ছবি: সংগৃহীত
প্রথমেই বলা ভালো যে, ডেঙ্গু শুধুমাত্র আমাদের দেশের সমস্যা নয়, উষ্ণমণ্ডলীয় অঞ্চলগুলোতেই ডেঙ্গু মশার বিস্তার রয়েছে। ডেঙ্গু মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণে জনদায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশব্যাপী এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা জোরদারে তিন মাসব্যাপী (১২ সেপ্টেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর ২০২৬) বিশেষ জাতীয় অভিযান উদ্বোধন করেছেন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দিয়েছেন। মোট কথা ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বা এডিস মশার প্রজনন ধ্বংসে আমাদের সকলের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকতে হবে, সচেতন হতে হবে।
পৃথিবীজুড়েই অতি ক্ষুদ্র কিন্তু ভয়ংকর একটি প্রজাতির প্রাণী হলো মশা। প্রতি বছর পৃথিবীজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর কারণ হয় এই প্রাণী। অথচ এত প্রযুক্তি থাকা সত্ত্বেও মশা নামক এই ক্ষুদ্র প্রাণীটিকে ধ্বংস করা সম্ভব হয় না। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সতর্ক করে বলেছে যে, চলতি বছরই আক্রান্ত রোগীর হিসেবে ডেঙ্গু রেকর্ড করতে যাচ্ছে। অর্থাৎ বিশ্বজুড়েই এই মশা আতঙ্ক ছড়াচ্ছে। ভয়ংকর ব্যাপার হলো, বিশ্বে মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। বিশ্বের বৃষ্টিবহুল ও উষ্ণ অঞ্চলগুলোতে এই রোগ দ্রুত গতিতে ছড়িয়ে পরছে। তথ্য অনুসারে বর্তমানে বিশ্বের ১২৯টি দেশে ৫২ লাখ মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এবং তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ লাখ মধ্য ও দক্ষিণ আমেরিকার বিভিন্ন দেশের। প্রতি বছরই বর্ষা মৌসুমের আগে এবং মৌসুম জুড়েই ডেঙ্গু একটি আতঙ্কের নাম। এ সময়েই এডিস মশার দ্রুত বিস্তার ঘটে এবং বিপুল সংখ্যক রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়। এদের মধ্যে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। মশা নিয়ন্ত্রণের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তা খুব বেশি কাজে আসছে না। আমরা নিজেরাও সতর্ক না। যার ফলে এ ধরনের ঘটনা ঘটেই চলেছে। রাজধানীসহ সারাদেশেই ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের পুরোটা সময়ে ডেঙ্গু একটি আতংকের নাম। এ বছরও ডেঙ্গু বিস্তার লাভ করছে। গত কয়েক মাস ধরেই ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রচুর সংখ্যক রোগী। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারায় দেশে ঋতুপরিবর্তনে পরিবর্তন ঘটছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৭৬ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশে গড় তাপমাত্রা বেড়ে গেছে শূন্য দশমিক পাঁচ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ঠিক সময়ে বৃষ্টি হচ্ছে না। গ্রীষ্মকাল দীর্ঘায়িত হচ্ছে। ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে প্রায় প্রতিদিনই মৃত্যু হচ্ছে। বারবার নগরবাসীকে সচেতন করেও ডেঙ্গু মশার বংশবিস্তারের মতো স্থান পাওয়া যাচ্ছে।
