Logo

মতামত

হোক অঙ্গীকার সাক্ষরতা সর্বজনীন অধিকার

Icon

নীলকন্ঠ আইচ মজুমদার

প্রকাশ: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:০৬

হোক অঙ্গীকার সাক্ষরতা সর্বজনীন অধিকার

ছবি: সংগৃহীত

গত ৮ সেপ্টেম্বর আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালন করলাম আমরা। প্রতিবছর জাতিসংঘের ১৯৩টি সদস্যভুক্ত দেশসহ পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই ১৯৬৭ সাল  থেকে পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। এবছরও এর ব্যতিক্রম হয়নি। সরকারের নির্দেশনা মতো যথাযথভাবে দিবসটি পালিত হয়েছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য ছিল— মানুষ, পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা। আলোচনার শুরুতেই জেনে নেওয়া দরকার সাক্ষরতা বলতে আমরা কী বুঝি? 

সাধারণভাবে বলা চলে কোনো ব্যক্তির লেখা, পড়া ও সাধারণ হিসাব-নিকাশ করার দক্ষতা। মূল কথা হলো নিজের ভাষায় কোনো ছোট লেখা  বা বার্তা পড়ে বুঝতে পারা এবং লেখা, লেখার মাধ্যমে নিজের ভাব প্রকাশ করা এবং অন্যের লেখা বুঝতে পারা। ইউনেস্কোর মতে এটি আরেকটু এগিয়ে গেছে। তারা বলছেন বর্তমান যুগে সাক্ষরতা কেবল লেখা বা পড়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, এর সঙ্গে ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার, তথ্য খোঁজা এবং যোগাযোগ করার দক্ষতাও যুক্ত হয়েছে। তবে শিক্ষার সঙ্গে এর পার্থক্য ব্যাপক। যিনি প্রাতিষ্ঠানিক বা বাস্তব জ্ঞান অর্জন করেছেন এবং বিচার-বিশ্লেষণ করে সমাজে সঠিকভাবে চলতে পারেন তাকে শিক্ষিত বলা হয়। এখন কিছু তথ্য উত্থাপন করা প্রয়োজন। বিভিন্ন জরিপ কি বলছে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।

সিআইএ ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে পুথিবীর ৭৭ দশমিক পাঁচ কোটি পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষরের প্রায় ৭৫ শতাংশ ১০টি রাষ্ট্রের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এগুলির মধ্যে বাংলাদেশও রয়েছে। পুথিবীর যেসব মানুষ নিরক্ষর রয়েছে তাদের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশ মহিলা। এই নিরক্ষরতার হার দক্ষিণ এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং আফ্রিকার সাব-সাহারান এলাকায় ঘনীভূত হয়েছে। পৃথিবীর জনসংখ্যার ১৫ বছর বা তদুর্ধ্ব জনসংখ্যার সাক্ষরতার হার ৮৪ দশমিক এক শতাংশ। যার মধ্যে পুরুষ সাক্ষরতার হার ৮৮ দশমিক ছয় শতাংশ এবং মহিলা সাক্ষরতার হার ৭৯ দশমিক সাত শতাংশ। এখন আলোচনা করা দরকার পৃথিবীর এই সাক্ষরতার হারের মাঝে আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান কী? স্বাধীনতার এত বছরও পরও আমরা আমাদের কতটুকু পরিবর্তন করতে পারছি? ২০২৫ সালের বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সমীক্ষা বলছে সাত বছর বা তদুর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ৭৭ দশমিক নয় শতাংশ; যা আন্তর্জাতিক হারের চেয়ে তিন দশমিক দুই শতাংশ কম। দেশের পুরুষের সাক্ষরতার হার ৮০ দশমিক এক শতাংশ ও নারীর সাক্ষরতার হার ৭৫ দশমিক আট শতাংশ। সে হিসাবে নিরক্ষর জনগোষ্ঠী রয়েছে ২২ শতাংশ প্রায়। 

পৃথিবী এগিয়ে যাচ্ছে শিক্ষায় বিজ্ঞানে সাহিত্যে কিন্তু আমরা কতটুকু এগিয়ে যেতে পারছি? তার হিসাব কিন্তু খুব একটা সুবিধাজনক নয় তবে এটাও ভাবা দরকার আমাদের সক্ষমতা কতটুকু। যতটুকু সক্ষমতা রয়েছে তার ব্যবহার করতে পারছি কি না? এই যে প্রায় ২২ শতাংশ নিরক্ষর জনগোষ্ঠী রয়েছে তাদের অক্ষরজ্ঞান তৈরি করতে আমরা কতটুকু ভূমিকা পালন করছি। রাষ্ট্র কতটুকু সজাগ রয়েছে। আমাদের সুস্থ্য ও সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার জন্য যে মৌলিক চাহিদা রয়েছে তারমধ্যে অন্যতম হচ্ছে শিক্ষা। জ্ঞান অর্জন ও উন্নত জীবনের পথ তৈরির পথ দেখায় শিক্ষা। তাই এই শিক্ষা নিয়ে ভাবা না হলে জাতির জন্য অন্ধকার পথের দ্বার তৈরি হবে। তবে প্রশ্ন হলো আমাদের এ শিক্ষা অর্জনের বাঁধা কোথায়? বাংলাদেশের শিক্ষা অর্জনের সবচেয়ে বড় বাঁধা হলো দারিদ্র্য। অর্থনৈতিক সংকটের কারণে দরিদ্র পরিবারের পক্ষে শিক্ষার ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব হয় না। ফলে অনেক শিশুই প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার আগে পরিবারের অর্থনৈতিক চাহিদা মেটানোর জন্য কাজে যোগ দিয়ে থাকে।

সহজ ভাষায় যদি বলা যায় পরিবারের হাল ধরতে বাধ্য হয়। একেবারে গ্রামীণ পর্যায়ে অনেক শিক্ষার্থী পারিবারিক ও সামাজিক কারণে প্রাথমিক স্কুল থেকে ঝরে পড়ছে। ঝরে পরার পর এসব জনগোষ্ঠী আর শিক্ষার মূল ধারার সাথে সম্পৃক্ত হচ্ছে না এবং এ প্রবণতাটা এখনও গ্রামেগঞ্জেই বেশি। অনেকেই আবার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্বকেও দায়ী করছেন। তবে শিক্ষার আগ্রহ ও প্রয়োজনীয়তাটা থাকলে বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দূরত্ব খুব একটা বেশি নয় বলেই দেখা যায়। বর্তমান বাস্তবতায় এটা দেখা যায় যে শিক্ষা ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি দায়ী হচ্ছে পরিবারের সচেতনতার অভাব। যার ফলে শিশুরা শিক্ষার আলো থেকে দূরে চলে যাচ্ছে। মেয়েদের সাক্ষরতার হার কম হওয়ার পিছনে সবচেয়ে দায়ী বাল্য বিয়ের প্রবণতা। গ্রামের বেশির ভাগ কন্যাশিশুদের কম বয়সেই বসতে হচ্ছে বিয়ের পিঁড়িতে। সম্প্রতি আরেকটা বিষয় আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় চরমভাবে প্রভাব বিস্তার করছে তা হচ্ছে মাদক। একেবারে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে এর যাত্র শুরু হচ্ছে।

এটা শুধু শিক্ষা ব্যবস্থায় নয় সামাজিক ও পারিবারিকভাবে চরম আকার ধারণ করছে। যার প্রভাব পড়ছে শিশু বাচ্চাদের উপর। এসব থেকে বেরিয়ে আসতে হলে সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া উচিত। তবে সরকারের সহাযতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় বিষয় হচ্ছে পারিবারিক সচেতনতা। সরকার যত উদ্যোগই গ্রহণ করুক না কেন পরিবার ও সমাজ সচেতন না হলে এ থেকে ভালো ফল আশা করা যায় না। সাক্ষরতা কিংবা শিক্ষা তার প্রতি ধাপই সূচনা হবে পরিবার থেকে।

তবে এই ক্ষেত্রে পরিবারের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিক্ষক সমাজ। তবে আশার কথা হলো সরকার এ থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিভিন্ন প্রকার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। যদি এসব পদক্ষেপের সঠিক প্রয়োগ হয় আশা করা যায় এই সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসা যাবে। দেশে যেসব সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে বা হচ্ছে তার বেশির ভাগই ঘটছে সুশিক্ষার অভাবে। সরকার ইতোমধ্যে ২০১৪ সালে উপপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন প্রণয়ন করেছে। এর মাধ্যমে ঝরে পড়া ও প্রাপ্তবয়ষ্কদের শিক্ষার সুযোগ তৈরি করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে কাজ করছে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো।

