Logo

মতামত

সংগ্রামের পথ পেরিয়ে কেমন বাংলাদেশ চাই

Icon

মূহাম্মদ নূরুল আলম

প্রকাশ: ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৬:৫৯

সংগ্রামের পথ পেরিয়ে কেমন বাংলাদেশ চাই

মূহাম্মদ নূরুল আলম, ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের ইতিহাস কেবল একটি ভূখণ্ডের স্বাধীনতা অর্জনের ইতিহাস নয়; মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ নির্মাণের ধারাবাহিক ইতিহাস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান, একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ের গণআন্দোলন এবং সাম্প্রতিক জুলাই আন্দোলন, প্রতিটি অধ্যায়ই আমাদের জাতীয় জীবনে গভীর ছাপ রেখে গেছে।

সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে আন্দোলনের ভাষা ও প্রেক্ষাপট বদলেছে, কিন্তু মানুষের মৌলিক প্রত্যাশার জায়গাটি খুব বেশি বদলায়নি। মানুষ চেয়েছে অধিকার, ন্যায়বিচার, মর্যাদা, গণতন্ত্র, জবাবদিহি এবং বৈষম্যমুক্ত সমাজ। তাই আজকের বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো— এসব আন্দোলনের অর্জন ও চেতনাকে আমরা কতটা কার্যকরভাবে রাষ্ট্র ও সমাজের বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করতে পারছি? 

আইনের শাসনই রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। কোনো রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল বড় বড় অবকাঠামো বা অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। একটি রাষ্ট্র কতটা ন্যায়ভিত্তিক, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং তার নাগরিকরা কতটা নিরাপদ ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাস করতে পারে তার ওপরও রাষ্ট্রের সাফল্য নির্ভর করে। এ জন্য আইনের শাসনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। বিচারব্যবস্থাকে আরও স্বাধীন, নিরপেক্ষ, দক্ষ ও জনবান্ধব করা এবং সাধারণ মানুষের জন্য ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সহজ ও দ্রুত করা জরুরি। দুর্নীতি একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার অন্যতম বড় বাধা। দুর্নীতি কমাতে শুধু নতুন আইন বা কঠোর শাস্তির বিধান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন কার্যকর প্রয়োগ, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সদিচ্ছা।

সরকারি সেবা থেকে শুরু করে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ভূমি প্রশাসনসহ প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযুক্তিনির্ভর স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে নিরুৎসাহিত করতে হবে। কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের পাশাপাশি নাগরিক সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি সচেতন নাগরিকেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু এই অর্জনকে টেকসই করতে হলে অর্থনীতির সুফল সমাজের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে হবে। কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ, কৃষি ও শিল্পের আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বিকাশ, প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনে বিনিয়োগ এবং দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে।

বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে হবে। শুধু চাকরির পেছনে ছুটে বেড়ানো নয়; তরুণদের উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও দক্ষ পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। স্বাবলম্বিতা অর্জনই হোক আগামী দিনের লক্ষ্য। স্বাবলম্বী বাংলাদেশ গড়তে হলে আত্মনির্ভর অর্থনীতি, দক্ষ জনশক্তি এবং উৎপাদনশীল নাগরিক সমাজ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। দেশীয় শিল্প ও উৎপাদনকে উৎসাহিত করার পাশাপাশি বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতাও অর্জন করতে হবে। রাষ্ট্রকে তার নীতি ও প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে; আর নাগরিককে হতে হবে দক্ষ, সৎ, পরিশ্রমী ও দায়িত্বশীল। কারণ রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু সরকারের হাতে নয়— প্রতিটি নাগরিকের কর্ম, সততা ও দায়িত্ববোধের সঙ্গে এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা, ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রা বায়ান্ন আমাদের শিখিয়েছে অধিকার আদায়ের সাহস। ঊনসত্তর দেখিয়েছে গণমানুষের ঐক্যের শক্তি। একাত্তর আমাদের এনে দিয়েছে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। নব্বইয়ের গণআন্দোলন গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। আর জুলাই আন্দোলনও বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসে নতুন কিছু প্রত্যাশা ও প্রশ্ন সামনে এনেছে। এখন প্রয়োজন সংঘাত ও বিভাজনের রাজনীতি পেছনে ফেলে একটি কার্যকর, জবাবদিহিমূলক ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। আন্দোলনের চূড়ান্ত সাফল্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তার প্রত্যাশা মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রতিফলিত হবে— যখন মানুষ ন্যায়বিচার পাবে, দুর্নীতির শিকার হবে না, যোগ্যতার মূল্যায়ন হবে এবং তার শ্রম ও মেধার মাধ্যমে নিজের ও দেশের ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ পাবে। আমাদের সামনে তাই একটি সুস্পষ্ট লক্ষ্য থাকা দরকার, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধ, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ গঠন এবং একটি আত্মনির্ভর ও মর্যাদাশীল বাংলাদেশ নির্মাণ। ইতিহাস আমাদের সংগ্রামের পথ দেখিয়েছে। এখন আমাদের দায়িত্ব সেই সংগ্রামের অর্জনকে একটি ন্যায়ভিত্তিক, সুশাসিত, দুর্নীতিমুক্ত, সমৃদ্ধ ও স্বাবলম্বী বাংলাদেশে রূপ দেওয়া। এটাই হোক আমাদের সময়ের অঙ্গীকার।

লেখক: উদ্যোক্তা, লিগ্যাল কনসালটেন্ট, পরিচালক- বিসিএস অদিতি ক্যারিয়ার। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন