রফিক সুলায়মান, ছবি: সংগৃহীত
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতায় মুসলিম ঐতিহ্যের ব্যবহার এক গভীর অনুপ্রেরণার উৎস। তিনি ইসলামের সোনালী ইতিহাস, ঐতিহ্য, মহানবী (সা.), হজরত আলী (রা.), ওমর (রা.), কারবালার ট্র্যাজেডি এবং কোরআনের রূপক ব্যবহার করে তৎকালীন বাঙালি মুসলমানের মাঝে আত্মমর্যাদা ও মুক্তির চেতনা জাগিয়ে তুলেছিলেন। এক গীতিকবিতায় পারস্যের কবি হাফিজের একটি চরণ অবলম্বনে নজরুল সৃষ্টি করেছেন বিস্ময়কর পঙক্তিÑ ‘খোদার মসজিদ মূরত মন্দির ঈসায়ী দেউল এহুদখানায়।’ এই এক চরণে পৃথিবীর প্রায় সকল জাতি ও ধর্মের উল্লেখ করে তিনি আমাদের মতো নিবিড় ও গভীর পাঠকদেরকে বিস্মিত করেছেন।
বাংলাদেশ তথা উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে তার সাহিত্য ও চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক- এটি এখন আর নতুন কোনো কথা নয়। হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের রচনা অনুবাদের মাধ্যমে তিনি পারস্যকে নিয়ে এসেছেন আমাদের হৃদয়ের কাছাকাছি, তেমনি আমানুল্লাহ, ওমর ফারুক, খালেদ, নাম মোহাম্মদ বল, ফাতিহা ই ইয়াজদহম, কামাল পাশা ইত্যাদি কবিতায় মুসলিম বীর ও নবী মহম্মদের গুণ-কীর্তন করেছেন অবারিতভাবে। এসব কালজয়ী রচনায় তিনি ইসলামের প্রাথমিক যুগের বীরত্ব, ত্যাগ ও আদর্শ তুলে ধরেছেন। তিনি মুসলিম জাতির হৃত গৌরব ও আত্মসম্মান পুনরুদ্ধারের আহ্বান জানিয়েছেন। ভারত উপমহাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে আফগানিস্তান, ইরান, ইরাকের কারবালা, মিশর, এমনকি স্পেনে প্রতিষ্ঠিত মুসলিম ঐতিহ্যের রূপায়ন চমৎকারভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।
তার কাব্যসাহিত্যের এক বিরাট অংশজুড়ে আছেন হজরত মুহাম্মদ (সা.) ও আধ্যাত্মিকতা। নজরুলের অনেক গজল, গানের বাণী ও কবিতায় মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা ও স্তুতি প্রকাশ পেয়েছে। ‘মরুভাস্কর’ কাব্যে তিনি নবীর জীবনদর্শন ও মানবতার জয়গান গেয়েছেন। এছাড়া তার রচিত প্রায় ৩০০ গীতিকবিতার সিংহভাগজুড়ে আছে নবীবন্দনা, মক্কা, মদিনা, ফোরাতের বর্ণনা, আরবের পথ, মা ফাতেমার কথা, নবীমাতা আমিনার বয়ান। আছে দুধমা হালিমার কথাওÑ ‘আমিনা তোমার দুলালে আনিয়া আমি ভয়ে ভয়ে মরি/এ নহে মানুষ বুঝি ফেরেশ্তা আসিয়াছে রূপ ধরি।’
‘বাজলো কিরে ভোরের সানাই’ গীতিকবিতায় আজানের দর্শন নিয়ে বলতে গিয়ে তিনি মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা এবং স্পেনের মুসলিম বীরদের প্রসঙ্গ এনেছেন, তাদের শৌর্যবীর্যের কথা উচ্চারণ করেছেন দারুণ মুন্সিয়ানায়।
তীর্থ-পথিক্ দেশ-বিদেশের
র্আফাতে আজ জুট্ল কি ফের,
‘লা শরীক আল্লাহু’ মন্ত্রের
নাম্ল কি বান পাহাড় ‘তূরে’॥
আজকে আবার কা’বার পথে
ভিড় জমেছে প্রভাত হ’তে,
নামল কি ফের হাজার স্রোতে
‘হেরার’ জ্যোতি জগৎ জুড়ে॥
আবার ‘খালেদ’ ‘তারেক’ ‘মুসা’
আনল কি খুন-রঙিন ভূষা,
আস্ল ছুটে’ হাসীন ঊষা
নও-বেলালের শিঁরিন সুরে॥
সুফি দর্শনে মানুষের পার্থিব জীবন-যাপনও এমনি একটি সরাইখানা। নিদ্-মহলার ঘুমন্ত মানুষকে কিম্বা অজ্ঞানে নিমজ্জিত যাপিত জীবন থেকে জাগিয়ে তোলার জন্য ভোরের আজান, ভোরের সানাই হয়ে সচকিত করে তোলে। আজানের আহ্বানে সরাইখানার সহযাত্রীরা হাঁকে ‘বন্ধু জাগো’। সে আহ্বানে জেগে ওঠে জগৎ সংসার, যেন জাগরিত প্রাণ-পাখি তার অজ্ঞানতার নীড় ছেড়ে ধাবিত হয় আধ্যত্মিক গুলবাগীচার দিকে।
আজানের ভিতরে রয়েছে ইসলামী ধর্মদর্শনের প্রতি ভক্তি, আনুগত্য, জ্ঞান, গৌরব এবং ইতিহাস। কবি এই গানের আজানের ধ্বনির ভিতর এর সবকিছুরই সন্ধান করেছেন। তিনি আজানের ধ্বনিতে দেখতে পান- কাবা-রূপী মসজিদের পানে ছুটে যাওয়ার আধ্যাত্মিক আহ্বান, হেরা পর্বতের নির্জন গুহায় দ্বীনের নবীর জ্যোতির্ময় জ্ঞানের নিদর্শন, ইসলাম ধর্ম প্রতিষ্ঠার যুদ্ধে শ্রেষ্ঠ সেনাপতি খালিদ, তারিক, মুসার রক্তরঞ্জিত বিষয় নিশান, ইসলাম ধর্মের প্রথম মুয়াজ্জিন বেলালের আজানের সুন্দর সকালের ছবি, দেশ-বিদেশের হাজিদের আরাফাত ময়দানের জমায়েতের তৃপ্তি, তুর পর্বতে মুসা নবীর কাছে অবতীর্ণ হওয়া ‘লা শরীক্ আল্লাহ’ (আল্লাহ ভিন্ন উপাস্য নাই) বাণী, কারবালার যুদ্ধের অগণিত শহীদের জ্যোতির্ময় রক্তধারা। এ সবের অনুভব রয়েছে আজানের ধ্বনিতে, যা আসমান-জমিনকে সুসমন্বিত এবং সমুজ্জ্বল করে।
এই গীতিকবিতায় তুর পাহাড়ের কথা এসেছে, যা মাউন্ট সিনাই বা জাবালে মুসা নামেও পরিচিত। এই পাহাড় মিশর-এর সিনাই উপদ্বীপের সেন্ট ক্যাথেরিন শহরে অবস্থিত একটি ঐতিহাসিক ও ধর্মীয়ভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পর্বত। পবিত্র কোরআন অনুযায়ী, এই পাহাড়েই আল্লাহ তা’আলা নবী মুসা (আ.)-এর সঙ্গে সরাসরি কথা বলতেন। মুসা নবীর ওপর নাজিলকৃত আসমানী কিতাব তাওরাত বা তুরা এই পাহাড়েই অবতীর্ণ হয়েছিলো।
‘বাজলো কী রে ভোরের সানাই’ এই গীতিকবিতাটি ‘মোয়াজ্জিন’ পত্রিকার ‘কার্তিক ১৩৩৫ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল। পাদটীকায় উল্লেখ ছিল নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মিলনের উদ্বোধন সঙ্গীত। উল্লেখ্য ১৯২৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৩ অক্টোবর (আশ্বিন) কলকাতার আলবার্ট হলে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্র সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ‘নিখিল বঙ্গ মুসলিম যুবক সম্মেলন’। সেই অনুষ্ঠানে নজরুল গানটি পরিবেশন করেছিলেন।
ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম বীর হাসান-হুসেনের আত্মত্যাগকে মহিমান্বিত করেছেন ‘মোহররম’ এবং ‘কোরবাণী’ কবিতায়। কারবালার শোকাবহ ইতিহাস ও ইসলামের সাম্যের বাণী প্রচার করেছেন তিনি অকৃপণ হাতে। ইসলামের ইতিহাসের এইসব ঘটনা ও ঐতিহ্য কেবল ধর্মীয় গণ্ডিতে আবদ্ধ না রেখে অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন।
এর বাইরে নজরুলের কবিতায় চীন, আয়ারল্যান্ড, তুরস্ক এবং গ্রিসের কথা এসেছে। বিশেষ করে কোমলমতি শিশুকিশোরদের জন্যে রচিত ‘সংকল্প’ কবিতার কথা এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। কবি লিখছেন-
‘কোন বেদনার টিকেট কেটে চণ্ডুখোর ঐ চীনের জাতি
এমন করে উদয়বেলায় মরণ খেলায় ওঠলো মাতি
আয়ারল্যান্ড আজ কেমন করে
স্বাধীন হতে চলছে ওরে
তুরস্ক ভাই কেমন করে কাটলো শিকল রাতারাতি
কেমন করে মাঝ গগনে নিবলো গ্রীসের সূর্য-বাতি।’
Ñ ব্রিটিশরাজ চীনে আফিম ব্যবসার প্রসার ঘটালে বিপুল সম্ভাবনাময় চীন নেশার ঘোরে প্রায় বিলীন হতে চলেছিলো। নজরুল চীনের জাগরণ চেয়েছিলেন, যা পরে মাও সে তুং, দেং শিয়াও পিং এবং শি জিন পিং-এর হাত ধরে ঘটেছে। সংকল্প কবিতায় কবি চন্দ্র ও মঙ্গল বিজয়ের বার্তা ঘোষণা করেছিলেন, যা আমাদেরকে বিস্মিত করে। ১৯৬৯ সালে চন্দ্রবিজয়ের সময় কবি শারীরিকভাবে জীবিত থাকলেও মানসিকভাবে ছিলেন সকল কিছুর উর্ধ্বে।
প্রেম ও দ্রোহের কবি, সাম্যের কবি, গণমানুষের কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য, সঙ্গীত ও চিন্তা নিয়ে হাজার হাজার পৃষ্ঠা লিখিত হয়েছে এবং আরো হবে। তার দার্শনিকতা নিয়ে ইন ডেপথ আলোচনা সম্প্রতি শুরু হয়েছে। বিশেষ করে ‘সংকল্প’ কবিতার পঙক্তিমালা নিয়ে আরো নির্মোহ ও নিগূঢ় আলোচনা হতে পারে। আলোচনা হতে পারে আফগান বীর আমানুল্লাহ’র শানে রচিত কবিতাটি নিয়ে। শতবর্ষ আগে রচিত কবিতাটিতে আনার আপেলের জয়গান গেয়েছিলেন নজরুল। আজ আফগানিস্তান আনারের জুস বিশ্বময় রপ্তানি করছে, কোমল পানীয়ের সংজ্ঞাই বদলে দিয়েছে আনারের রসে তৈরি পামীর কোলা।
সম্প্রতি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ফ্রান্সের বিখ্যাত বিশ্বসাহিত্য অভিধান দিকসিওনের মোঁদিয়াল দে লিতেরাত্যু র (Dictionnaire Mondial des Littératures)-এ অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান লারুস (Larousse) কর্তৃক প্রকাশিত এই অভিধানে তার অন্তর্ভুক্তি বাংলা সাহিত্যের বিশ্বমঞ্চে এক বিশাল স্বীকৃতি। এ ছাড়া ইংরেজি, পর্তুগিজ,, হিন্দি, উর্দু ইংরেজি সহ ইউরোপের আরো কতিপয় ভাষায় নজরুল সাহিত্যের বেশ কিছু অংশ অনূদিত হয়েছে। তবে তা সংখ্যায় অনেক কম। জাতীয় কবিকে নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে আরো কাজ হওয়া উচিত।
লেখক: নজরুল অনুরাগী ও শিল্প-সমালোচক, এডমিন, প্রসঙ্গ নজরুল-সঙ্গীত গ্রুপ।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