এর মৌলিক কাজ সাক্ষরতা এবং বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া। শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ এবং কর্মক্ষম জনশক্তি তৈরি করতে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার পাশাপাশি মিড-ডে মিল চালু, স্কুল ড্রেস বিতরণ, বছরের শুরুতে শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করা হচ্ছে। ১৯৯১ সালে ১৫ বছর বা তদুর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৩৫ দশমিক তিন শতাংশ যা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বৃদ্ধি পেয়ে এখন দাঁড়িয়েছে ৭৭ দশমিক নয় শতাংশ। একারণেই হতাশ হওয়ার সুযোগ নেই। তবে গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষায় আলাদা করে একটু বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন। কারণ গ্রামের মানুষের শিক্ষার সুযোগ শহরের মানুষের চেয়ে অনেক কম। শত সীমাবদ্ধতা থাকার পরও প্রাথমিক শিক্ষাই আমাদের আশার আলো দেখাচ্ছে। এই সাক্ষরতা অর্জনের ক্ষেত্রে সকল মানুষের মাঝে একটা উপলদ্ধি তৈরি করতে হবে যে এটা এখন সময়ের দাবী। পৃথিবী যেভাবে এগিয়ে যাচ্ছে তাতে নিরক্ষর থাকার সুযোগ নেই।

মানুষের মাঝে বদ্ধ ধারণাটা যেন জন্ম না নেয় যে শিক্ষা অর্জন করে কী হবে? বরং এই ধারণাটা তৈরি করতে হবে যে বেঁচে থাকতে হলে শিক্ষা বা সাক্ষরতা অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা এবং সাক্ষরতা কেবল মানুষের জীবন বাঁচানোর হাতিয়ার নয় বরং মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে হলে শিক্ষা একান্ত অপরিহার্য। শুধুমাত্র রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত বা সুযোগ সুবিধার উপর নির্ভর করলে হবে না। সমাজ এবং পরিবারকে ভাবতে হবে এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা বিনিয়োগ। অন্যদিকে সরকারকে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানে পরিবেশ গড়ে তুলতে হবে, পূর্বে যারা শিক্ষা অর্জন করতে পারেনি তাদের জন্য বয়ষ্ক ও গণশিক্ষা কার্যক্রমকে আরো গতিশীল করতে হবে, ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার করে ক্লাসকে আরো আকর্ষণীয় করতে হবে। এ ছাড়া পাঠ্য বইকে আরো সহজ করে আকর্ষণীয় করে শিশুদের নিকট আনন্দময় করে তুলতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা হলো লাইব্রেরির মাধ্যমে পড়াশোনাকে অভ্যাসে পরিণত করার ব্যবস্থা করতে হবে। বিভন্ন সময় শিক্ষার্থীদের যেসব পুরষ্কারের ব্যবস্থা করা হয় সেগুলির ক্ষেত্রে বইকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, খেলাধূলার মাধ্যমে বিনোদনের ব্যবস্থা করতে হবে। শিক্ষা কোনো পণ্য নয় এ কথাটি সবার মনে উপলদ্ধি করানোর ব্যবস্থা করতে হবে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য শিক্ষা একান্ত অপরিহার্য এই মর্মটি অন্তরে লালন করতে হবে। শিক্ষার প্রাথমিক ধাপ সাক্ষরতা। শিক্ষা বা সাক্ষরতা একই সূত্রে গাঁথা । তাই সাক্ষরতা কেবল অর্জন নয় সাক্ষরতা হোক আমাদের একান্ত অপরিহার্য উপাদান। চমৎকার প্রতিপাদ্যে উল্লেখ করা হয়েছে মানুষ, ‘পৃথিবী ও সমৃদ্ধির জন্য সাক্ষরতা’- তাই বিষয়টি হচ্ছে সর্বজনীন। শিক্ষাকে কেবল টাকা কামানের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। শিক্ষা হতে হবে পৃথিবীতে সুস্থ্য সুন্দর ভাবে বেঁচে থাকার সর্বোৎকৃষ্ট হাতিয়ার। 

লেখক: শিক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন