে ছেড়ে দিচ্ছে। আর অতি মুনাফালোভী খামারিরা নিম্নমানের কম দামি এসব খাদ্য মাছ, মুরগি ও গরুকে খাওয়ানোর মাধ্যমে বিষাক্ত মাংস ও ডিম বাজারে বিক্রি করছে। এর মধ্য দিয়ে মানবদেহে ছড়িয়ে পড়ছে মরণব্যাধি ক্যান্সারসহ জটিল সব রোগের উপাদান।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ খ্রিস্টাব্দে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। ভেজালবিরোধী সচেতনতা সৃষ্টির পাশাপাশি তারা কাজ করছে নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে। আছে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভেজালবিরোধী অভিযান। তার পরও কমছে না ভেজালের ব্যাপকতা। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের বিশেষ ক্ষমতা আইনে খাদ্যে ভেজাল দেয়া এবং ভেজাল খাদ্য বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এ ছাড়া ১৪ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। সরকার আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করলেও খাদ্য নিরাপদ করতে আমাদের অর্জন সামান্যই। শুধু আইন বা প্রতিষ্ঠান থাকলে হবে না, আইনের প্রয়োগ ও প্রাতিষ্ঠানিক কার্যকারিতা নিশ্চিত করা দরকার। নিরাপদ খাদ্যের কার্যক্রমটি বর্তমানে একাধিক মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হওয়ায় সমন্বয়ের অভাব প্রকট। এক্ষেত্রে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকেই (বিএফএসএ) আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মান নিয়ন্ত্রক হিসেবে বিএসটিআইয়ের গবেষণা ও তদারকি আরো বাড়াতে হবে। সুস্থ জীবনের জন্য নিরাপদ খাদ্য দেশের মানুষের অন্যতম আকাঙ্ক্ষার বিষয়।
পুষ্টিসমৃদ্ধ নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতের বিষয়টিকে রাষ্ট্রীয় সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডায় পরিণত করতে হবে। জনগণকে বুঝতে হবে নিরাপদ ও সুষম খাদ্য প্রাপ্তি তার মৌলিক অধিকার। তাই নিরাপদ ও সুষম খাদ্য প্রাপ্তিতে নিজেদের স্বার্থে সরকারের পাশাপাশি সামাজিক ভাবে সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও কলাম লেখক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