আমরা চাইলেই যা সহজেই প্রতিরোধ করতে পারি অর্থাৎ এডিস মশার বংশবিস্তারের জায়গাগুলো ধ্বংস করতে পারি সেই কাজ একটু অবহেলার জন্য করছি না। আমরা বরাবরের মতো সবকিছু কর্তৃপক্ষের উপর ছেড়ে দিই যা সত্যি আশ্চর্যজনক। এক তথ্যে জানা যায়, ২০১৮ সালে দেশে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ১৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। ২০০০ সালে দেশে প্রথম ব্যাপকভাবে ডেঙ্গু রোগী দেখা যায়। দেখা গেছে, ১৯৯০ সালের পর থেকে পুরো বিশ্বেই এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর প্রকোপ প্রতি এক দশমিক দ্বিগুণ হচ্ছে। শুকনো মৌসুমে সংক্রামক রোগের প্রবণতা ১৯ দশমিক সাত শতাংশ কমে যাচ্ছে। মশাবাহিত রোগের মধ্যে অন্যতম মারাত্বক হলো ডেঙ্গু। মশা খুব ছোট প্রাণী হলেও এটি অনেক বড় প্রাণীর চেয়ে মারাত্মক। এমনকি পৃথিবীতে যত প্রাণী আছে তার মধ্যে এই কীট অত্যন্ত ভয়ংকর। এটি বহন করে মারাত্মক ভাইরাস, ব্যকটেরিয়া। সামান্য কামড়েই শরীরে ছড়িয়ে পরতে পারে রোগ। এসব রোগের ফলশ্রুতিতে মৃত্যুও ঘটতে পারে। এদের মধ্যে ভয়ংকর হলো এডিস মশাা। স্ত্রী এডিস মশার কামড়েই ডেঙ্গু রোগ ছড়ায়। এ ছাড়া চিকনগুনিয়াও ভীতিকর। ডেঙ্গু তাই আমাদের কাছে এক ভয়ের নাম। সম্প্রতি মশাবাহিত রোগ নিয়ে আরও ভয়ংকর একটি তথ্য পাওয়া গেছে। লন্ডন স্কুল অব হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিনের (এলএস এইচটিএম) করা গবেষণাটি ল্যানসেটে প্রকাশিত। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, যেভাবে গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গমন হচ্ছে তাতে আগামী ৫০ বছরে ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার সংখ্যা বাড়বে। ফলে আগামীতে মানুষকে বছরের একটি বড় সময়ই ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গুর সঙ্গে লড়তে হবে। ২০৮০ সাল নাগাদ বিশ্বের ৮০০ কোটির বেশি মানুষ ম্যালেরিয়া ও ডেঙ্গু হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে। তারপরও ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে।
প্রকাশিত গবেষণায় দেখা যায়, ডেঙ্গু জ্বর রোগটি প্রথম ১৯৫২ সালে আফ্রিকাতে দেখা যায়। পরবর্তীতে এশিয়ার বিভিন্ন দেশ যেমন- ভারত, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মিয়ানমার এবং ইন্দোনেশিয়াতে এটি বিস্তার লাভ করে। এই চ্যালেঞ্জের কারণ পরিবেশ এবং নিজেদের দায়বদ্ধতা। জনসংখ্যার ঘনত্ব এবং পরিবেশের কারণে ঢাকায় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে বেশ বেগ পেতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মশা জাতীয় প্রাণীর দ্রুত বংশ বিস্তারের একটি বড় কারণ। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বাড়ার সাথে সাথে এই ক্ষুদ্র প্রজাতি মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। জানা গেছে, যেসব অঞ্চলে যেসব অঞ্চলে মশা ছিল না বা মশার অস্তিত্ত্ব কেউ অনুভব করেনি বহুকাল সেখানেও তাপ বাড়ার ফলে এখন মশাদের প্রজননের উপযুক্ত হয়ে উঠছে। ডেঙ্গু কেবল আমাদের দেশেই নয় বরং ইউরোপের অনেক দেশেই মাথাব্যাথার কারণ হয়ে উঠছে। ইউরোপীয় সেন্টার ফর ডিজিজ প্রিভেনশন অ্যান্ড কন্ট্রোল বলেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ইউরোপের উত্তর ও পশ্চিম দিকে এডিস অ্যালবোপিকটাস প্রজাতির মশার বিস্তার ঘটছে। এই প্রজাতির মশা ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক। অর্থাৎ বিশ্ব উষ্ণ হওয়ার সাথে সাথে বিশ্বজুড়েই মশার উপদ্রব এবং বংশ বিস্তার বাড়ছে যা উদ্বেগজনক।
বিভিন্ন মাধ্যমেই ডেঙ্গু বিষয়ে সচেতনতামূলক নানা কার্যক্রম নেওয়া হয়েছে। তার পরেও আরও বেশি সচেতনভাবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর কর্তৃক বিভিন্ন সেমিনার, ওয়ার্কশপ ও অন্যান্য জনগুরুত্বপূর্ণ স্থান যেখানে মানুষের সমাগম হয় সেরকম স্থানে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালাতে হবে। সরকারের সাথে সাথে জনগণের যে দায়িত্ব রয়েছে সেটি ভুললে চলবে না। অথচ আমরা তা বেমালুম ভুলে বসে আছি। মশা নামক ক্ষুদ্র এক প্রাণীকে আমরা অবহেলা করছি। নিজেদের বাড়ির আশপাশে এবং বাড়ির ভেতর ডেঙ্গুর বাসস্থান তৈরি করে বসে আছি আর ভাবছি কর্তৃপক্ষ তা দূর করবে! এমন অজ্ঞানতাসুলভ ভাবনা থেকে বেরিয়ে এসে নিজের দায়িত্ব নিজে নিতে হবে। নিজের হাতে বাড়ির এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করলে তো তা দেশের জন্যও মঙ্গল। কর্তৃপক্ষের কাজটা একটু সহজ হয়। এই যে আমরা অনেকেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে হিমশিম খাচ্ছে বলে চিৎকার করছি তারাও কিন্তু কেউ এগিয়ে আসছে না। এডিস মশার প্রজননের ক্ষেত্রে ঢাকার পরিবেশ যেহেতু বেশি তাই এখানে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। নাগরিক হিসেবে আমাদের যে দায়িত্বগুলো রয়েছে তা পালন করতে হবে। বিভিন্ন পাড়া মহল্লায় গ্রামে গঞ্জে যেখানে ময়লা আবর্জনা বা সহজেই বৃষ্টির পানি জমে থাকতে পারে সেসব স্থান কর্তৃপক্ষের ভরসায় না থেকে নিজেরাই উদ্যোগী হয়ে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করতে পারি। যেহেতু এডিস মশার বংশবিস্তার এবং এর ক্ষতিকর দিক আজ আমরা সবাই জানি। নিজেদের দায়িত্ব আমরা কোনোভাবেই অস্বীকার করতে পারি না। ফলে কোনো জানা বিষয়ে প্রতিরোধ করা সহজ হয়। প্রয়োজন আমাদের সদিচ্ছা। আমরা নিজেরা এবং কর্তৃপক্ষের প্রচেষ্টা এই দুই-য়ে মিলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ সম্ভব। এই বর্ষা মৌসুমে ঘরের ভেতর ও ঘরের বাইরে এডিস মশা জন্মানোর মতো কোনো জায়গা যেন না থাকে, ডাবের খোসা, টবের জমে থাকা পানি, খালের জমা পানি, ফ্রিজের জমা পানি অর্থাৎ যেসকল স্থানে এডিস মশা জন্ম হয় সেই স্থানগুলো ধ্বংস করতে হবে। তাহলে ডেঙ্গু আমরা অবশ্যই প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবো। আগামী কয়েক দশকে পৃথিবী আরও বেশি উষ্ণ হবে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। সে সময় শীত কমবে। অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টি আবহাওয়ার নিত্যসঙ্গী হবে। সেই সাথে বাড়তে থাকবে এডিস মশার বিস্তার। অর্থাৎ আমরা যদি সুযোগ দেই তাহলেই। আর যদি আমরা সচেতন থাকি তাহলে খুব সহজেই এটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। আমরা জনদায়িত্ব অস্বীকার করতে পরি না।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

