পৃথিবীর কাছাকাছি মহাকাশের নিম্ন কক্ষপথ ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১ হাজার ২০০ মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত। এ অঞ্চলে ক্রমেই স্যাটেলাইটরে ভিড় বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ইন্ডিপেনডেন্ট। ইলন মাস্কের মহাকাশ কোম্পানি স্পেসএক্সের হাজার হাজার স্যাটেলাইটে ক্রমেই ঘন হয়ে উঠছে মহাকাশে পৃথিবীর নিম্ন কক্ষপথ।
বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, অনিয়ন্ত্রিত এ ভিড় যে কোনো মুহূর্তে ঘটাতে পারে ভয়াবহ সংঘর্ষ, যা কেবল বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তিগত যোগাযোগ ব্যবস্থাই অচল করবে না, বরং তৈরি করবে মারাত্মক বিপর্যয়ের ঝুঁকি।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ বা অপশক্তির ক্ষতিকর পদক্ষেপের ফলে সেখানে তৈরি হতে পারে ভয়াবহ ‘চেইন রিঅ্যাকশন’ বা ধারাবাহিক বিপর্যয়। এর জেরে অচল হয়ে পড়তে পারে বিশ্বের সার্বিক প্রযুক্তিগত অবকাঠামো বা মহাকাশে জমে থাকা বর্জ্য খসে সরাসরি পৃথিবীতে পড়তে পারে।
‘ইউনিভার্সিটি অফ বার্মিংহাম’-এর মহাকাশবিজ্ঞানের অধ্যাপক হিউ লুইস বলেছেন, “আমার ধারণা, আমরা এমন এক পরিস্থিতির দিকে এগোচ্ছি, যেখানে মূল নেটওয়ার্কের মধ্যে থাকা কোনো সক্রিয় স্যাটেলাইট সরাসরি দুর্ঘটনার কবলে পড়বে। এ দুর্ঘটনা কিন্তু এড়ানোর চেষ্টা না করার কারণে ঘটবে না, বরং এড়ানোর জন্য সব ধরনের চেষ্টা করার পরও শেষ রক্ষা হবে না।”
মার্কিন বাণিজ্য প্রকাশনা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক বিশ্লেষণ বলছে, নিম্ন কক্ষপথে বর্তমানে ৩০ হাজারেরও বেশি বস্তু ভাসছে, যার মধ্যে ১০ হাজারেরও বেশি বস্তু ধনকুবের ‘ইলন মাস্কের কোম্পানি’ স্পেসএক্সের।
ইতিহাসের সবচেয়ে বড় স্যাটেলাইট বহর নিয়ন্ত্রণ করছে স্পেসএক্স, যা তাদের ‘স্টারলিংক’ সেবার মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সরবরাহ করে। কোম্পানিটির দাবি, তাদের বিভিন্ন স্যাটেলাইট সার্বক্ষণিক এদের গতিপথ পর্যালোচনা করে। পথ চলাচলের সময় কোনো সংঘর্ষের আশঙ্কা যদি ১ কোটির মধ্যে ৩ বারের বেশি দেখা দেয় তবে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তা পথ পরিবর্তন করে নেয়।
মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া নথির বরাতে জানা গেছে, কেবল গেল এক বছরেই স্পেসএক্সের বিভিন্ন স্যাটেলাইট সংঘর্ষ এড়াতে ৩ লাখ ৫৫ হাজার বারেরও বেশি প্রতিরোধমূলক গতিপথ পরিবর্তন করেছে। এ পরিস্থিতি ও সার্বিক ঝুঁকি নিয়ে ইন্ডিপেনডেন্টের মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি স্পেসএক্স। বিভিন্ন স্যাটেলাইটের মধ্যে পারস্পরিক সংঘর্ষের ঘটনা এখনও বিরল হলেও ঝুঁকি কিন্তু থেকেই যায়।
বায়ুমণ্ডলে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া অকেজো স্যাটেলাইট ও মানুষের তৈরি মহাকাশ বর্জ্য ধ্বংস হওয়ার হারের চেয়ে নিম্ন-কক্ষপথে স্যাটেলাইটের ঘনত্ব দ্রুত বাড়তে পারে। ফলে পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিটি স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ দিন দিন আরও বেশি জটিল হয়ে উঠবে।
বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী বিভিন্ন দেশ তাদের নিজেদের স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে। যার মধ্যে ২০০৭ সালের একটি ঘটনায় চীন ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে তাদের একটি আবহাওয়া স্যাটেলাইটে আঘাত হানে। এ ছাড়া, ২০২১ সালের এক পরীক্ষায় ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে নিজেদের একটি স্যাটেলাইট ধ্বংস করেছে রাশিয়া, যার ফলে মহাকাশে ১ হাজার পাঁচশর বেশি বর্জ্যের টুকরা ছড়িয়ে পড়েছে।
পৃথিবীর নিম্ন-কক্ষপথে সর্বোচ্চ ঠিক কতগুলো স্যাটেলাইট চলাচল করা নিরাপদ ও বিশ্ব এরইমধ্যে সেই সীমা পার করে ফেলেছে কি না তা নিয়ে মহাকাশ ও বিজ্ঞানীদের মহলে বিতর্ক রয়েছে। স্যাটেলাইট কোম্পানি ‘মিউয়ন স্পেস’-এর প্রধান নির্বাহী জনি ডায়ার বলেছেন, “আমার কাছে ঝুঁকিটা কেবল সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না। পৃথিবীতে প্লেন চলাচলের জন্য যতটা আকাশসীমা রয়েছে তার চেয়ে মহাকাশে স্যাটেলাইট চলাচলের জন্য ঢের বেশি জায়গা রয়েছে বলে যুক্তি দিয়েছেন তিনি। আসল বিষয়, কোনো অপশক্তি উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে খারাপ কিছু বা চরম অবহেলা দেখাচ্ছে কি না।”
মহাকাশে স্যাটেলাইটের এ সংখ্যা আগামীতেও দ্রুত বাড়তে থাকবে। কারণ, বাজারে স্পেসএক্সের সঙ্গে পাল্লা দিতে চাইছে অন্যান্য কোম্পানিও। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআইয়ের জন্য পৃথিবীর কক্ষপথে ডেটা-সেন্টার বসানোর দিকেও নজর দিচ্ছে বিভিন্ন কোম্পানি। মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের খরচ কমে আসা ও স্যাটেলাইটের আকার ক্রমশ ছোট হয়ে আসার কারণে মহাকাশে ভাসমান বস্তুর ঘনত্ব আরও বাড়বে।
চীন কেবল এ বছরই দুই লাখ নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের পরিকল্পনার কথা বলেছে। অন্যদিকে স্পেসএক্স, অ্যামাজন ও ব্লু অরিজিন আগামী এক দশকের মধ্যে মহাকাশে ১০ লাখেরও বেশি অরবিটাল ডেটা-সেন্টার বসানোর চূড়ান্ত লক্ষ্যে মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছে আবেদন জমা দিয়েছে।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

