ছবি: সংগৃহীত
সমালোচনাকে বলা হয় সাহিত্যের সর্বোচ্চ স্তর ও পরম এক শিল্প মাধ্যম। একটি সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের চুলচেরা বিশ্লেষণ করে তার গুণাগুণ ও সীমাবদ্ধতা তুলে ধরাই এই মাধ্যমের কাজ। তবে সমকালীন সাহিত্যচর্চার গতিপ্রকৃতি ও গুণগত মান লক্ষ করলে দেখা যায়, গঠনমূলক সমালোচনার চেয়েও এখন বেশি প্রয়োজন আত্মোপলব্ধি ও ভাষার শুদ্ধতার দিকে নজর দেওয়া। একজন সাধারণ পাঠকের দৃষ্টিতেও যখন চারপাশের সাহিত্য পরিমণ্ডলের অজস্র অসঙ্গতি ধরা পড়ে, তখন সেই বিকৃতি নিয়ে কথা বলা কোনো ব্যক্তিগত আক্ষেপ থাকে না, তা হয়ে ওঠে নাগরিক ও সামাজিক দায়বদ্ধতা। বর্তমান প্রকাশনা জগতে ছাপা অক্ষরের যে চরম অবমূল্যায়ন চলছে, তা নিয়ে সামষ্টিক আত্মসমালোচনার সময় এসেছে।
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রে ছাপা অক্ষরের গুরুত্ব ও মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। যেকোনো চিন্তাশীল লেখা যখন কাগজে মুদ্রিত আকারে প্রকাশ পায়, তখন তা স্থায়িত্ব লাভ করে এবং পাঠকসমাজে তার গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হয়। এই কারণেই ছাপা অক্ষরের প্রতি প্রকাশক, সম্পাদক ও লেখকদের সর্বোচ্চ মাত্রায় যত্নবান ও সংবেদনশীল হওয়া উচিত। কিন্তু সমকালীন প্রকাশনা শিল্পের দিকে তাকালে এক হতাশাজনক চিত্র ফুটে ওঠে। অক্ষরের মর্যাদা রক্ষার চেয়ে যেকোনো উপায়ে নিজেকে জাহির করা এবং সস্তা আত্মপ্রচারের এক অন্ধ মোহ গ্রাস করেছে সংশ্লিষ্টদের। এই আত্মকেন্দ্রিক ও দায়সারা মনোভাবের কারণে সমাজ উন্নতমানের সাহিত্য সৃষ্টি থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, যার ফলে নতুন প্রজন্ম প্রতিনিয়ত ভুল ও বিকৃত ভাষা শিখছে।
আমাদের সামাজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার শীর্ষস্থানে যারা অধিষ্ঠিত, তাদের অনেকের মধ্যেই বাংলা বানানের প্রতি চরম উদাসীনতা লক্ষ্য করা যায়। এই গাফিলতির প্রভাব অত্যন্ত সংক্রামক। প্রতিদিন একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের সাইনবোর্ড, নামফলক কিংবা সরকারি-বেসরকারি ব্যানারে অজস্র বানান ভুল চোখে পড়ে। এমনকি বাঙালির জাতীয় আবেগের জায়গা, মহান ভাষা দিবসের ব্যানারেও যখন ভুল বানানে ‘শ্রদ্ধাঞ্জলী’ লেখা থাকে, তখন তা ভাষার জন্য জীবন দেওয়া শহীদদের প্রতি চরম অবমাননা প্রদর্শন করে। ব্যাকরণগত নিয়ম অনুযায়ী ‘শ্রদ্ধাঞ্জলি’ লেখাটিই শুদ্ধ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, চারপাশের এই প্রকাশ্য ভুলগুলো দেখতে দেখতে সাধারণ মানুষের অবচেতনে তা গেঁথে যাচ্ছে। মানুষ ভুলটাকেই একসময় শুদ্ধ বলে ধরে নিচ্ছে, যার ফলে সমাজ থেকে ভাষার মৌলিক শুদ্ধতা ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে।
