অলোক আচার্য, ছবি: সংগৃহীত
পরিবেশ দিবস পালন যেন নিয়মের উৎসবে পরিণত হয়েছে। সারা বিশ্ব ব্যাপী মহা সমারোহে পরিবেশ দিবস পালন করা হবে এবং অন্যদিকে পরিবেশ ধ্বংস করার মহোৎসব চলবে। প্রতি বছর ঘটা করে জলবায়ু সম্মেলন আয়োজন করা হবে, প্রতিশ্রুতি দেওয়া হবে তারপর সব ভুলে যাবে! মোটামুটি এটাই রীতিতে পরিণত হয়েছে। অথচ পরিবেশের সাথে প্রতিটি দেশের অর্থনীতি ঘনিষ্টভাবে সম্পর্কযুক্ত। সব কথা ছাপিয়ে এখন সবুজ অর্থনীতি কথাটি খুব ব্যাবহৃত হচ্ছে। সবুজ অর্থনীতি শব্দদ্বয় মূলত সবুজ পরিবেশের সাথে যুক্ত।
শিল্প উন্নয়নের এই যুগে আমরা প্রকৃতি ধ্বংস করে নানা ধরনের শিল্পকারখানা নির্মাণ করছি, প্রকৃতির পাশাপাশি যার বিরূপ প্রভাব পড়ছে আমাদের অর্থনীতির উপরও। আমরা নদ-নদী ভরাট করছি, বন-জঙ্গল কেটে সাফ করছি যা অর্থনীতিকে দুর্বল করছে। অর্থনীতির বৈচিত্র্যপূর্ণ খাতগুলিকে দুর্বল করে শিল্পমুখী অর্থনীতি গড়ে তোলার যে অশুভ প্রয়াস সবুজ অর্থনীতির ধারণাটি সেই ধারণার বিপরীত। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা প্রকৃতির সঙ্গে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছেন। তারা বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে দেখিয়েছেন, কীভাবে প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
অর্থনীতির সঙ্গে পরিবেশকে সম্পৃক্ত করার এই নতুন ধারণাকেই বলা হচ্ছে ‘সবুজ অর্থনীতি’। সহজভাবে বলা যায়, প্রকৃতিকে সঙ্গে নিয়ে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিই সবুজ অর্থনীতি। এটি এমন এক নিরাপদ অর্থনীতি যা মানুষের উন্নয়ন নিশ্চিত করবে এবং একই সঙ্গে পরিবেশেরও কোনো ক্ষতি করবে না, পরিবেশগত বিভিন্ন ঝুঁকি কমাবে এবং অর্থনৈতিক উন্নতি সাধন করবে। বাংলাদেশের মতো জলবায়ুর বিরূপ প্রভাবে ঝুঁকিতে থাকা ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য এটি কেবল পরিবেশ রক্ষার উপায় নয় বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা বজায় রাখার মূল চাবিকাঠি। ২০২২ সালে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের উন্নয়ন বিষয়ক একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সংস্থাটি প্রতিবেদনটির শিরোনাম দিয়েছিল, ‘ক্রিয়েটিং আ গ্রিন অ্যান্ড সাসটেইনেবল গ্রোথ পাথ ফর বাংলাদেশ’।
এ প্রতিবেদন বলছে, পরিবেশের অবনমনের কারণে প্রতি বছর বাংলাদেশ ৬৫০ কোটি ডলার অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। যা বাংলাদেশের বার্ষিক জিডিপি’র প্রায় ৩ দশমিক ৪ শতাংশ। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, বাংলাদেশে মোট মৃত্যুর ২৮ শতাংশ সংঘটিত হয় পানি এবং বায়ুদূষণের কারণে। সর্বাধিক দূষিত ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম। পরবর্তীতে এই তালিকায় বাংলাদেশের আরও অবনমন ঘটে। বিশ্বব্যাংকের আরেক প্রতিবেদন মতে, ২০১৯ সালে পরিবেশ দূষণের কারণে স্বাস্থ্যখাতে ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪.৪ ট্রিলিয়ন টাকা, যা জিডিপি’র প্রায় ১৭.৩ শতাংশ।
কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার প্রণীত ন্যাশনাল ডিটারমাইন্ড কন্ট্রিবিউশন (২০২২) অনুযায়ী ২০১২ সালে বাংলাদেশে সর্বমোট গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ছিল ১৬৯.০৫ মিলিয়ন টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি অবদান জ্বালানি খাতের ৫৫.০৭ শতাংশ, এরপরে আছে কৃষি, বনভূমি ও জমির ব্যবহারসংক্রান্ত ২৭.৩৫ শতাংশ, বর্জ্য তৈরির মাধ্যমে ১৪.২৬ শতাংশ ও শিল্প খাত ৩.৩২ শতাংশ। এই ডকুমেন্ট অনুযায়ী বাংলাদেশের গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন ২০১২ সালের ১৬৯.০৫ মিলিয়ন টন থেকে ২০৩০ সালে ৪০৯.৪ মিলিয়ন টনে পৌঁছানোর কথা; যার মধ্যে ৩১২.৫৪ মিলিয়ন টনই জ্বালানি খাতে। বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শর্তহীনভাবে ২০৩০ সালের মধ্যে ২৭.৫৬ মিলিয়ন টন (৬.৭৩ শতাংশ) গ্রিনহাউজ গ্যাস কমানোর কথা, যার মধ্যে জ্বালানি খাতের অবদান ৯৫.৪ শতাংশ। অন্যদিকে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া সাপেক্ষে আরও ৬১.৯ মিলিয়ন টন গ্রিনহাউজ গ্যাস নির্গমন কমানোর কথা। সরকারের এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অন্যতম উপায়ও হচ্ছে সবুজ অর্থনীতিতে রূপান্তর।
পরিবেশ এখন নানামুখী সমস্যায় আক্রান্ত। পরিবেশ সুস্থ রাখতে মুখে যতটা বুলি আওড়ানো হয়, কাজ হয় তার শত ভাগের একভাগ মাত্র! অথচ হওয়ার কথা ছিল উল্টোটা। পৃথিবী বসবাসের অযোগ্য হয়ে যাচ্ছে জেনেও আমরা চুপচাপ বসে আছি। পৃথিবীকে ধ্বংস করার মহা আয়োজন করছি। এবার আসা যাক পরিবেশ যদি যুতসই অর্থাৎ সবুজ এবং গ্রহণযোগ্য হয় তাহলে কিভাবে তা অর্থনীতিকে দৃঢ় করতে পারে সেই বিষয়ে। পরিবেশের সাথে অর্থনীতির সরাসরি শক্তিশালী সম্পর্ক রয়েছে। এই যে প্রচুর শিল্প কারখানা গড়ে উঠেছে এসব থেকে দূষণের সবগুলোই ব্যাপক হারে নির্গমন হচ্ছে। প্রতিদিন শ্বাস নেয়া থেকে শুরু করে আমাদের খাদ্য সবকিছুতেই এর প্রভাব রয়েছে। এসব আমাদের শরীরকে অসুস্থ করছে। দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে দুশ্চিন্তার বড়ো কারণ হলো অসুস্থতা। হাসপাতাল, ক্লিনিকে গেলে দেখা যায় কি বিপুল সংখ্যক মানুষ প্রতিদিন জটিল রোগের সেবা নিতে ভিড় করছে। অসুস্থ মানুষ অর্থনীতিতে অবদান রাখতে পারে না। ফলে অর্থনীতি পিছিয়ে পরছে। আমাদের গার্মেন্টস সেক্টর ইতিমধ্যে সেই সুনাম অর্জন করেছে। দেশে বাড়ছে সবুজ কারখানার সংখ্যা। এই যে সবুজ কারখানা ধারণাটি এটির সাথেও অর্থনীতি জড়িয়ে আছে। ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, আপনি যখন আপনার কর্মপরিবেশে প্রকৃতিকে খুঁজে পাবেন, স্বাভাবিকভাবে সেটি আপানর মনে প্রভাব ফেলবে। কর্মশক্তি বৃদ্ধি পাবে, স্পৃহা বৃদ্ধি পাবে এবং কাজের গতিও বাড়বে। এর ফলে সেই কারখানার উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে। সবুজ কারখানা সরাসরি অর্থনীতির সাথে সম্পৃক্ত। তবে এটি শুধু একটি শ্রেণির কারখানার উপর নির্ভর করছে না। সব কারখানাতেই সবুজের ব্যবহার আনতে হবে।
সবুজ অর্থনীতির মূল লক্ষ্য হলো কার্বন নিঃসরণ কমানো, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা। আর এই অর্থনীতিতে এগিয়ে আসছে বিশ্বে বড় বড় আর্থিক সংস্থাগুলো। ১৯৯১ সালে, নেদারল্যান্ডসের ট্রায়োডস ব্যাংক প্রথমবারের মতো পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগ শুরু করে। এরপর ২০০৭ সালে ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক (ইআইবি) প্রথম ‘সবুজ বন্ড’ ইস্যু করে, যা নবায়নযোগ্য শক্তি ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য তৈরি হয়। ২০০৮ সালে বিশ্বব্যাংক প্রথমবারের মতো সবুজ বন্ড ইস্যু করে, যা গ্রিন ফাইন্যান্সের বিশ্বব্যাপী প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরবর্তী সময়ে ২০১৫ সালে প্যারিস জলবায়ু চুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সবুজ বিনিয়োগের গুরুত্ব বাড়ে।
