পরিবেশ রক্ষায় বিশেষায়িত পুলিশ ইউনিট: সময়োপযোগী উদ্যোগ
ড. এম. এ সোবহান, পিপিএম
প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ১৯:০৯
ড. এম. এ সোবহান, ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান বিশ্বে পরিবেশ দূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তন মানবসভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। বায়ু, পানি, মাটি, বন, পাহাড়, জলাভূমি এবং জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ শুধু পরিবেশের ভারসাম্যই নষ্ট করছে না, বরং মানুষের জীবন ও জীবিকাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। এই বাস্তবতায় পরিবেশ সংরক্ষণে কার্যকর আইন প্রয়োগ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত অপরাধ দমনের লক্ষ্যে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত ‘পরিবেশ পুলিশ’ ইউনিট গঠনের প্রয়োজনীয়তা ক্রমেই গুরুত্ব পাচ্ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশ সুরক্ষায় বিশেষায়িত পুলিশ বা আইন প্রয়োগকারী ইউনিট সফলভাবে কাজ করছে। বাংলাদেশেও পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পরিবেশ আদালত এবং বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠন পরিবেশ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে পরিবেশগত অপরাধ শনাক্তকরণ, তথ্যভিত্তিক নজরদারি, তদন্ত এবং আইন প্রয়োগকে আরও কার্যকর করতে পরিবেশ পুলিশের মতো একটি বিশেষায়িত ইউনিট গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।
পরিবেশ পুলিশ দেশের শিল্প-কারখানা, ইটভাটা, যানবাহন, শব্দ দূষণকারী প্রতিষ্ঠান এবং দূষণ সৃষ্টিকারী বিভিন্ন উৎসের ওপর জরিপ পরিচালনা করে একটি সমন্বিত তথ্যভাণ্ডার গড়ে তুলতে পারে। শিল্প প্রতিষ্ঠানে পরিবেশবান্ধব বর্জ্য শোধনাগার (ইটিপি) রয়েছে কি না, দূষণের মাত্রা আইনসম্মত সীমার মধ্যে আছে কি না এবং কোথা থেকে কী ধরনের দূষণ হচ্ছে-এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ, বিশ্লেষণ ও পর্যবেক্ষণ তাদের দায়িত্বের অংশ হতে পারে।
শুধু আইন প্রয়োগ নয়, পরিবেশ পুলিশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হতে পারে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড় সমন্বয় গড়ে তোলা। শিল্প মালিক, বিজ্ঞানী, পরিবেশবিদ, স্থানীয় জনগণ, সাংবাদিক এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে পরিবেশগত সমস্যার উৎস শনাক্ত ও সমাধানের পথ খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।
বাংলাদেশে পরিবহন, বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্প এবং আবাসিক খাত থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হয়। পরিবেশ পুলিশ দূষণের উৎস শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহিত করতে পারে এবং প্রয়োজনে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশ সুরক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিবেশগত অপরাধ দমনে বিশেষায়িত এই ইউনিট তথ্য সংগ্রহ, গোয়েন্দা কার্যক্রম পরিচালনা, মামলা দায়ের, তদন্তে সহায়তা এবং আদালতে প্রমাণ উপস্থাপনের মতো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হবে। পরিবেশ দূষণ, বন উজাড়, পাহাড় কাটা, জলাশয় ভরাট কিংবা বন্যপ্রাণী পাচারের মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে পরিবেশগত সুশাসন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
বন ও পাহাড় সংরক্ষণেও পরিবেশ পুলিশের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। বনাঞ্চলে অগ্নিসংযোগ, অবৈধ বৃক্ষনিধন, পাহাড় কাটা এবং পাহাড়ি জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মতো কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে তারা সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি আইন প্রয়োগ করতে পারে। একইভাবে কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহার করে ইট উৎপাদন, অতিরিক্ত রাসায়নিক সার প্রয়োগ এবং মৃত্তিকার অবক্ষয় রোধেও পরিবেশ পুলিশ কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বায়ু দূষণ বর্তমানে বাংলাদেশের অন্যতম বড় পরিবেশগত সমস্যা। ইটভাটা, পুরোনো যানবাহন, শিল্পকারখানা এবং নির্মাণকাজ থেকে সৃষ্ট ধুলা ও ধোঁয়া নগরজীবনকে বিপর্যস্ত করছে। পরিবেশ পুলিশ দূষণকারী উৎসগুলো শনাক্ত করে নিয়মিত নজরদারি এবং আইনগত ব্যবস্থার মাধ্যমে বায়ুর মান উন্নয়নে সহায়তা করতে পারে।
পানি দূষণ রোধেও পরিবেশ পুলিশের ভূমিকা অপরিহার্য। শিল্পবর্জ্য, গৃহস্থালি বর্জ্য, রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের কারণে নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ের পানির গুণগত মান হ্রাস পাচ্ছে। জলজ প্রাণী ও মানবস্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর এই দূষণ প্রতিরোধে পরিবেশ পুলিশ তদারকি, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কার্যকর অবদান রাখতে পারে।
এ ছাড়া শব্দ দূষণ নিয়ন্ত্রণ, জলাভূমি ও নিচু ভূমি রক্ষা, বিপন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদ সংরক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়ন এবং পরিবেশবান্ধব শিল্পায়ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও পরিবেশ পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। বিশেষ করে বন্যপ্রাণী পাচার, অবৈধ শিকার এবং জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারি দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় সহায়ক হবে।
পরিবেশ সংরক্ষণ কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়; এটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেরও অংশ। পরিবেশ পুলিশ জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম, পথসভা, প্রচারপত্র বিতরণ এবং সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখতে পারে। এতে পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব শুধু রাষ্ট্রের নয়, বরং সমগ্র সমাজের একটি যৌথ অঙ্গীকারে পরিণত হবে।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসের এই প্রেক্ষাপটে বলা যায়, পরিবেশগত অপরাধ দমন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে একটি বিশেষায়িত পরিবেশ পুলিশ ইউনিট গঠন সময়োপযোগী ও কার্যকর উদ্যোগ হতে পারে। সকল অংশীজনের সমন্বিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করা গেলে আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ, সবুজ ও বাসযোগ্য বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
লেখক : ডিআইজি, পুলিশ স্টাফ কলেজ বাংলাদেশ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

