অলোক আচার্য, ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষা রাজনীতির কোনো অংশ নয়। শিক্ষা এমন একটি মৌলিক চাহিদা যা পূরণ করা অত্যাবশ্যক। কোনো দল বা গোষ্ঠী বা কোনো ব্যক্তি যদি দেশকে বা কোনো সমাজকে বা নিজের পরিবারকে এগিয়ে নিতে চান তাহলে সর্বাগ্রে শিক্ষা সংস্কার এবং অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিক্ষার প্রসার করতে হবে।
আপনাকে দেখতে হবে প্রজন্মের চাহিদা কী? যুগের সাথে তাল মিলিয়ে শিক্ষা এগিয়ে চলছে কি না। যে কায়দায় একটি রাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা পরিচালিত হবে সেই একই ধরনে চলবে সেই দেশের শাসন ব্যবস্থা, উন্নয়ন গতি এবং অধোঃগতিও! শিক্ষা যেমন ব্যক্তির জীবনে প্রভাব বিস্তার করে, দেশের ভবিষ্যতেও প্রভাব বিস্তার করে।
এই যে ফ্রান্সে জেন জি দের আন্দোলন চলছে এবং একটি সামগ্রিক রাজনীতি পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে সেটি কিন্তু একদিনে হয়নি। এবং শুধুমাত্র এটা শিক্ষা থেকে হয়নি। এটা হয়তো শিক্ষা সংস্কার দিয়ে শুরু হয়েছে মাত্র। এবার লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, শিক্ষা থেকে সেটি অর্থনীতিতে পৌঁছে গেছে। এবং রাষ্ট্রের আরও যে খাতগুলো দুর্বল সেই খাতগুলোতেও ক্ষোভ বিরাজ করছে। তরুণ ভোটারদের সমর্থন পেতে বাম, ডান ও মধ্যপন্থী রাজনৈতিক নেতাদের অবস্থান ও কৌশলেও দেখা যাচ্ছে নতুন মেরুকরণ। ২০২৭ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তরুণ ভোটারদের গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে বামপন্থী নেতা জ্যঁ-লুক মেলঁশোঁ শিক্ষার্থী আন্দোলনের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন জানিয়েছেন। ১১ অক্টোবর ক্লেরমঁ-ফেরঁ শহরে এক নির্বাচনী সমাবেশে তিনি আন্দোলনকারীদের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ভোট দেওয়ার ন্যূনতম বয়স ১৮ থেকে কমিয়ে ১৬ বছর করার প্রস্তাব দেন। এর মানে হলো বিষয়টি এখন রাজনৈতিক ফয়সালার দিকে যাচ্ছে যা আগামী বছর শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। ম্যাক্রোর সরকার এখন এই আন্দোলন কতটা দক্ষতার সাথে এবং কৌশলগতভাবে শেষ করতে পারেন তার উপর দলেরও ভবিষ্যত নির্ভর করছে। এখন শুধু শিক্ষা খাত সংস্কার করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। একটি প্রজন্ম যা জেন জি নামে পরিচিতি পেয়েছে তারা যেসব আন্দোলন করেছে বা করছে সেখানে সরকার গুরত্ব না দেওয়ার মতো ভুল করতে পারে না। আপনি শিক্ষাকে যেভাবেই দেখেন শিক্ষা সংস্কারের অগ্রাধিকারে থাকা দরকার শিক্ষা। কারণ একটি দেশের শিক্ষা হলো স্থায়ী উন্নয়নের প্রধান সোপান।
বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থায় পদে পদে বৈষম্য আর ব্যবধানের চিত্র। দেশের সার্বিক এবং স্থায়ী পরিবর্তনের পিছনে এবং নতুন প্রজন্মের চোখে শিক্ষাকে উপযোগী করে তুলতে একটি চমৎকার শিক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা আবশ্যক। ফ্রান্সে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া স্কুল শিক্ষার্থীদের শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন একটি পরিবর্তিত এবং নানন্দিক শিক্ষা কাঠামো রাষ্ট্রের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ সেটাই নির্দেশ করে। গত ২১ সেপ্টেম্বর প্যারিসের উপকণ্ঠ ক্রাতেইয়ের একটি হাইস্কুলে শিক্ষক-সংকটকে কেন্দ্র করে আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ দেখা দিয়েছিল। কিন্তু মাত্র ১০ দিনের মাথায় সেই ক্ষোভের আগুন পুরো প্যারিস অঞ্চল ছাড়িয়ে ফ্রান্সের কোনায় কোনায় দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। এত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার কারণে দেশটির রাজনৈতিক সংকটও সামনে আসতে শুরু করেছে। সরকারের একটি সংকট যখন ক্ষতিগ্রস্থ বা দুর্বল অবস্থায় থাকে তখন পাশাপাশি আরও খাতে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে। জনরোষ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং ফ্রান্সের ক্ষেত্রে সেটাই হচ্ছে। বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ছে যা আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হতে পারে। বিক্ষোভের মুখে দেশজুড়ে ৪০০-৫০০টি স্কুলের পাঠদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে; যদিও কিছু জায়গায় তখনো ধীরগতিতে ক্লাস শুরুর চেষ্টা চলছে। ২০২৬ সালের এই আন্দোলনের সঙ্গে ১৯৯০ সালের ঐতিহাসিক হাইস্কুল আন্দোলনের একটি চমৎকার মিল রয়েছে। সে বছরও নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর মাত্র কয়েক সপ্তাহের মাথায় প্যারিসের উপশহরগুলো থেকে ক্ষোভের সূত্রপাত হয়েছিল। সেই আন্দোলন ছড়িয়ে পরেছিল। তৎকালীন ও বর্তমান উভয় আন্দোলনই রাজপথে নেমেছে শিক্ষার্থীদের নিত্যদিনের তীব্র ক্ষোভ ও অবহেলার বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে, যা পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে চমকে দিয়েছে। এখানে শিক্ষণীয় বিষয় হলো, একটি প্রজন্ম যার প্রতি কোনো রাজনৈতিক দল অবহেলা করতে পারে না। ক্রমেই একটি ক্ষোভ সঞ্চিত হয়। তাদের দাবি স্পষ্ট স্কুলে তীব্র শিক্ষক-সংকট, অনুপস্থিত শিক্ষকদের জায়গায় বিকল্প শিক্ষকের অভাব, একেকটি ক্লাসে ৩৫ জনের ওপর শিক্ষার্থী, অতিরিক্ত ক্লাসের চাপ, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বিতর্কিত কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘পারকুরসাপ’যা তাদের স্বপ্নকে গলা টিপে ধরছে, এবং জরাজীর্ণ স্কুল ভবন।
বর্তমান হাইস্কুল শিক্ষার্থীরা জন্ম নিয়েছিল ২০১০ সালের দিকে, যে সময়টায় ফ্রান্সে শিশু জন্মের হার শীর্ষে ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁর দুই মেয়াদের শাসনামলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিকে হাজার হাজার শিক্ষক পদ বিলুপ্ত করা হয়। ফলে ২০০৮ সালের তুলনায় বর্তমানে সরকারি স্কুলে শিক্ষক সংখ্যা মারাত্মক কমেছে, অথচ শিক্ষার্থী বেড়েছে আড়াই লাখের বেশি! বর্তমানে সাধারণ ও কারিগরি হাইস্কুলগুলোর ৭০ শতাংশ ক্লাসরুমে ৩০ জনের বেশি এবং ২০ শতাংশ ক্লাসে ৩৫ জনেরও বেশি শিক্ষার্থী গাদাগাদি করে বসতে বাধ্য হচ্ছে। এই শিক্ষা সংস্কার আন্দোলন ম্যাক্রোর জন্য ক্রমেই রাজনৈতিক ঝুঁকিতে রূপান্তরিত হচ্ছে। শিক্ষ সংস্কার আন্দোলন থেকে তা প্রসারিত হয়ে এখন সামগ্রিক একটি সরকার বিরোধী আন্দোলনে পরিণত হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের দুরবস্থা ও সরকারি সেবার মান নিয়ে ক্ষোভ থেকে ফ্রান্সজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। শনিবারের আন্দোলনে শিক্ষার্থী, শ্রমিক সংগঠন ও ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সমর্থকরা অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষও হয়েছে। ফ্রান্সজুড়ে চলমান বিক্ষোভে শনিবার প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এই সংঘাতের নেপথ্যে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক সংকট। সরকারি সেবার মান কমে যাওয়া, পরিবারের ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং সাধারণ মানুষের সমস্যা সমাধানে সরকারের ব্যর্থতা নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। শিক্ষকসংকট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত দুরবস্থার প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ শুরু করেন। পরে স্কুল অবরোধ ও প্রতিবাদ কর্মসূচি বোর্দো, রেন, নান্ত, লিওঁ, লিল ও মার্সেইসহ বিভিন্ন শহরে ছড়িয়ে পড়ে। ফ্রান্সের ২০২৭ সালের প্রস্তাবিত বাজেটে ৫৪ বিলিয়ন ইউরোর ব্যয় সংকোচন ও করসংক্রান্ত পদক্ষেপের পরিকল্পনা রয়েছে। বাজেট ঘাটতি কমানোর জন্য এসব পদক্ষেপ প্রয়োজন বলে দাবি করছে সরকার। এই বিক্ষোভ ম্যাক্রোঁর জন্যও বড় ধাক্কা। তরুণ নেতৃত্ব, সংস্কার ও গতিশীল ফ্রান্স গড়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও নিজের রাজনৈতিক লক্ষ্য স্পষ্ট করতে না পারা এবং মানুষের প্রতি তার সহানুভূতির অভাবের কারণে সেই ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ফ্রান্সের ইতিহাসে রাজনৈতিক অস্থিরতার ভয় প্রায়ই রক্ষণশীল ও মধ্যপন্থি দলগুলোর জন্য সুবিধা তৈরি করেছে। ১৯৬৮ সালের বিক্ষোভের পরও এমন পরিস্থিতি দেখা গিয়েছিল। ২০২৭ সালের এপ্রিলে ফ্রান্সে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। ফলে প্রার্থীদের সামনে এখন দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ। একদিকে তাদের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার সক্ষমতা দেখাতে হবে, অন্যদিকে আন্দোলনের পেছনে থাকা সমস্যাগুলো সমাধানের প্রতিশ্রুতিও দিতে হবে।
সংকট কখনো একা আসে না। ফ্রান্সের সংকট শিক্ষা থেকে শুরু হয়ে আরো কয়েকটি সংকটকে একত্রিত করেছে। এখন সব ছাড়িয়ে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ডানপন্থী, বামপন্থী ও মধ্যপন্থী, উদারপন্থী অথবা কট্টরপন্থী সকলেই সমস্যাগুলো নিয়ে সরব হয়েছেন। জেন জিদের ব্যাপক গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং নিজ নিজ জায়গা থেকে সমস্যা সমাধানের প্রস্তাবনা দিচ্ছেন। যা আগামী নির্বাচনের একটি ইশতেহারের মতো শোনাচ্ছে। এটা এমন নয় যে এর ফলে বর্তমান সরকারের জনসমর্থন একেবারে তলানিতে চলে যাবে। তবে এর ফলে জনগণের আস্থা অর্জনে সবচেয়ে বেশি সুযোগ বর্তমান ক্ষমতাসীন দলটিই পাবে এবং একটি সুযোগও পাবে ফিরে আসার। আর ব্যর্থ হলে সে পথও সামনে পরিষ্কার। ফ্রান্সের জেন জিদের এই আন্দোলন শুধুই একটি প্রতিবাদ নয়। এটি একটি বার্তা সরকারের জন্য এবং বাকি সব রাজনীতিকের জন্যও। যে আগামীতে ক্ষমতায় আসবে তাকে এইসব বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। নচেৎ ফের আন্দোলনের সম্ভাবনাও রয়েছে। এখন দেখার বিষয় ম্যাক্রোর সরকার এই আন্দোলন কীভাবে সামলায় এবং প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। সব মিলিয়ে কাজটা বেশ কঠিন। তবে সামলাতে সক্ষম হলে ২০২৭ এই নির্বাচনে এর ফলও আসবে।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

