বিটিভিতে অনুষ্ঠান না হলে শিল্পীরা বাঁচবেন কী করে?
সৈয়দা আঁখি হক
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০১
সৈয়দা আঁখি হক, ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের ভূমিকা ঐতিহাসিক। একসময় বিটিভির একটি অনুষ্ঠান মানেই ছিল শিল্পী, নির্মাতা, লেখক, গবেষক, সুরকার, সংগীতশিল্পী, উপস্থাপক ও কলাকুশলীদের কর্মচাঞ্চল্য। দেশের নানা প্রান্তের শিল্পীরা বিটিভির মাধ্যমে যেমন দর্শকের কাছে পৌঁছেছেন তেমনি তাদের জীবিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এসেছে এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে।
দেশের অগ্রণী জাতীয় গণমাধ্যম বিটিভিতে নিয়মিত অনুষ্ঠান নির্মাণ ও রেকর্ডিংয়ের কার্যক্রম থেমে গেলে সবচেয়ে বড় সংকটে পড়েন সংস্কৃতিকর্মীরা। কারণ, একজন শিল্পীর সঙ্গে জড়িত বড় একটি কর্মজগত। যেমন গায়ক বা অভিনয়শিল্পী কাজ না করলে তার সঙ্গে বাদ্যযন্ত্রী, গীতিকার, সুরকার, উপস্থাপক, মেকআপশিল্পী, পোশাকশিল্পী, ক্যামেরাকর্মী, আলো-শব্দের কর্মী, মঞ্চকর্মীসহ অসংখ্য মানুষের কাজ থেমে যায়।
আমরা জানি, আবেগের পাশাপাশি ‘শিল্পচর্চা’ অধিকাংশ মানুষেরই জীবিকা নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন। শিল্পীকে আমরা যখন শুধু ‘সংস্কৃতির মানুষ’ হিসেবে দেখি তখন তার জীবিকার বাস্তবতাটি অনেক সময় আড়ালেই থাকে। কিন্তু ‘শিল্পীরাও তো মানুষ’! এদেরও ক্ষিদের জ্বালা আছে। সুতরাং, শিল্পীর সৃষ্টিশীলতাকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার কাজের সুযোগ, জীবিকার নির্বাহের পথ সচল রাখতে হবে।
আমার জানামতে বাংলাদেশ টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো বিনোদনের পাশাপাশি দেশের ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস ও ঐতিহ্যকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। নিয়মিত মানসম্মত অনুষ্ঠান নির্মাণ হলে একদিকে যেমন দর্শক নতুন ও বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠান পাবেন, অন্যদিকে অসংখ্য সংস্কৃতিকর্মীর কর্মসংস্থানেরও সুযোগ তৈরি হবে। অর্থাৎ সংস্কৃতির মানুষকে টিকিয়ে রাখতে হলে সংস্কৃতির কাজের ক্ষেত্রকেও টিকিয়ে রাখতে হবে। কারণ, শিল্পীর কাছে কাজই তার সবচেয়ে বড় স্বীকৃতি।
বাংলাদেশ টেলিভিশন কেবল একটি সম্প্রচার মাধ্যম নয়; এটি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অন্যতম অংশ। জন্মলগ্ন থেকেই ধীরে ধীরে এই প্রতিষ্ঠানের পর্দায় উঠে এসেছে দেশের গান, নাটক, সাহিত্য, লোকসংস্কৃতি, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনকথা। অসংখ্য শিল্পী, সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, গবেষক, অভিনেতা, নির্মাতাগণ সৃষ্টিশীলতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিটিভির নাম।
রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে আমার মতো অসংখ্য সংস্কৃতিকর্মী এবং শিল্পীদের একটি প্রশ্ন, ‘রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার না হলে শিল্পীরা কাজ করবেন কোথায়? তাদের পরিবার চলবে কীভাবে?
মানছি সময়ের সঙ্গে দর্শকের রুচি বদলেছে, প্রযুক্তি বদলেছে, বিনোদনের মাধ্যমও বেড়েছে। কিন্তু পুরোনো অনুষ্ঠানগুলোর মূল্য কমে যায়নি! বরং সময়ের দূরত্ব সেসব অনুষ্ঠানকে আরও মূল্যবান করে তুলেছে। যেমন ‘নতুন কুঁড়ি’, ‘যদি কিছু মনে না করেন’, ‘আনন্দ মেলা’, ‘যাত্রা’, ‘বর্ণালি’, ‘লৌকিক বাংলা’,‘ ভরা নদীর বাঁকে’, ‘বাঁশরী’, ‘হিজল-তমাল’, ‘শেকড়ের গান’, ‘মাটি ও মানুষ’, ‘মেঠোসুর’, ‘রুপালি ঢেউ’, ‘স্বজনে-বিজনে’, ‘গান চিরদিন’, ‘ছায়াছন্দ’, ‘পরিবর্তন’, ‘উজান গাঙের নাইয়া’, ‘কোথাও কেউ নেই’, ‘আজ রবিবার’, ‘ইত্যাদি’, ‘সিসিমপুর’, ‘মনের কথা’, ‘লোকগানের আঙিনা’ এগুলোর মধ্যে রয়েছে একটি সময়ের সমাজ, ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ভাষা, পোশাক, সংগীত ও মানুষের জীবনযাপনের চিত্র।
বাংলার পালাগান, জারি, সারি, ভাটিয়ালি, কবিগান, গম্ভীরা, পুথিপাঠ, বাউল ও মরমি সংগীত বাঙালি জাতির সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের প্রতীক। এছাড়া দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক গুণী শিল্পী বাণিজ্যিক মাধ্যমে নিয়মিত কাজের সুযোগ পান না। এদের গান, পালা, কাহিনি, আঞ্চলিক পরিবেশনা ও লোকজ ঐতিহ্যকে ধারণ করার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমের দায়িত্ব রয়েছে।
একটি মানসম্মত টেলিভিশন অনুষ্ঠান কখনো একজনের একক প্রচেষ্টায় তৈরি হয় না। অনুষ্ঠান নির্মাণের আগে বিষয় নির্বাচন থেকে শুরু করে গবেষণা, পরিকল্পনা, গ্রন্থনা, শিল্পী নির্বাচন, উপস্থাপনা ও নির্মাণশৈলী— প্রতিটি পর্যায়ে প্রয়োজন অনুষ্ঠান প্রযোজক, গবেষক, পরিকল্পক, পরিচালক, লেখক, শিল্পী, গীতিকার, সুরকার ও সংশ্লিষ্টদের সম্মিলিত চিন্তা ও অভিজ্ঞতার সমন্বয়। প্রত্যেকের কাজের ক্ষেত্র আলাদা হলেও সবার মতামতের সমন্বয়ে অনুষ্ঠানের বিষয়, কাঠামো, উপস্থাপনা ও নান্দনিকতা সমৃদ্ধ হয়।
বিটিভির মতো রাষ্ট্রীয় সম্প্রচার মাধ্যমে এই সমন্বিত প্রক্রিয়াকে আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। কারণ এখানে নির্মিত প্রতিটি অনুষ্ঠান দেশের সংস্কৃতি ও ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী। তাই ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে অভিজ্ঞতা, গবেষণা ও সৃজনশীলতার সম্মিলিত প্রয়োগই হতে পারে ভালো অনুষ্ঠানের অন্যতম ভিত্তি।
বাংলাদেশ টেলিভিশন বাঙালির আবেগের এবং ভালোবাসার অন্যতম গণমাধ্যম। মানসম্পন্ন অনুষ্ঠান কীভাবে মানুষের কাছে পৌঁছানো যায়, কীভাবে কম ব্যয়ে, পরিকল্পিতভাবে দর্শকের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অনুষ্ঠান নির্মাণ করা যায় তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। কোন অনুষ্ঠান ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কোনটি পুনর্নিমাণ করা হবে, কোনটি ডিজিটাইজ করা জরুরি এসব নির্ধারণে গবেষক, নির্মাতা, শিল্পী ও আর্কাইভ বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কার্যকর দল গঠন করা যেতে পারে।
কারণ শিল্পী, শিল্প, বিনোদন, শিক্ষা, সচেতনতা এবং সংস্কৃতির জন্যই তো টেলিভিশন। তাই প্রকৃত ‘শিল্প’ এবং ‘শিল্পীর’ মূল্যায়ন করে বিটিভিকে আরও জনবান্ধব, জনপ্রিয়, সময়োপযোগী ও সৃজনশীল করার প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তরুণদের উদ্ভাবন শক্তি, সাহিত্য, সংগীত, প্রযুক্তি, সামাজিক উদ্যোগ, প্রকৃতি, খেলাধুলা, সৃজনশীল কাজ, প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন, স্বপ্ন, সমস্যা ও সাফল্যের গল্প তুলে ধরতে হবে।
আমাদের মনে রাখা উচিত একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়; তা থাকে গান, নাটক, সিনেমা, অনুষ্ঠান, মানুষের কণ্ঠ ও সম্মিলিত স্মৃতিতে। সেই স্মৃতি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ, আর্কাইভ, ডকুমেন্টারি করা আমাদেরই দায়িত্ব।
একটি অনুষ্ঠান সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত বহু মানুষের শ্রম ও জীবিকা। তাই বিটিভির অনুষ্ঠান কার্যক্রম পুনরায় সচল হলে, পর্দায় আলো জ্বললে শিল্পীর ঘরেও আলো জ্বলবে। সুতরাং, বিটিভির পর্দায় শুরু হোক নিয়মিত অনুষ্ঠান সম্প্রচার, আর্কাইভের দরজা খুলে দেওয়া হোক। প্রবীণ শিল্পীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তৈরি হোক নতুন প্রজন্মের সৃষ্টিশীলতা সংযোগ। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পৌঁছে দেওয়া হোক ঘরে ঘরে। সংস্কৃতির আলোয় ভরে উঠুক বাংলাদেশ টেলিভিশন। এটাই এখন সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা।
লেখক: লোকসংস্কৃতি গবেষক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