বানান ভুলের এই সংক্রামক ব্যাধি শুধু সাইনবোর্ড বা ব্যানারে সীমাবদ্ধ নেই; তা অবলীলায় হানা দিয়েছে প্রকাশনা শিল্পে, যা বানানের সবচাইতে বিশ্বস্ত ও শক্তিশালী মাধ্যম। বইয়ের পাতায় মুদ্রিত শব্দকে সাধারণ পাঠক প্রামাণিক বলে মনে করে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের আনাচে-কানাচে গজিয়ে ওঠা হরেক রকমের প্রকাশনী থেকে প্রতিদিন যে অজস্র বই প্রকাশিত হচ্ছে, তার সিংহভাগই বানান ভুলে জর্জড়িত। মানুষের কাজে যান্ত্রিক বা অসতর্কতাবশত ভুল হতেই পারে, কিন্তু সেই ভুলেরও একটি পরিমার্জিত ও গ্রহণযোগ্য সীমা থাকা বাঞ্ছনীয়।
আজকাল দৃষ্টিনন্দন ও নান্দনিক প্রচ্ছদ, উন্নত মানের কাগজ আর ঝকঝকে বাঁধাইয়ের বই অহরহ বাজারে আসছে। বাহ্যিক এই চটকদার রূপ দেখে পাঠকরা আকৃষ্ট হলেও, ভেতরের পাতায় চোখ বোলাতেই অসংখ্য বানান ভুলের ধাক্কায়, পড়ার আনন্দ নিমিষেই কর্পূরের মতো উধাও হয়ে যায়। তখন সেই সৃজনশীল সৃষ্টিকে আর বই বলে মনে হয় না, মনে হয় বুকশেলফে সাজিয়ে রাখার মতো সস্তা কোনো শোপিস। মানহীন এবং ভুল বানানে ভরা এই বইগুলো আসলে সমাজকে ভুল শিক্ষা দেওয়ার একেকটি নীরব হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।
একটি বড় নামধারী সাহিত্য সংগঠন থেকে প্রকাশিত ৪৪০ পৃষ্ঠার একটি কবিতা সংকলনের উদাহরণ দেওয়া যাক। দেশ-বিদেশের কবিদের কবিতা নিয়ে সংকলনটি প্রকাশের উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ছিল। কিন্তু বইটিতে বানান ভুলের পরিমাণ এতই প্রকট ছিল যে, তা পুরো উদ্যোগটিকে কলঙ্কিত করেছে। এই প্রসঙ্গে উক্ত সম্পাদনা পরিষদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির বক্তব্য ছিল আরও হতাশাজনক। সময়ের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে তারা বানানের মতো সংবেদনশীল বিষয়কে অবহেলা করেছেন। সময় যদি একটি সাহিত্য সংকলনের হাজারো ভুলের কারণ হয়, তবে প্রতিদিন মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিশে প্রকাশিত হওয়া দৈনিক পত্রিকাগুলোর পাতায় তো একটিও শুদ্ধ বানান থাকার কথা ছিল না।
আসলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কাজ শেষ করা বা না করাটা দক্ষতার ওপর নির্ভর করে। পরীক্ষার হলে কোনো শিক্ষার্থীর যদি প্রশ্নের উত্তর জানা থাকে, তবে সে নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নিখুঁতভাবে পরীক্ষা শেষ করতে পারে। কিন্তু উত্তর জানা না থাকলে সময় দ্বিগুণ করে দিলেও খাতার পাতা নষ্ট করা ছাড়া কোনো উপায় থাকে না। সুতরাং, সম্পাদনার ক্ষেত্রে সময়ের অভাবের কথা বলা আসলে নিজের অযোগ্যতা ঢাকার একটি নিছক ও খোঁড়া অজুহাত। এই ধরনের অপেশাদার সম্পাদক ও প্রকাশকদের অহংকার এতটাই আকাশচুম্বী যে, তারা নিজেদের পরম পণ্ডিত ভাবেন এবং নিজেদের অজ্ঞতা বা সীমাবদ্ধতা কখনো কোনো অবস্থাতেই স্বীকার করতে চান না। নিজেদের অক্ষমতা স্বীকার করতে চাওয়ার এই লজ্জাবোধই মূলত সাহিত্যিক অবক্ষয়কে ত্বরান্বিত করছে।