পৃথিবীতে পরিবেশের বিপর্যয়ের ফলে যা ঘটছে সেটি প্রলয়ঙ্করী। তীব্র খরা, তীব্র বৃষ্টিপাত, তীব্র ভূমিধ্বস বা সুনামি ও সাইক্লোনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটছে ঘন ঘন। এসব খুব ঘন ঘন ঘটার কারণে আমাদের অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। বিশ্বের সাপলাই চেইন নষ্ট হচ্ছে। পরিবেশের একটি উপাদান নষ্ট হলে পরিবেশ সংকুচিত হয়। সেখানে আমরা পরিবেশে প্রায় সব উপাদানকে নিজেদের মতো করে নষ্ট করছি। পৃথিবীর একপাশে তীব্র পানির সংকট তো অন্যপাশে খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে।
পৃথিবীতে বেড়ে চলেছে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্যাসের মাত্রা। ফলে তাপমাত্রা বাড়চ্ছে। গলছে হিমবাহ দ্রুত গতিতে। গবেষকেরা সতর্ক করেছেন, আগামী বছরগুলোতে পূর্বানুমানের চেয়ে বেশি দ্রুতগতিতে হিমবাহ গলতে পারে এবং এতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যেতে পারে। গত বুধবার নেচার সাময়িকীতে এ-সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দশকে হিমবাহ গলার হার উলে¬খযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০০০ থেকে ২০১১ সালের মধ্যে যে হারে হিমবাহ গলেছে, সে তুলনায় ২০১২ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে প্রায় ৩৬ শতাংশ বেশি গলেছে।
জলবায়ু পরিবর্তনের চক্রে ২০২৫ থেকে ২০২৯ সালের মধ্যে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে। জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ু বিষয়ক সংস্থা ওয়ার্ল্ড মেটিওরোলজিক্যাল অর্গানাইজেশনের (ডবি¬উএমও) বার্ষিক জলবায়ু প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। ২০১৫ সালের পর ১১টি বছর ছিল এ পযন্ত রেকর্ড করা সবচেয়ে উষ্ণ বছর এবং এই প্রবণতা অব্যাহত থাকবে। এমনকি ২০৩১ সালের আগেই নতুন করে সবচেয়ে উষ্ণ বছরের রেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও রয়েছে। ডব্লিউএমও-এর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে পাঁচ বছরের গড় বৈশ্বিক তাপমাত্রা প্রাক-শিল্প যুগের (১৮৫০-১৯০০) তুলনায় ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হওয়ার সম্ভাবনা ৭৫ শতাংশ। একই সময়ে অন্তত এক বছর ২০২৪ সালের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে উষ্ণ বছর হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৮৬ শতাংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ প্রতিবছর প্রাকৃতিক দুর্যোগ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা সমস্যায় ক্ষতিগ্রস্থহয়। সবুজ অর্থায়নের মাধ্যমে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তি ব্যবহারে উৎসাহ প্রদান করে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব। ফলে বাংলাদেশের জন্য সবুজ অর্থনীতি কেবল একটি বিকল্প নয়। এটি একটি জাতীয় প্রয়োজনে পরিণত হয়েছে। শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্যই নয়, বরং একটি দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং টেকসই জাতীয় উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্যও সবুজ অর্থনীতি গ্রহণ করা অপরিহার্য।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

