Logo

মতামত

মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু এবং আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব

Icon

মূহাম্মদ নূরুল আলম

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১৯:০৬

মায়ের নিঃসঙ্গ মৃত্যু এবং আমাদের নৈতিক দেউলিয়াত্ব

মূহাম্মদ নূরুল আলম, ছবি: সংগৃহীত

একজন মা মৃত্যুর পর সাত দিন ধরে ঘরের মধ্যে পড়ে ছিলেন। সময়ের ব্যবধানে তার দেহ পচে গলে গেছে। চারপাশের মানুষ দুর্গন্ধ পেয়ে বিষয়টি জানতে পেরেছে। এই সংবাদ পড়ে শুধু বিস্মিত হওয়া যায় না; বিবেকের গভীরতম স্তর পর্যন্ত কেঁপে ওঠে। প্রশ্ন জাগে এ কেমন সমাজ আমরা গড়ে তুলছি? এ কেমন শিক্ষা আমরা আমাদের সন্তানদের দিচ্ছি?

যে নারী একদিন সন্তানকে দশ মাস দশ দিন গর্ভে ধারণ করেছেন, রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটিয়েছেন, নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, সেই মায়ের মৃত্যুর পর দিনের পর দিন তার খোঁজ নেওয়ার মতো কেউ নেই এর চেয়ে বড় মানবিক বিপর্যয় আর কী হতে পারে?

আজ আমরা শিক্ষার হার বৃদ্ধির পরিসংখ্যান নিয়ে গর্ব করি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ছে, উচ্চ ডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, প্রযুক্তিগত উৎকর্ষ বাড়ছে। কিন্তু একই সঙ্গে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতাও সামনে আসছে মানবিকতা, পারিবারিক বন্ধন এবং নৈতিক দায়িত্ববোধ যেন ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমরা জ্ঞানের প্রসার ঘটাচ্ছি, কিন্তু প্রজ্ঞার নয়; আমরা পেশাজীবী তৈরি করছি, কিন্তু মানুষ তৈরির কাজে পিছিয়ে পড়ছি।

এ কথা সত্য যে একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার জন্য পুরো সমাজকে দায়ী করা যায় না। অনেক সন্তান আজও তাদের পিতা-মাতার সেবায় জীবন উৎসর্গ করেন। কিন্তু এমন মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের সামনে একটি বড় প্রশ্ন তুলে ধরে আমাদের শিক্ষা কি শুধু কর্মজীবনের প্রস্তুতি, নাকি জীবনবোধেরও শিক্ষা?

ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানুষকে মানবিক করে তোলা। ধর্ম মানুষকে শেখায় দায়িত্ব, কৃতজ্ঞতা, মমতা ও জবাবদিহি। নৈতিক শিক্ষা শেখায় অন্যের কষ্ট অনুভব করতে, দুর্বল ও অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াতে। যখন এসব মূল্যবোধ পারিবারিক ও সামাজিক জীবন থেকে দুর্বল হয়ে যায়, তখন মানুষ বাহ্যিক সাফল্য অর্জন করলেও অন্তরে শূন্যতা তৈরি হয়।

আধুনিক জীবনের ব্যস্ততা, নগরায়ণ, একক পরিবারব্যবস্থা এবং ভোগবাদী সংস্কৃতিও এ সংকটকে ত্বরান্বিত করছে। আত্মকেন্দ্রিকতার প্রবণতা মানুষকে নিজের পরিবার ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিচ্ছে। অনেকেই মনে করছেন অর্থনৈতিক সাফল্যই জীবনের চূড়ান্ত অর্জন। অথচ ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, মানবিক মূল্যবোধ ছাড়া কোনো সমাজ দীর্ঘস্থায়ী মর্যাদা লাভ করতে পারেনি।

একটি সভ্য জাতির মানদণ্ড তার সুউচ্চ ভবন, আধুনিক প্রযুক্তি কিংবা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নয়; বরং সে জাতি তার প্রবীণ, অসহায় ও বয়োজ্যেষ্ঠ নাগরিকদের কতটা সম্মান ও নিরাপত্তা দেয়, তার ওপরই প্রকৃত সভ্যতার পরিচয় নির্ভর করে। যে সমাজে একজন মা নিঃসঙ্গ অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন এবং দিনের পর দিন তার খোঁজ নেওয়ার কেউ থাকে না, সে সমাজের আত্মসমালোচনা করা জরুরি।

আজ আমাদের সন্তানদের শুধু প্রতিযোগিতায় জয়ী হওয়া নয়, মানবিক হওয়াও শেখাতে হবে। শুধু ক্যারিয়ার নয়, চরিত্রও গঠন করতে হবে। শুধু সফলতা নয়, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধও শিক্ষা দিতে হবে। কারণ একজন মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার ডিগ্রিতে নয়, বরং সে তার পিতা-মাতা, পরিবার ও সমাজের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল সেখানেই নিহিত।

মায়ের সেই নিঃসঙ্গ মৃত্যু আমাদের জন্য একটি সংবাদ নয়, একটি আয়না। সেই আয়নায় আমরা আমাদের সমাজের মূল্যবোধের অবক্ষয়, পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতা এবং নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি দেখতে পাই। এই আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যদি আমরা নিজেদের সংশোধন করতে না পারি, তবে ভবিষ্যতে আরও অনেক করুণ সংবাদ আমাদের বিবেককে প্রশ্নবিদ্ধ করবে।

সময় এখনই উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি মানবিক, নৈতিক ও পারিবারিক শিক্ষাকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার। কারণ মানুষ তৈরির শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতির উন্নয়নই পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।

লেখক: লিগেল কনসালটেন্ট, পরিচালক-বিসিএস অদিতি ক্যারিয়ার।

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন