অলোক আচার্য, সংগৃহীত
অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দেশে নিত্য নতুন পত্রিকা আসছে। সেই পত্রিকা আসার আগে বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার দেখা যায়। কিন্তু অনেক পত্রিকাই একেবারে প্রান্তিক মানুষের হাত পর্যন্ত পৌঁছায় না। কারণ মানুষ এখন ছাপা পত্রিকার চেয়ে মোবাইলে সেই ছাপা পত্রিকার অনলাইন মাধ্যমের খবর পড়তে বেশি পছন্দ করছে। এ ছাড়া একটি পত্রিকার পিছনে মাসের খরচটা ঠিকঠাক মনে করছে না। চাহিদা অনুযায়ী পত্রিকাগুলো পাঠককে কাছে টানতে পারছে না। যাদের পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছিল সেই মানুষগুলোই নিয়মিত পাঠক হিসেবে রয়েছেন, আর নতুন পাঠক যোগ হচ্ছে কম। একটি উপজেলায় হকারের কাছেই এই তথ্য রয়েছে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, এত ঢাক-ঢোল পিটিয়ে যে পত্রিকাটি বাজারে আসছে, তার সাংবাদিক তো সব উপজেলায় রয়েছে, সেই পত্রিকা কতজন মানুষ পড়ছে? মানুষ এখন ফেসবুক পড়ে। সেই খবর থেকেই অধিকাংশ খবর ছড়িয়ে যায়। পত্রিকাগুলোর অনলাইন লিঙ্ক সেখানেই থাকে। সেসব খবরই আপডেট। পরের দিন যখন সেই একই সংবাদ প্রকাশিত হয় ছাপা পত্রিকায় তার প্রতি খুব একটা আগ্রহ থাকে না কারো। সংবাদপত্রের সাথে জড়িয়ে আছে সাংবাদিকদের জীবন ও জীবিকা। তার অবস্থাও খুব শোচনীয়। উপজেলা পর্যায়ের একজন সংবাদকর্মীর সারাদিন কাজ থাকলেও মাস শেষে তার জন্য বরাদ্দ বড়জোড় অতি সামান্য সম্মানী যা দিয়ে এক মাসের চা খরচও ওঠে না। অথচ মোটর সাইকেলের তেল কিনতেই পকেট ফাঁকা হয় সাংবাদিকের। তবু সংবাদ সংগ্রহ করতে দিন-রাত ছুটে যান সাংবাদিকরা। দেশে এখন অনেক পত্রিকা। প্রিন্ট মিডিয়ার সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন মিডিয়ারও জয়জয়কার। প্রতি মাসেই নতুন পত্রিকা আসার খবর পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো পাঠকের জন্য কয়টি পত্রিকা কাজ করছে?
একজন সাংবাদিকের সংবাদ যদি জনগণ নাই পড়েন তাহলে তার সাংবাদিক থাকার অর্থ কী? বর্তমান বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে গণমাধ্যম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রের গতিশীলতায় স্বাধীন গণমাধ্যম সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। মানুষের সামনে প্রকৃত তথ্য উপস্থাপন করে গণমাধ্যমকর্মীরা বা সাংবাদিকরা সমাজকে সত্য দর্শন করাচ্ছে। এখানে ঝুঁকি আছে। সেই ঝুঁকি থাকার কথা জেনেও প্রতিনিয়ত নতুন নতুন পত্রিকা, টিভি চ্যানেলের সঙ্গে সাংবাদিকতা পেশায় আসছে নতুন মুখ। নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এরা মাঠে নামছে। তাদেরও পরিবার পরিজন আছে। তবু ঝুঁকি নিতে পিছপা হয় না।
স্বাধীন সংবাদমাধ্যমকে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। সে হিসেবে এই স্তম্ভটি হওয়া উচিত অত্যন্ত শক্তিশালী। কোন দেশের উন্নয়নে মুক্ত গণমাধ্যম অন্যতম শর্ত। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় পরিচালিত রাষ্ট্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা যথেষ্ট শক্তিশালী হওয়া উচিত। কারণ গণমাধ্যম রাষ্ট্রের পরিচালিত ব্যবস্থার খুটিনাটি দিকগুলো চিহ্নিত করে এবং তা বিশ্লেষণ করে সমাধানের পথ বাতলে দেয়। গণমাধ্যমের প্রকার এখন বিস্তৃত। টেলিভিশন চ্যানেল, প্রিন্ট পত্রিকা এবং রেডিওর সঙ্গে সঙ্গে অনলাইন পত্রিকা, অনলাইন টিভি এবং অনলাইন রেডিও রয়েছে প্রচুর। প্রতিদিন নতুন নতুন পত্রিকা বের হচ্ছে। জানার ইচ্ছা মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এই সহজাত প্রবৃত্তি পূরণের জন্যই গণমাধ্যমগুলো কাজ করে। এর সঙ্গে যুক্ত কর্মীরা প্রতিনিয়ত মানুষের তথ্য জানার আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে তা সংগ্রহ এবং প্রচার করছে। এই তথ্য জানানোর কাজটি সবক্ষেত্রে সহজ হয় না। অনেক সময় ক্ষমতাশালীর রক্ত চক্ষু উপেক্ষা করেই তাকে তার কাজ করতে হয়। হরহামেশাই সাংবাদিককে তথ্য সংগ্রহের সময় হয়রানির শিকার হতে হয়। এতকিছুর পরেও সে সেসব বাধা উপেক্ষা করেই তার কাজ চালিয়ে যায়। প্রতিটি মুহূর্তে একজন গণমাধ্যমকর্মীর ঝুঁকির মধ্যে কাজ করে যেতে হয়।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল কথা হলো রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই তথ্য জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আর তথ্য জানানোর দায়িত্বও রয়েছে। সেজন্য গণমাধ্যমকে সমাজের আয়না হিসেবে পরিগণিত করা হয়। আয়নায় যেরূপ নিজের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠে, গণমাধ্যমেও সমাজের প্রতিচ্ছবি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সেই ছবি ফুটিয়ে তোলার দায়িত্ব নেন গণমাধ্যমকর্মী। দেশে এখন শত শত পত্রিকা। জাতীয়, স্থানীয়, সাপ্তাহিক মাসিক পাক্ষিকসহ বিভিন্ন পত্রিকা টেলিভিশন এবং অনলাইনে কাজ করা সারাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে লাখ লাখ সাংবাদিক। পত্রিকায় কাজ করা প্রান্তিক পর্যায়ের সাংবাদিকদের পরিশ্রম করতে হয় ঠিকই কিন্তু তাদের আর্থিক সুযোগ সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেয়া হয় না। পত্রিকা প্রকাশের বিজ্ঞাপন দিলেই প্রচুর সংখ্যক আবেদন পাওয়া যায় সাংবাদিকতা করার জন্য। তারা এটা জানে যে এখান থেকে কোন আর্থিক সুবিধা পাওয়া যাবে না।
সাংবাদিকতা বা গণমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত থাকা সম্মানের জন্যই মূলত এত আগ্রহ দেখা যায়। সংবাদ সংগ্রহের বিপরীতে তাদের আর্থিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় না। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এসব দেশ এবং বিদেশের সংবাদ প্রকাশ এবং বিশ্লেষণ করে জনগণকে সচেতন করে। এ ছাড়া বিনোদন এবং শিক্ষামূলক কাজেও গণমাধ্যম যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে প্রতিনিয়তই। গণমাধ্যমে জনগণের আশা আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। গণমাধ্যম তখনই সার্থকতা পায় যখন জনগণের উপকারে এসে সামাজিক দায়িত্ব পালন করতে পারে। এজন্য গণমাধ্যমের স্বাধীনতা এবং মুক্ত প্রকাশ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। সারা বিশ্বেই গণমাধ্যমকর্মীদের নানাভাবে নির্যাতিত হতে হয়। জেল জরিমানা হুমকি ধমকি এসব সহ্য করতে হয়। তারপরেও গণমাধ্যমকমীদের সংবাদ সংগ্রহ থেমে থাকে না।
রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভের সৈনিকদের থেমে থাকলে চলে না। ঝুঁকি নিয়েই কাজ করতে হয়। ক্ষমতাশালীদের সঙ্গে দ্বন্দ্ব চিরকালের। গণমাধ্যম বরাবরই দুর্বলের পক্ষে থেকে লড়াই করে। তাই এ পথটা বেশ কঠিন হয়। গণমাধ্যমের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখা। রাষ্ট্রের একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত উন্নয়নে কোনো দুর্নীতি বা অনিয়ম হচ্ছে কি না সেদিকে খেয়াল রাখা। জনগণের প্রাপ্য জনগণ ঠিকমতো পাচ্ছে কি না তাও দেখার দায়িত্ব রয়েছে। গণমাধ্যমের ইতিবাচক ভূমিকা সমাজের সবক্ষেত্রে আবশ্যক।
সরকারের লক্ষ এবং উদ্দেশ্য সম্পর্কে একেবারে প্রান্তিক পর্যায় পর্যন্ত জনগণকে অবহিত করার কাজটিও গণমাধ্যম করে থাকে। গণমাধ্যম হলো উন্নয়নের অংশীদার। দেশকে উন্নত করতে হলে মুক্ত গণমাধ্যমের কোন বিকল্প নেই। যে দেশ গণমাধ্যমকে মুক্তভাবে মতামত প্রকাশের সুযোগ দিয়েছে সেসব দেশ এগিয়েছে। একথা অস্বীকার করার উপায় নেই আজকাল মুক্ত গণমাধ্যম চর্চার সুযোগ নিয়েই মূল ধারার বাইরের কিছু গণমাধ্যম নামের লেবাসধারী সমাজে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছাড়ানো এবং উস্কানিমূলক বক্তব্য ছড়ায়। এটা সমাজের জন্য হিতকর নয় এবং গণমাধ্যমের কাজও এটা নয়। এটা সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক এবং এসব গণমাধ্যম তার উদ্দেশ্য সাধন করেই শেষ হয়। সাংবাদিকরা জনগণের ভেতরের শব্দ ফুটিয়ে তোলেন। সেক্ষেত্রে বলা যায়, সাংবাদিকতা একটি ক্ষমতা। তবে এই ক্ষমতা মানুষের জন্য, কোনো ব্যক্তি বিশেষকে সন্তুষ্টি করার জন্য নয়।
নারীদের একটি বড় অংশ এখন গণমাধ্যমে কাজ করছে। দিনদিন এই সংখ্যা বেড়ে চলেছে। কাজের ক্ষেত্রে একটি সমতা গণমাধ্যম করে যাচ্ছে। জনগণের আস্থা অর্জন মূখ্য বিষয়। কতটি গণমাধ্যম আজ মফস্বল এলাকায় নিয়োজিত কর্মীদের জন্য বেতন ভাতা নিশ্চিত করে নিজেদের জন্য একটি দক্ষ জনবল তৈরি করতে পেরেছে। বিষয়টি প্রশ্ন সাপেক্ষ। কারণ আজকাল নিয়োগ দিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করে অনেকে। সেই কর্মীর প্রতি এর বাইরে আর কিছু করার প্রয়োজন পরে না। বেতন-ভাতা তো পরের কথা ন্যূনতম পকেট খরচও অনেক গণমাধ্যমকর্মীর কপালে জোটে না। এই ব্যর্থতার কাঠামো থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। আর এই ব্যর্থতা ঢাকতে অন্য কাউকে নয় গণমাধ্যমকেই এগিয়ে আসতে হবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

