মাসুদ রানা, ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ‘পুশইন’ বা জোরপূর্বক মানুষ ঠেলে দেওয়ার ঘটনাগুলো এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক দুর্ঘটনা নয়। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশের বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) বিরুদ্ধে পুশইনের যেসব উপর্যুপরি অভিযোগ উঠেছে, তা আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মহলে গভীর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর কঠোর প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং সীমান্ত সংলগ্ন স্থানীয় জনগণের অতন্দ্র পাহারার কারণে অনেকগুলো চেষ্টা নস্যাৎ করা সম্ভব হয়েছে ঠিকই, তবে এই প্রবণতার পুনরাবৃত্তি একটি মৌলিক প্রশ্নকে সামনে নিয়ে এসেছেÑ পরিবর্তিত আঞ্চলিক ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের নিরাপত্তা অগ্রাধিকারগুলো কি আমূল পুনর্বিশ্লেষণের সময় আসেনি? নিরাপত্তা কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখাকে পাহারা দেওয়া নয়, বরং তা রাষ্ট্রের মনস্তাত্ত্বিক ও সার্বভৌম অস্তিত্বের সুরক্ষাকবচ। বর্তমান বাস্তবতায় সীমান্ত সুরক্ষার এই সনাতন ধারণাকে বদলে ফেলার তাগিদ দিচ্ছে চারপাশের অস্থির পরিবেশ।
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বর্তমানে ইতিহাসের অন্যতম এক জটিল ও অস্থির সময় পার করছে। একদিকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধ, জান্তা সরকারের পতনোন্মুখ দশা এবং বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলোর অনিয়ন্ত্রিত তৎপরতা বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকিতে ফেলছে। অন্যদিকে, ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নাগরিকত্ব আইন ও জাতীয় নাগরিক পঞ্জি সংক্রান্ত প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক তৎপরতা সীমান্ত এলাকায় এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ও জনসংখ্যাগত চাপ তৈরি করছে। এই দ্বিমুখী সংকটের মাঝে দাঁড়িয়ে সীমান্তে পুশইনের এই অভিযোগগুলোকে কেবল একটি দ্বিপক্ষীয় ‘আইনশৃঙ্খলা সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটি মূলত জাতীয় নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক আইন, মানবিক দায়বদ্ধতা এবং আঞ্চলিক কূটনীতির এক বহুমাত্রিক সমীকরণ।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত নিবিড় ও বহুমাত্রিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বাণিজ্য, আঞ্চলিক যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের অংশীদারত্বÑ সব মিলিয়ে দুই দেশের সম্পর্ককে দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতার অন্যতম স্তম্ভ বলা চলে। কিন্তু এই সুউচ্চ কূটনৈতিক সৌধের নিচে ‘সীমান্ত ইস্যু’ বরাবরই একটি রক্তাক্ত ও স্পর্শকাতর ক্ষত হিসেবে রয়ে গেছে। সীমান্তে অব্যাহতভাবে বেসামরিক নাগরিক হত্যা, কাঁটাতারের ওপারে নির্যাতন, চোরাচালান এবং বর্তমানের এই পুশইন বা জোরপূর্বক অনুপ্রবেশের ঘটনাগুলো দুই দেশের মধ্যকার ‘ঐতিহাসিক আস্থার’ পরিবেশকে বারবার প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে। একটি টেকসই বন্ধুত্বের পূর্বশর্ত হলো পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং একে অপরের সার্বভৌমত্বের প্রতি সংবেদনশীলতা। একতরফা কোনো পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত অংশীদারত্বকে দুর্বল করতে বাধ্য।
আন্তর্জাতিক আইনের অমোঘ নীতি অনুযায়ী, কোনো রাষ্ট্র একতরফা বা জোরপূর্বক অন্য কোনো স্বাধীন সার্বভৌম দেশের ভূখণ্ডে কোনো ব্যক্তিকে ঠেলে দিতে পারে না। কারো নাগরিকত্ব বা আইনি বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা সুনির্দিষ্ট কূটনৈতিক চ্যানেল, কনস্যুলার অ্যাকসেস এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয়ভাবে নিষ্পত্তি করতে হয়। সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া কেবল দুটি ভূখণ্ডের বিভাজন রেখা নয়; এটি দুটি রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতীক।
বাংলাদেশের উদ্বেগের সবচেয়ে বড় জায়গা হলো, যাদের সীমান্ত পার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, তাদের পরিচয় এবং জাতিগত অবস্থান সম্পূর্ণ কুয়াশাচ্ছন্ন। তারা কি আসলেই বাংলাদেশি, নাকি ভারতে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী কোনো জনগোষ্ঠী, কিংবা অন্য কোনো দেশের নাগরিকÑ তা যাচাই করার কোনো সুযোগ বাংলাদেশকে দেওয়া হচ্ছে না। পরিচয়হীন এই অনিয়ন্ত্রিত জনস্রোত যদি দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে, তবে তা মানবপাচার, আন্তর্জাতিক মাদক চোরাচালান, অস্ত্র ব্যবসা এবং আন্তঃসীমান্ত সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করবে।
এই সংকটের শুধু কৌশলগত দিক নয়, বরং মানবিক দিকটিকেও আমাদের এড়িয়ে যাওয়া উচিত হবে না। সীমান্তের দুই পাড়েই শতাব্দী প্রাচীন পারিবারিক বন্ধন, ভাষা, সংস্কৃতি ও আত্মীয়তার সম্পর্ক রয়েছে। ওপারে তাড়া খেয়ে এপারে ব্যারিকেডের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলো আসলে একবিংশ শতাব্দীর এক নির্মম ভূরাজনৈতিক খেলার শিকার। তাদের এই অনিশ্চিত জীবন ও মানবিক বিপর্যয়কে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি এবং মানবিক মর্যাদার আলোকে দেখতে হবে। তবে এই মানবিকতার দায় যেন কোনোভাবেই বাংলাদেশের ওপর এককভাবে চাপিয়ে দেওয়া না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রকে সতর্ক থাকতে হবে। প্রায় এক দশক ধরে মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে বাংলাদেশ ইতিমধ্যে তার মানবিকতার সর্বোচ্চ পরীক্ষা দিয়েছে। দেশের সীমিত সম্পদ ও বিপুল জনসংখ্যার ওপর নতুন কোনো জনসংখ্যাগত চাপ নেওয়ার সক্ষমতা বাংলাদেশের অর্থনীতি ও ভূগোলের নেই।
বর্তমান যুগের সীমান্ত নিরাপত্তা কেবল রাইফেলধারী জোয়ানদের টহল বা কাঁটাতারের বেড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলাদেশকে তার সীমান্ত ব্যবস্থাপনাকে দ্রুত ‘স্মার্ট’ ও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর করতে হবে। ড্রোন নজরদারি, থার্মাল ইমেজিং ক্যামেরা, স্মার্ট সেন্সর মনিটরিং সিস্টেম এবং রিয়েল-টাইম ডাটা অ্যানালিটিক্স-এর মাধ্যমে প্রতিটি ইঞ্চি সীমান্তকে ২৪ ঘণ্টা নজরদারির আওতায় আনা জরুরি। একই সঙ্গে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ ও পুশইনের আগাম তথ্য পাওয়ার জন্য কাউন্টার-ইন্টেলিজেন্স এবং সীমান্ত গোয়েন্দা সংস্থাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, সীমান্ত সংলগ্ন সাধারণ মানুষ কতটা অতন্দ্র প্রহরীর ভূমিকা পালন করতে পারে। তাই সীমান্তবর্তী স্থানীয় জনগণকে জাতীয় নিরাপত্তার অংশীদার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে এবং তাদের সচেতনতা ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, সীমান্ত নিরাপত্তা এখন আর কোনো একক বাহিনীর বিচ্ছিন্ন দায়িত্ব নয়, এটি সামগ্রিক জাতীয় নিরাপত্তা কাটামোর অবিচ্ছেদ্য অংশ। বর্তমান বিশ্বে নিরাপত্তার সংজ্ঞা বদলে গেছেÑ অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, খাদ্য নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কূটনৈতিক দক্ষতাই এখন একটি দেশের আসল শক্তি। সীমান্তে যদি দীর্ঘমেয়াদি অস্থিতিশীলতা বা উত্তেজনা বজায় থাকে, তবে তা দেশের বৈদেশিক বিনিয়োগ, বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক কানেক্টিভিটি পরিকল্পনার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
বাংলাদেশ বরাবরই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’Ñ এই নীতিতে বিশ্বাসী। কিন্তু এই শান্তির নীতি যেন কখনো দুর্বলতা হিসেবে গণ্য না হয়। বন্ধুরাষ্ট্রের সঙ্গে যেকোনো মতপার্থক্য আলোচনার টেবিলে, যৌথ তদন্তের মাধ্যমে এবং আস্থাবর্ধক পদক্ষেপের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। সীমান্তের এই চলমান উত্তেজনা ও আঞ্চলিক অনিশ্চয়তা মূলত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় দূরদর্শিতা, কূটনৈতিক প্রজ্ঞা এবং জাতীয় প্রস্তুতির এক কঠিন পরীক্ষা। একটি সুরক্ষিত, প্রযুক্তিগতভাবে আধুনিক এবং অভেদ্য সীমান্তই কেবল একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল ও আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভিত্তি রচনা করতে পারে। সময় এসেছে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তা কৌশলকে নতুন বাস্তবতার আলোকে ঢেলে সাজানোর।
লেখক: গণমাধ্যমকর্মী।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

