মুরাদ নূর, ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে কিছু নাম উচ্চারিত হয় উচ্চকণ্ঠে, আবার কিছু মানুষ নীরব অথচ গভীর প্রভাব রেখে যান ইতিহাসের পাতায়। আতাউর রহমান ঢালী সেই বিরল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের একজন, যার জীবন কেবল রাজনীতির আনুষ্ঠানিক পদ-পদবিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং আন্দোলন, ত্যাগ, আদর্শ ও সাংস্কৃতিক বোধের এক দীর্ঘ অভিযাত্রা।
ষাটের দশকে বিশ্ব রাজনীতিতে বাম আন্দোলনের প্রভাব তাকেও আন্দোলিত করে। তখনকার সময়ে যখন ফ্রান্স, জাপান, থাইল্যান্ড, ভারত, ইন্দোনেশিয়া সহ অনেক দেশে বাম আন্দোলনের ঝড় বয়ে যায়; তখন তিনিও সেই আন্দোলনে আলোড়িত হোন।
যুক্ত হোন বাম রাজনীতিতে। ছাত্রজীবন থেকেই আতাউর রহমান ঢালী ছিলেন গণমানুষের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। দেশের বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলন, ছাত্র অধিকার আদায় এবং জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দর্শনের পক্ষে তার দৃঢ় অবস্থান তাকে একজন ঐতিহাসিক ছাত্রনেতা হিসেবে পরিচিতি দেয়। সময়ের উত্তাল রাজপথ, আন্দোলনের মিছিল, রাজনৈতিক অস্থিরতা— সবকিছুর মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তুলেছেন নিজের রাজনৈতিক দর্শন ও সাংগঠনিক শক্তি। তার রাজনীতি ছিলো ব্যক্তি কেন্দ্রিক নয়; বরং আদর্শ, গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রচিন্তার রাজনীতি।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় বহু নেতা সময়ের সঙ্গে অবস্থান বদলেছেন, সুবিধাবাদী হয়েছেন, কিন্তু আতাউর রহমান ঢালী ছিলেন ব্যতিক্রম। বিএনপির চরম দুঃসময়ে তিনি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে যোগ দেন। তিনি দল ও আদর্শের প্রতি ছিলেন নিবেদিতপ্রাণ। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বহুবার জেল-জুলুম, হয়রানি ও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। বিশেষ করে বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনামলে তাঁর মতো প্রবীণ নেতাদের ওপর যে দমন-পীড়ন নেমে এসেছিল, তা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের এক বেদনাদায়ক অধ্যায়। কিন্তু দুঃসময় তাকে ভাঙতে পারেনি; বরং তার অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে।
বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র চেয়ারম্যানের অন্যতম উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এই পদ কেবল একটি সাংগঠনিক পরিচয় নয়; এটি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, প্রজ্ঞা ও গ্রহণযোগ্যতার স্বীকৃতি। দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তার মতো অভিজ্ঞ নেতার উপস্থিতি নিঃসন্দেহে বিএনপিকে সমৃদ্ধ করছে। তবে রাজনৈতিক সচেতন মহলের একটি বড় প্রত্যাশা—এমন অভিজ্ঞ, পরীক্ষিত ও সাংস্কৃতিক বোধসম্পন্ন নেতাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে সম্পৃক্ত করা। বর্তমান বিএনপি সরকার তা করছে কি?
আতাউর রহমান ঢালীর রাজনৈতিক শক্তির অন্যতম দিক হলো তার ইতিহাসচেতনা ও সংস্কৃতিবোধ। তিনি শুধু রাজনীতির মানুষ নন; তিনি সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বাঙালির ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধের প্রতিও গভীর অনুরাগী। রাজনৈতিক বক্তব্যে তার ভাষা যেমন পরিমিত ও যুক্তিনির্ভর, তেমনি ব্যক্তি আচরণে রয়েছে বিনয়, সৌজন্য ও প্রজ্ঞার পরিচ্ছন্ন প্রকাশ। বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় যেখানে অস্থিরতা, কাদা ছোড়াছুড়ি ও ব্যক্তিগত আক্রমণ প্রায় স্বাভাবিক হয়ে উঠেছে, সেখানে ঢালী সাহেবের মতো মার্জিত ও চিন্তাশীল নেতারা রাজনীতিকে দিতে পারেন নতুন ভারসাম্য।
একটি রাজনৈতিক দল তখনই পরিপূর্ণতা পায়, যখন সেখানে তরুণদের উদ্যমের পাশাপাশি প্রবীণদের অভিজ্ঞতারও যথাযথ মূল্যায়ন হয়। বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসে আতাউর রহমান ঢালীর মতো নেতারা হচ্ছেন সেইসব বৃক্ষ, যাদের শিকড়ে জমে আছে দলের ত্যাগ, সংগ্রাম ও আদর্শের স্মৃতি। তাদের অভিজ্ঞতা কেবল অতীতের স্মারক নয়; বরং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। কৌশল কখনোই অভিজ্ঞতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।
আজ দেশের মানুষ এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করে, যেখানে রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, সাংস্কৃতিক সচেতনতা, সহনশীলতা, মানবিকতা ও রাষ্ট্রদর্শনের সমন্বয় থাকবে। সেই বিবেচনায় আতাউর রহমান ঢালীর মতো নেতাদের সরকার পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ অংশে সম্পৃক্ত করা হলে তা বিএনপির রাজনৈতিক পরিপক্বতা ও দূরদর্শিতারই প্রতিফলন হবে। এতে কেবল একজন প্রবীণ নেতার সম্মান রক্ষা হবে না; বরং রাষ্ট্রও উপকৃত হবে তার অভিজ্ঞতা, মেধা ও দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রজ্ঞা থেকে।
কারণ ইতিহাস সাক্ষী— ত্যাগী মানুষেরা কখনো কেবল ব্যক্তি হয়ে থাকেন না, তারা হয়ে ওঠেন সময়ের প্রয়োজন। আর আতাউর রহমান ঢালী নিঃসন্দেহে তেমনই এক সময়সচেতন, আদর্শনিষ্ঠ ও সমৃদ্ধ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যাঁর অভিজ্ঞতার আলো বাংলাদেশের রাজনীতিকে আরও পরিণত ও মানবিক করে তুলতে পারে।
লেখক: সংস্কৃতিজন ও সুরকার।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