শুধু বড় সংকলনই নয়, সমকালের লিটল ম্যাগাজিন বা ছোটকাগজগুলোর অবস্থাও একই রকম আশঙ্কাজনক। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই বইয়ের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় সম্পাদকের নিজের নামই একেক জায়গায় একেকভাবে মুদ্রিত হয়েছে। কোথাও নামের সংক্ষিপ্ত রূপ, কোথাও পূর্ণ রূপ, আবার কোথাও নামের আগে পেশাগত পদবি জুড়ে দেওয়া হয়েছে। একটি বইয়ের ভেতর সম্পাদকের নামের এই বহুরূপী বৈচিত্র যেমন হাস্যকর, তেমনি বিভ্রান্তিকর। এর পাশাপাশি পুরো বইটিতে কয়টি বানান ভুল আছে তা গণনা করার চেয়ে কয়টি শব্দ শুদ্ধ আছে, তা গণনা করা অনেক বেশি সহজ সাধ্য হয়ে দাঁড়ায়। বিরাম চিহ্নের ভুল ব্যবহারে এই সমস্ত বইয়ের সাহিত্যিক মান তলানিতে গিয়ে ঠেকে। উপরন্তু, নিজের নামের সাথে যত্রতত্র প্রাতিষ্ঠানিক পদবি ব্যবহার করে পুরো পেশাজীবী সমাজকে সামাজিক মর্যাদার দিক থেকে ছোট করা হয়। এইভাবে যত্রতত্র ও দায়সারা প্রকাশনা উৎসব চলতে থাকলে আগামী প্রজন্ম যে ভুলের এক বিশাল অতল সাগরে হাবুডুবু খাবে, তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই সস্তা প্রচারের মোহে মত্ত না হয়ে, জাতির বৃহত্তর কল্যাণের স্বার্থে এবং মেধার সুরক্ষায় এমন দায়িত্বহীন প্রকাশনা অবিলম্বে বন্ধ করা উচিত। সমাজে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার বা অবদান রাখার আরও বহু ক্ষেত্র রয়েছে। যে মানুষটি যে কাজে পারদর্শী, তার উচিত সেই কাজের মাধ্যমেই নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখা। একজন সফল ও আধুনিক কৃষকও সমাজের জন্য পরম গৌরবের পাত্র। নিজেকে জোর করে লেখক, প্রকাশক কিংবা সম্পাদক হিসেবেই সমাজে জাহির করতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে না। যে বিষয়ে ন্যূনতম জ্ঞান বা পড়াশোনা নেই, সেই ক্ষেত্র থেকে দূরে থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।
আমাদের সবারই উচিত প্রথমে কোনো একটি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান লাভ করা, পরিপক্ক হওয়া এবং তারপর তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা। অন্যথায়, এই মানহীন বইয়ের ভিড়ে জাতি অচিরেই মেধাশূন্য ও পঙ্গু হয়ে পড়বে। এই মরণব্যাধি থেকে সমাজ ও জাতিকে মুক্ত রাখতে হলে সামাজিক সচেতনতা যেমন জরুরি, ঠিক তেমনি প্রয়োজন কঠোর সরকারি আইন ও নীতিমালা। সম্পাদক ও প্রকাশকদের জন্য শুদ্ধ বানান, ভাষারীতি ও ব্যাকরণের ওপর একটি ন্যূনতম যোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে দেওয়া উচিত। এই যোগ্যতা যাচাইপূর্বক যদি সম্পাদনা ও বই প্রকাশের আইনি অনুমতি প্রদান করা হয়, তবেই এই ভুলের সংস্কৃতি থেকে সমাজ নিষ্কৃতি পাবে এবং একটি ভাষা-সচেতন ও রুচিবান জাতি গঠন সম্ভব হবে।
লেখক: কথাশিল্পী, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

